শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর প্রিয় ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের সম্বন্ধে এখানে নানান কথা আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন আমরা বাউলবাবা বা স্বামীর ভাগবতানন্দ মহারাজকে নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এখানে ‘ওনাকে নিয়ে আলোচনা’- বললে কিছুটা ভুল বলা হবে – প্রকৃতপক্ষে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সবসময়েই সেই একজন – স্বামী পরমানন্দ ! স্বামী পরমানন্দের কথা বলতে গেলেই অন্যান্য ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদ ইত্যাদিদের কথা আলোচনা প্রসঙ্গে এসেই যায়। এখানেও সেই ভাবেই সবকিছু আসছে !
কথাতেই আছে ‘ভক্তের ভগবান !” ভক্তমন্ডলী না থাকলে ভগবানের ‘মহিমা’ কোথায় প্রস্ফুটিত হবে ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন – ” ভক্তের হৃদয় ভগবানের বৈঠকখানা !” ‘বৈঠকখানা’ কথাটির উল্লেখ করা হয়েছিল এইজন্য যে, বাড়ির মালিক বা গৃহকর্তা বাড়িতেই অধিক্ষণ থাকেন, কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি এসে বাড়ির বাইরের দিকে অবস্থিত বৈঠকখানা ঘরে এসে বসেন। সেখানে ইয়ার-বন্ধুরা জড়ো হয়, তাদের সঙ্গে ‘তামুক'(হুঁকো-কলকে, গড়গড়া ইত্যাদির দ্বারা তামাক খাওয়া) খাওয়া হয়, দাবা-তাস-পাশা খেলা হয়, হালকা ইয়ার্কি হয়, মৌজ-মস্তি হয় – আবার সেইখানেই গ্রামের আর পাঁচটা সাধারণ মানুষজনেরা বাবুর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ পায়, দুটো অভাব-অভিযোগের কথা বলার সুযোগ পায় ! আর এই সময়ে বাবুর মেজাজ হালকা-পুলকা থাকে বলে সবার আরজি মঞ্জুর-ও হয়ে যায় ! বাবু কোনো কারণে নিমরাজি হোলেও, ঐখানে উপস্থিত মোসাহেবদের অনুরোধে বাবু পুনরায় রাজি হয়ে যান।
এইজন্যেই ভক্তহৃদয় বোঝাতে ‘বৈঠকখানা’ কথাটির ব্যবহার হয়েছে ! ভক্ত ভগবানের খুবই প্রিয় ! ভক্তের প্রার্থনায় ভগবান ব্যাকুল হয়ে পড়েন। ভক্তবৎসল হরি, ভক্তের প্রতি তাঁর চরম বাৎসল্য (মায়ের যেমন সন্তানের প্রতি – এক্ষেত্রে যেন তারও শতসহস্রগুণ ! তাইতো সাধারণ মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে সরাসরি ভগবানের কাছে না ছুটে_, আগে তার গুরুর কাছে, অথবা গুরুস্থানীয় কোনো মহাসাধক, মহাযোগী, মহাভক্তের কাছে আগে ছোটে ! তারপর সেই ‘ভগবানের ভক্ত’ যখন তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন – ” যাও, তোমার মনের কথা, অন্তরের ব্যথা ‘ঠাকুর’-কে নিবেদন করো-গে যাও ! আমিও জানাচ্ছি, তুমিও জানাও !” এরপর ঐ ভক্ত কোনো না কোনো দেবস্থানে যায় –অথবা নিজগৃহে থেকেই দেবতার কাছে মানত করে !
কিন্তু এইসব মানুষেরা জানে যে, তার প্রার্থনায় কাজ না হোলেও ঐ মহাসাধকের (প্রকৃত কোনো ভক্ত, যোগী বা মহাত্মা) প্রার্থনায় নিশ্চয়ই কাজ হবে। কারণটা আগেই বলা হয়েছে__ ‘ভক্ত যে ভগবানের সবচাইতে প্রিয়’ !
পাঠকদের প্রতি অনুরোধ___ দয়া করে ব্যাকরণগত ভুল ধরবেন না – এখানে মহাসাধক, মহাযোগী, মহাভক্ত ইত্যাদির সকলকেই ঈশ্বরের ‘ভক্ত’ হিসাবেই মান্যতা দেওয়া হয়েছে !
