শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের নিয়ে এখন আমাদের আলোচনা চলছিলো। সেই প্রসঙ্গেই আমরা ছিলাম স্বামী ভাগবতানন্দ বা বাউল বাবার কথায়। গুরুজীর সাথে ওনার প্রথম সাক্ষাতের দিনের কথা হচ্ছিলো। সেটা ছিলো এমন একটা ঘটনা, যেটাকে নিতান্ত সাধারণ ঘটনা মোটেই বলা যাবে না ! কারণ__ এই ঘটনার সঙ্গে devine plan বা মা জগদম্বার ইচ্ছার একটা বিরাট সম্পর্ক রয়েছে ! মহারাজরা আশ্রমে পৌঁছানোর আগেই গুরুমহারাজ সকলকে বলে-কয়ে, সমস্ত রকমের ব্যবস্থা পাকা করে, বনগ্রাম আশ্রমে ওনার ছোট্টো কুটিয়ায় নির্বিকল্পের আসনে বসে পড়েছিলেন ! ওনার কুটিয়ায় দরজা বন্ধ অবস্থায় দু’রাত এবং প্রায় দেড়দিন কেটেও গিয়েছিল ! এরপরে ভাগবতানন্দ মহারাজদের আগমন (যা পূর্বনির্দিষ্ট ছিল, কেন না গুরুমহারাজ অনেককে বলেছিলেন যে, _”কালনা অঞ্চল(ধাত্রিগ্রাম) থেকে একজন আমাকে গান শোনাতে আসবে”। কিন্তু মহারাজ নির্দিষ্ট দিনে আসেন নি _ দুদিন পরে এসেছিলেন!) এরপরেই গুরুমহারাজের সংকল্প-সিদ্ধির ‘ছন্দ’ কেটে যাওয়া ! এগুলি আধ্যাত্মিক জগতের ইতিহাসে সাংঘাতিক ঘটনা নয় কি !!
ভাগবতানন্দ মহারাজ (তখন সুকুমার দা)-এর সাথে যখন সেইদিনেই গুরুমহারাজের একান্ত কথাবার্তার সুযোগ হয়েছিল, তখন মহারাজ গুরুজীকে তার এই ‘ছন্দ’ কাটার জন্য নিজেকে দায়ী করতেও চেয়েছিলেন ! কিন্তু গুরুমহারাজ এর উত্তর কিভাবে দিয়েছিলেন – সেসব কথায় পরে আসছি ! আগের কথা আগে বলে নিই। সেদিন ‘গুরুজী’ (তখন রবীনদা, কারণ তখনও গুরুমহারাজের সন্ন্যাস সংস্কার হয়নি!) তাঁর ঘরের দরজা খুলেছেন শুনে মুখার্জি বাড়ির প্রায় সকলেই আশ্রমের দিকে ছুটেছিল, বাউলবাবারাও গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে ওনারা দেখেছিলেন যে, গুরুমহারাজের কুঠিয়ার (ছোট ঘর) দরজাটি খোলা, গুরুমহারাজ দরজার দিকে পা-করে শুয়ে রয়েছেন – মাথাটা উত্তরদিকে !
উপস্থিত সকলেই যখন ওনাকে নিয়ে ব্যস্ত, সেই সুযোগে বাউল বাবা, গুরুমহারাজের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে চেয়েছিলেন ! কিন্তু এ কি ! পা-দুটো তো মৃতদেহের চেয়েও বেশি ঠান্ডা ! তখন শীতকাল ছিল (মাঘ মাস), তায় আবার দুদিন ধরে বৃষ্টি হয়েছে ! ফলে কনকনে হিমেল বাতাস বইছিল – তাই এমনিতেই সাধারণ মানুষের হাত-পা-ই ঠান্ডায় হিম হয়ে যাচ্ছিলো, আর গুরুমহারাজ তো প্রায় নিস্পন্দ অবস্থায় শুয়েছিলেন – ওনার শরীরের তখন কোনো হুঁশ‌ই ছিলই না !
