শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদের কথা হচ্ছিলো। এখানে যা আলোচনা হোচ্ছে – সেগুলোকে বলা যায়– খণ্ডচিত্র। একটা মানুষের জীবনের সব দিকটা এইভাবে প্রকাশিত হয় না – তবু একটা ধারণা যদি হয় – তাই এই প্রচেষ্টা ! দেখুন – আগামী দিনে পরমানন্দ-সূর্যের কিরণ যখন সম্পূর্ণ পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে – তখন সহস্র সহস্র দেশ-বিদেশের অনুরাগী ছুটে আসবে বনগ্রামে বা অন্যান্য আশ্রমে, তারা জানতে চাইবে পরমানন্দের খুঁটিনাটি, খুঁজে বেড়াবে ‘না-প্রকাশিত’ তথ্যাবলী (যেমনভাবে অজানা-অচেনা বিবেকানন্দের মত গ্রন্থ রচিত হয়), সূত্র ধরে ধরে মানুষ পৌঁছে যাবে পরমানন্দ ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের কাছে ! কিন্তু তখন তো তাদের বেশীরভাগেরই স্থূলশরীর আর পৃথিবীতে থাকবে না (যেমন এর মধ্যেই স্বামী পরমানন্দের অন্তরঙ্গ ভক্তদের মধ্যে মিহির মহারাজ, মদন মহারাজ, স্বামী শঙ্করানন্দ, স্বামী তপেশ্বরানন্দ, দেবেন্দ্রনাথ, চিদানন্দ প্রমুখেরা সহ বহু ভক্ত-শিষ্যরা শরীর ছেড়েছেন।), আর তখনই তাঁদের জীবনের এই ধরণের ছোট ছোট খন্ডচিত্রগুলিই পরবর্ত্তী গবেষকদের বা অন্বেষকদের কাজে লাগবে !
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন – ” সাধুকে দিনে দেখবি – রাতে দেখবি, তবে তো চিনবি !” কিন্তু ঠাকুর স্বামী পরমানন্দ বললেন – ” পুড়বে সাধু, উড়বে ছাই – তবে সাধুর গুন গাই !” অর্থাৎ শুধু একদিন বা একরাত্রি অথবা কয়েকদিন বা কয়েকরাত্রি নয় – সাধুর সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করে তবেই কোনো সাধু ব্যক্তির সাধুত্বের মূল্যায়ন হয়। আর তা না করতে পারলে ‘বোকা’ হয়ে যেতে হয়। এমন ‘বোকা বনে যাবার’ ঘটনা বহু মানুষের জীবনেই ঘটেছে ! তারা হয়তো দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের কোনো ব্যক্তিকে (সাধু-সন্ত বা ধার্মিক ব্যক্তি বলে পরিচিত) আদর্শ করে, তাঁকেই জীবন পথের ধ্রুবতারা করে এগিয়ে চলতে চায়। কিন্তু হয়তো কিছুকাল পরে সেই বিশেষ ব্যক্তিটির (সাধুসন্ত বা ধার্মিক ব্যক্তি) কিছু কথা বা কিছু আচরণ, তাঁর চিন্তাভাবনা বা সংস্কারের সঙ্গে মিললো না ! ব্যস্, অমনি এতদিনের ভক্তি-বিশ্বাস-ভালবাসা-শ্রদ্ধার সম্পর্কের একেবারেই ইতি !!
এই ধরণের ঘটনা ঘটলে কি হয় – না, ওই সাধারণ ভক্তটির জীবনে একটা ভীষণ দুর্যোগ নেমে আসে। পরবর্তীতে সে আর কাউকে বিশ্বাসই করতে পারে না – নিজেকে হয়তো ধর্মজগৎ থেকে সড়িয়েই ফেলতে চায় ! এরফলে তার আধ্যাত্মিক field- এ এগিয়ে চলার পথে বিশেষ বিঘ্নের সৃষ্টি হয়, মানুষের জীবনে এটা একটা বিরাট ধাক্কা ! যা সামলে ওঠা সত্যিই খুবই কষ্টকর !
কিন্তু কি হয় জানেন – যদি ঐরূপ কোনো ব্যক্তি তার সাধন-ভজনে প্রকৃত‌ই আন্তরিক হয়, তার মধ্যে যদি কপটতা না থাকে __ তাহলে ঐ ব্যক্তি দেখতে পায় যে, তার জীবনের কালো মেঘ কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিকতার আলো ছড়িয়ে পড়ছে ! কারণ খুব শীঘ্রই ওই ব্যক্তি সত্যিকারে কোনো না কোনো মহান মানুষের বা তার জীবনের ‘সত্যিকারের ধ্রুবতারা’-র সন্ধান পেয়ে যাবে। এমন ঘটনা আমাদের জানাশোনা অনেকের জীবনেই ঘটেছে – তাই এতোটা জোর দিয়ে বলতে পারলাম ! যাইহোক, এখন এসব কথা থাক ! আমরা চলে যাই পরমানন্দ পার্ষদদের কথায় ! আজ আমরা মদন মহারাজ বা চিৎবিলাসানন্দ মহারাজের কথা শেষ করে নতুন করে আলোচনা শুরু করবো বাউল বাবা স্বামী ভাগবতানন্দ মহারাজ বা সুকুমারদা সম্বন্ধে !
