শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর শিষ্য-ভক্ত-পার্ষদদের কথা এখানে বলা হচ্ছিলো। এখন আমরা ছিলাম স্বামী ভাগবতানন্দ বা ‘বাউল বাবা’র কথায়। ‘বাউল’– এই নামটার প্রতি আমাদের সবার অর্থাৎ পরমানন্দ ভক্তদের সবার-ই একটা কেমন যেন দুর্বলতা কাজ করে ! শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ক কোনো কোনো গ্রন্থে লেখা ছিলো “ঠাকুর আবার বাউলবেশে বর্ধমানে আসবেন !” ব্যস্ – ওতেই আমরা যেন এই শব্দটায় একেবারে ‘কেনা’ হয়ে গেছি ! দেখুন – প্রকৃতপক্ষে কিন্তু আমরা অর্থাৎ পরমানন্দ ভক্তদের বেশিরভাগই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের‌ই ভক্ত ! ঠাকুরকে ধরেই তো আমরা ‘পরমানন্দ’কে পেয়েছি ! অবশ্য এমন অনেকেই রয়েছে যারা অন্যান্য পরম্পরার গুরুকে ধরেও পরমানন্দ মিশনে এসেছে এবং পরমানন্দকেই তার ইষ্ট করে নিয়ে ধন্য হয়েছে ! আসলে ভগবান স্বয়ং যখন সদ্গুরুরূপে লীলা করেন, তখন সমস্ত গুরুপরম্পরার গুরু-রাই সেই সদ্গুরুরূপ অবতার পুরুষের মধ্যে সম্পৃক্ত থাকেন ! ফলে যেকোনো পরম্পরার ভক্ত-সাধকেরা ঐরূপ সদ্গুরুর কাছে যখন যায় –তখন তারা তাঁর মধ্যে আপন আপন গুরুকেই দেখতে পায়। এই মহাবাউল, গুরুর গুরুকে ভক্তি করে- তাঁকে শ্রদ্ধা করে, তারা নিজের গুরুকে, নিজের পরম্পরাকে আরো বেশি বেশি শ্রদ্ধা করতে শেখে !
এমনটাই আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ! আমরা স্বামী পরমানন্দকে খুব কাছ থেকে দেখে অনেকটাই বুঝতে পারলাম – ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কেমন ছিলেন, বামদেব কেমন ছিলেন, মহাপ্রভু কেমন ছিলেন ! এটা অবশ্যই আপনারা বলতে পারেন__সেটা কি করে হয়
! তাঁরা তো প্রত্যেকেই অবয়বে, আচরণে, শিক্ষা দেবার ভঙ্গিমাতে – প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে যথেষ্টই পৃথক ! কিন্তু আমরা বেশ বুঝতে পারি__ একটা জায়গায় তাঁরা একেবারে এক ! তাঁরা সবাই তাঁদের স্ব-স্বরূপ সম্বন্ধে
সর্বদা সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত_অবস্থাতেই থাকেন ! বাল্যলীলা, কৈশোর লীলার ঘটনাসমূহ (যেগুলো দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় _ওনারা সাধারণ মানুষের মতোই! ওনারাও সাধন করেছেন- কষ্টে পড়েছেন-ঝামেলায় পড়েছেন __এসব দেখেই মানুষের ভুল হয়) দেখে, অনেক বড় বড় মহাত্মাদের‌ও চিনতে ভুল হয়!
কিন্তু এগুলো সব তাঁদের ছলা-কলা ! আজেবাজে ভিড় হটাবার কৌশল ! প্রকৃতপক্ষে, তাঁরা জানেন তাঁর স্বরূপ কি – তাঁরা সদা-সর্বদাই জানেন যে, _”তাঁরা ভগবান!” ফলে তাঁরা সকলে সেখানেই এক ! তাঁরা সকল মানুষকে তাদের নিজ নিজ চেতনার level অনুযায়ী জানেন। ফলে, যে কোনো মানুষের সঠিক মূল্যায়ন একমাত্র তাঁরাই করতে পারেন ! এইজন্যই অবতার পুরুষ বা মহাপুরুষদের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের মানুষের এমন এমন লীলা সংঘটিত হয় যে, বুদ্ধির দ্বারা সেগুলোর ব্যাখা করা যায় না !
তাহলে বোঝাই যাচ্ছে_অবতার পুরুষদের কাছে সেইভাবে __”আমরা-তোমরা”, “আমার দল”, “আমার পরম্পরা”– এইসব ভাব কাজ‌ই করে না ! তিনি নিজে পূর্ণ, তাই সকলকেই তিনি পূর্ণব্রহ্মের প্রকাশ হিসাবেই দেখেন !
ভগবান যখন কোনো মানুষকে একবার দেখেন, তখন তিনি সাথে সাথেই ঐ মানুষটির চেতনার level বুঝে যান ! এবার কোন্ ব্যক্তিকে তার নিজ নিজ level থেকে আরো উন্নতস্তরে কিভাবে নিয়ে যাওয়া যায় – তাঁরা শুধু সেই চেষ্টাটাই করেন !