যাইহোক, আমরা ছিলাম স্বামী ভাগবতানন্দের কথায় অর্থাৎ ওনার প্রথমদিন পরমানন্দ মিশনে আসার কথায়। যদিও তখনও (অর্থাৎ বনগ্রাম আশ্রমে গুরুজীর কুটিয়া নির্মাণের Just পরেই) আশ্রমের নাম ‘পরমানন্দ মিশন’ হয়নি – তখন গুরুজী আশ্রমের নাম দিয়েছিলেন “ঠাকুরদাস আশ্রম” !ঠাকুর-দাস কেন ? তার কারণটা ছিল – তখন গুরুমহারাজের ‘ভাব’ ছিল যে, যেহেতু এই যুগটা শ্রীরামকৃষ্ণের ‘যুগ’ চলছে এবং এই ‘যুগে’ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে অতিক্রম করা যাবে না, মানবের আধ্যাত্মিক কল্যাণ করতে গেলে ঠাকুরকে মাথায় নিয়েই তা করতে হবে ! তাহলে, সেই অর্থে – সকলেই ঠাকুরের দাস ! সেইজন্যেই “ঠাকুরদাস আশ্রম” !
সেদিন প্রায় দুপুরের দিকে ‘ঠাকুরদাস আশ্রমে’ গিয়ে পৌঁছেছিলেন বাউলবাবা, এবং তাঁর সাথে ধাত্রীগ্রামের (মালতিপুরের) গোবিন্দ প্রামাণিক সহ আরো দু-চারজন সাথীও ছিল। আগের একটা আলোচনায় আমরা উল্লেখ করেছিলাম যে, ভাগবতানন্দ মহারাজরা দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার আগেই বনগ্রামের মুখার্জিদের কালীমন্দিরে গান-বাজনা শুরু করেছিলেন – কিন্তু এই তথ্যটা ঠিক ছিল না ! গান-বাজনা হয়েছিল খাওয়া-দাওয়ার পরে বিকাল বা সন্ধ্যার দিকে এবং তা হয়েছিল গুরুমহারাজের কথা অনুসারেই ! আসছি সেইসব কথায় !
সেদিন তপিমায়ের মুখ থেকে “রবীনদা দরজা খুলেছে”– এই কথা শুনেই বাড়ির প্রায় সকল পুরুষ সদস্যদের সাথেই ভাগবতানন্দ মহারাজরাও আশ্রমে গিয়েছিলেন এবং কুটিয়ায় শায়িত গুরুমহারাজের “হিমঠান্ডা” শরীর দেখে “শবদেহ”-ই মনে করেছিলেন ! কিন্তু ওই শরীরের কপালের অংশে উজ্জ্বল জ্যোতি এবং সেখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে মহারাজ নিশ্চয় করতে পেরেছিলেন যে, – গুরুজী অন্তর্লীন ধ্যানের গভীরতা মধ্যে রয়েছেন। তবে, এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গুরুমহারাজ বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং আরো কিছুটা পরে উনি প্রায় স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতে শুরু করেছিলেন। সেই সুযোগেই বাউলবাবা গুরুমহারাজের কাছে গিয়ে নিজের দোষ স্বীকার করতে চাইলে__ উনি চোখ পাকিয়ে মহারাজের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। তারপর একেবারে শান্ত কন্ঠে বাউলবাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ” তুমি কি ধাত্রীগ্রাম থেকে আসছো ?” উনি উত্তর দিয়েছিলেন – ” হ্যাঁ, আপাততঃ ওখান থেকেই আসছি।” এরপর গুরুমহারাজ একেবারে শান্ত কণ্ঠস্বরে মায়ের মতো করে সহজ সস্নেহে বলেছিলেন – ” যাও, গ্রামে গিয়ে মায়ের মন্দিরে বসে গান করো, ওখানেই আমাদের দেখা হবে৷” এই কথার পরেই ওনারা আশ্রম থেকে বনগ্রামে ফিরে আসেন এবং সেখানে মুখার্জিদের কালীমন্দিরে বসে গান-বাজনা শুরু করেছিলেন৷ সেদিন ওখানে গ্রামের বহুলোক জড়ো হয়েছিল, গুরুমহারাজও এসেছিলেন – এইসব কথা পরেরদিন। …… [ক্রমশঃ]