গ্রাম থেকে সকলে মিলে গুরুমহারাজের ঘরে যাবার পর ন’কাকা বা মিহির মহারাজ অথবা অন্য কেউ (যেটা ভাগবতানন্দ মহারাজের আর স্মরণে নাই) গুরুজীর মুখে একটু জল দিয়েছিল – কিন্তু জল গড়িয়ে পড়ে গেছিলো ! শ্বাস-প্রশ্বাসও চলছিল না, একদম শবদেহের লক্ষণ ! কিন্তু মহারাজ(বাউল বাবা) ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেছিলেন যে, গুরুজীর কপালটা যেন উজ্জ্বল এবং সেখান থেকে যেন একটা জ্যোতিঃ বেরিয়ে আসছে, আর সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম !
উপস্থিতজনের প্রচেষ্টায় কোনো কাজ সম্ভবতঃ হয়নি – যা হয়েছিল মা জগদম্বার ইচ্ছাতেই ! কেননা অনেকের সাথে বাউলবাবারাও কুটিয়ার বাইরে রবীন-সাধুকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ! আধঘণ্টার মধ্যেই ওনারা দেখেছিলেন রবীনদা বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন –বাইরে এসে উনি পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলেন ! মিহির মহারাজ ওনাকে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়েছিলো – উনি সেটাকে মুখে ধরে টেনেই চলেছেন – টানছেন তো টানছেনই ! সমগ্র সিগারেটটাই পুড়ে গেল এবং শেষটা হাতে তাপ লাগায় ছেড়ে দিলেন, ফলে টুকরোটা পড়ে গেছিলো !
সেইসময় অনেকেই ওনাকে নানারকমভাবে কথা বলানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু উনি কারো কোনো কথারই তেমন উত্তর দিচ্ছিলেন না – কেমন যেন উদাস দৃষ্টিতে দূরের দিকে, আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে ছিলেন। গুরুজীকে – ভালোভাবে সেই প্রথম দেখলেন বাউলবাবা ভগবতানন্দ মহারাজ ! দেখেই মজেছিলেন – কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা অপরাধবোধও কাজ করছিল, তাই যা হোক করে ওনার সাথে হৃদয়ের সেই ব্যথাটাও নিবেদন করার সুযোগ খুঁজছিলেন তিনি ! এমন সময় জ্যাঠামশাই অর্থাৎ দেবীপ্রসাদবাবু (ন’কাকার বড়দাদা) গুরুমহারাজের কাছে এগিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলেন – ” রবীন ! বাড়ী যাবে তো ? তাহলে চলো আমার সাথে।” দেবীবাবুর কথার উত্তর দিয়েছিলেন গুরুমহারাজ, কিন্তু ওনার গলায় যেন ছিল ৺রীমায়ের আদরের ছেলের অভিমানী সুর – ” *মা*-কে বলে দেবেন, আর তাঁকে ডাকবো না !” এরপর দেবীবাবু চলে গিয়েছিলেন।
এই তো সুযোগ ! এই সুযোগ যেন গুরুজীই ভাগবতানন্দ মহারাজকে করে দিয়েছিলেন ! ফলে মহারাজ তাড়াতাড়ি গুরুমহারাজের কাছে গিয়ে বলেছিলেন – ” এটা তো মায়ের দোষ নয়, হয়তো এর জন্য আমি-ই দায়ী ! দোষটা হয়তো আমার !” বাউলবাবার এই কথা শুনেই গুরুমহারাজ তাঁর উর্ধ্বমানসচেতনার স্তর থেকে অনেকটা যেন নেমে এলেন এবং উনি গটমট্ করে (চোখ পাকানোর মতো করে) মহারাজের দিকে তাকালেন ! (পরের অংশ পরেরদিন!) ….. [ক্রমশঃ]