এইটাই তাঁদের কাজ – এই কাজ করতেই তাঁদের আসা ! তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ জীবের কল্যাণার্থে – আত্মসুখের তিলমাত্র বাসনা তাঁদের থাকে না ! তাঁরা সমগ্র জীবন প্রচন্ড কষ্ট সহ্য করে যান – যাতে অন্যান্য সকল জীব একটু সুখে-শান্তিতে থাকতে পারে, সকলের চেতনার অগ্রগতি যেন অক্ষুন্ন থাকে !
সেইজন্য যে কোনো মহাপুরুষ যখনই কোনো উন্নত চেতনার মানুষের সংস্পর্শে আসেন – তখন তিনি খুবই প্রসন্ন হ’ন ! তিনি কখনোই তার জাত-কুল-মান-পরম্পরা ইত্যাদি দেখতে যান না ! তিনি ঐরূপ ব্যক্তিকে কাছে পেলেই, তাকে একান্ত আপন করে কাছে ডেকে নেন ! দেখুন – এই জগৎ তো ভোগবাদীতা নিয়েই মত্ত হয়ে রয়েছে ! এখানে ত্যাগের বাসনা কজনার রয়েছে ? তাই ‘ত্যাগী’ শুদ্ধসত্ত্ব ভক্তরা যেকোনো মহাপুরুষের কাছেই যেন “আনমোল রতন”! এইরকম ভক্তদেরকে তিনি কোলে করে রাখেন, একান্ত আপন করে রাখেন ! যেমন সাধারণ মানুষ বহুমূল্য রত্নকে দামী সিন্দুকে পুরে, দামী নরম কাপড়ে জড়িয়ে যত্ন করে রাখতে চায়__ মহাপুরুষরাও ঠিক তেমনি কোনো ত্যাগী ভক্তকে কাছে পেলে, তাকে একান্তভাবে আগলে আগলে রাখেন ! চোখে চোখে রাখেন ! ভক্তটির অজ্ঞাতেই তার সমস্ত অসুবিধা দূর করে_ তাকে অলক্ষ্য থেকে সাহায্য করে যান।
আমাদের আশ্রমের প্রবীন সন্ন্যাসী স্বামী শংকরানন্দ (কিছুদিন আগে শরীর ছেড়েছেন, এই ২০২১ সালেই) কথাপ্রসঙ্গে একদিন আমাকে বলেছিলেন যে, ‘গুরুমহারাজ ওনাকে ওনার ছোটো বয়স থেকেই চোখে চোখে রেখেছিলেন ! যখন গুরুমহারাজের স্থূলশরীরটার জন্মই হয়নি – তখনও ‘উনি’ নজরে রেখেছিলেন !’ এই কথাটা সত্য ! গুরু মহারাজের ঐ কথাগুলো শুধু শংকরানন্দ মহারাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, পরমানন্দ ভক্ত সকলের ক্ষেত্রেই সত্য !
তবে – এই যে বলা হোলো, গুরু মহারাজের যখন স্থুল শরীরের জন্ম‌ই হয় নি, তখন‌ও “উনি” ভক্তদের নজর রাখতেন ! এই ”উনি”-টা ‘কে’ বা ‘কি’ ? এই “উনি”-র স্থুলশরীর থাকলেও ‘উনি’, শরীর না থাকলেও ‘উনি’ ! এইটা বুঝতে পারলেই আর বিভেদ থাকে না, বিরোধ থাকে না, অসহিষ্ণুতা থাকে না ! এই কথাগুলো বোঝা হয়তো একটু কঠিন – কিন্তু একটু গভীরে চিন্তা করলে বোঝা যায় ব‌ই কি ! এটা তো বোঝা সহজ যে, যত উঁচুতে ওঠা যায় ততই নিচের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভেদগুলো আর থাকে না ! সব কেমন যেন একাকার হয়ে যায় ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন যে, ‘মহাকাশ থেকে একমাত্র হিমালয়কে(কেউ কেউ চীনের প্রাচীরের কথাও বলেন) আলাদা করে দেখা যায়, তাছাড়া প্রায় বাকি সবই একই রকম’ |
এই কথাগুলোই বলা হচ্ছিলো – মানবসমাজেও উন্নত মানব অর্থাৎ যে মানুষ চেতনায় উন্নত – তাকে দেখলেই যেকোনো মহাত্মা-মহাপুরুষ-সদ্গুরু সাথে সাথে তাকে আপন করে নেন এবং জীবকল্যাণে তার ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন ! তাছাড়া, কিভাবে সেই ব্যক্তির দ্বারা আরো বেশি বেশি মানবকল্যাণ বা জীবকল্যাণ হতে পারে – তার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে তাকে তৈরি করে নেন।
এইভাবেই গুরুমহারাজের সান্নিধ্যে যখন একজন একজন করে ত্যাগী-ভক্তেরা আসতে শুরু করেছিল, তখন গুরুমহারাজ তাদের জন্য তাঁর কোল পেতে দিয়েছিলেন বা বুকে করে ধরে রেখেছিলেন ! কারণ এরা সকলেই যে তাঁর “আনমোল রতন”! সান্নিধ্যে আসার আগে থাকতেই তিনি এদের সবার প্রতি নজর রেখেছিলেন ! আমাদের বর্তমান আলোচনার ব্যক্তি স্বামী ভাগবতানন্দকেও উনি ছোট থেকেই অদৃশ্য থেকে নজরে রেখেই, ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করছিলেন !!!! [ক্রমশঃ]