তার আগে মদন মহারাজ সম্বন্ধে বলি যে, উনি কিন্তু গুরু মহারাজের কাছে যথেষ্ট মর্যাদার জায়গায় ছিলেন। কারণ, গুরু মহারাজ কখনো ওনাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেন নি ! সবসময়েই _’বিলাসানন্দ’এবং ‘তুমি’ বলে কথা বলতেন। মদন মহারাজ, বনগ্রাম আশ্রমের বাইরে, পুরুলিয়া আশ্রমে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ করে শরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন ! ওনার এই অকাল প্রয়াণে পরমানন্দ ভক্তরা এবং বিশেষ করে আশ্রমের ছেলেরা (বাইরে যারা চলে গেছে_তারাও) খুবই মর্মাহত হয়ে পড়েছিল। ওনার শরীর ছাড়ার সাথে সাথেই পরমানন্দ জগতের এক মহা নক্ষত্রের পতন হয়েছিল। ওনার শুন্যস্থান কখনোই পূর্ণ হবার নয় ! আমরা বিনম্রচিত্তে সেই মহান মানুষটির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাই !!
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
স্বামী ভাগবতানন্দ ভক্তসমাজে “বাউল বাবা” নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন এবং এখনও এই নামেই পরিচিত রয়েছেন ! আসলে ছোটবেলা থেকেই উনি ‘বাউলভাবে’ অর্থাৎ উদ্দেশ্যহীনভাবে একটা একতারা সঙ্গে করে ঘুরে বেড়াতেন। কোথায় কোথায় তার দিন কাটতো – রাত কাটতো, কীভাবে তার আহার জুটতো – এগুলোর কোনোটাই ঠিক ছিল না। ঈশ্বরের ইচ্ছায় যা জুটতো তাতেই উনি সন্তুষ্ট থাকতেন। এইভাবে ছোট থেকেই একটা ভয়ঙ্কর ত্যাগ ও কৃচ্ছসাধনপূর্ণ জীবন ছিল সুকুমারের ! তাছাড়া যেহেতু উনি সঙ্গে একতারাটি সবসময়েই রাখতেন এবং সাথী পেলেই স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে গান-বাজনা শুরু করে উপস্থিত সকলকে মাতিয়ে রাখতেন। তাই এই অবস্থাতেও তার জনপ্রিয়তা কিছু কম ছিল না । তার জীবনযাত্রা, তার পোশাক-পরিচ্ছদ, তার শরীরের হাবভাব (বড় বড় চুল, কোমল স্বভাব, মিষ্টি সুরে কথা বলা), তার কন্ঠের বাউল গান – তাকে “বাউল বাবা” নামটি পেতে সাহায্য করেছিল।
‘বাউল বাবা’ ছিলেন নদীয়ার লোক। কৃষ্ণনগর অঞ্চলে ছিল তাঁর জন্মভূমি ! তাঁর পরিবারে বাবা-মা, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনেরা সকলেই ছিল_কিন্তু তবু ঘরের বাঁধনে তিনি কখনোই বাঁধা পড়েন নি। অল্প কিছুটা লেখাপড়া সাঙ্গ করেই উনি জীবিকার সন্ধানে চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। ছোট থেকে উনি যে ভালো সংগীত শিল্পী ছিলেন তাই নয় – উনি একজন প্রতিভাবান কাষ্ঠশিল্পীও ছিলেন। ‘কাষ্ঠশিল্পী’ নামটা ঠিকমতো grammertical হোলো কিনা জানিনা, তবে যেটা বলতে চাইলাম সেটা হোলো__ উনি একজন খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, নিখুঁত কাঠের কাজ জানা লোক ছিলেন এবং ওনার বিশেষত্ব ছিল এই যে, ওনার নতুন নতুন উদ্ভাবনী কৌশল_ উনি এই ধরণের কাজে ব্যবহার করতেন । আর তার এই বিশেষ পারদর্শিতার জন্যই তিনি কলকাতার একজন নামী contractor-এর অধীনে বড় বড় জায়গায় কাঠ, বোর্ড, প্লাইউড ইত্যাদির সাহায্যে designing-এর কাজ করতেন। (বাকি কথা পরে আলোচনা হবে৷) [ক্রমশঃ]