শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের সম্বন্ধে কথা হচ্ছিলো। এখন আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের একজন ত্যাগী সন্ন্যাসী-শিষ্য স্বামী ভাগবতানন্দের কথায়। গুরুমহারাজের সাথে ঘটনাবহুল প্রথম সাক্ষাতের পর ভাগবতানন্দজী কলকাতায় ফিরে যান। গুরুমহারাজ ওনাকে যে দীক্ষামন্ত্র লিখে দিয়েছিলেন – সেইটাকে সম্বল করে এবং অবসর সময়ে ধ্যান-জপ করেই ওনার সময় কাটছিল। অবশ্য সেইসময় ওনার গর্ভধারিনী জননী এবং জন্মদাতা পিতার কথা ভেবে এবং পরিবারের প্রয়োজনে উনি একটা কনট্রাকটরের অধীনে কাঠের কাজ করতেন।
১৯৭৯ সালের (শেষের দিকে) ভাগবতানন্দ মহারাজ আরো একবার বনগ্রাম আশ্রমে এসেছিলেন – সেই সময় গুরুমহারাজের সাথে একান্তে ভাগবতানন্দ মহারাজের অনেক কথাই হয়েছিল, সেইসব কথায় আসছি__কিন্তু তার আগে সেই সময়কালীন (গুরু মহারাজের হঠাৎ করে নির্বিকল্প সমাধি ভেঙে যাবার পর) গুরুমহারাজের অবস্থার কথাটা একটু আলোচনা করে নেওয়া যাক্। গুরুমহারাজ নির্বিকল্পে বসেছিলেন সরস্বতী পূজার দিন অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে। বনগ্রামে ওনার কুটিয়ায় নির্বিকল্পের ছন্দ কেটে যাওয়ায়, উনি পরের দিন-ই তৃষাণ মহারাজের সাথে চলে যান মধ্যমগ্রাম (সাতগেছিয়ার কাছে মাঝের গাঁ, তৃষাণ মহারাজের জন্মস্থান।)। যদিও ওই স্থানটি fix করার আগে ওনারা সাতগেছিয়ার কাছাকাছি একটা গ্রামে শম্ভু মহারাজ (স্বামী সত্যানন্দ)-এর বাড়ির কালীমন্দিরে বসা যায় কিনা – তা দেখতে গিয়েছিলেন। ওখানেই দুপুরে সামান্য খাবারের আয়োজন ছিল। ওখান থেকে সরাসরি ওনারা সন্ধ্যার সময় (যাতে বাইরের লোক গুরুজীকে দেখতে না পায় – কারণ মাঝের গাঁয়ে উনি ইলেকট্রিফিকেশনের কাজ করায় উনি বহু লোকের কাছে-ই রবীনদা পরিচিত-ই শুধু নয়, জনপ্রিয়ও ছিলেন।)মাঝের গাঁয়ে, তৃষাণ মহারাজের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন !!
মাঝের গাঁয়ের বাড়িতে ঢোকার পরেও একমাত্র তৃষাণ মহারাজের বাবা এবং দিদি পুতুল-মা (প্রবাজিকা রামকৃষ্ণপ্রাণা) ছাড়া বিশেষ কেউ জানতোই না যে, গুরুমহারাজ কালীঘরের (তখন মন্দির ছিল না, কালীঘরের মতো ছিল) ভিতরে নির্বিকল্পের জন্য বসে পড়েছেন ! মোট ২১ দিন সময় লেগেছিল গুরুমহারাজের নির্বিকল্প সম্পন্ন করার জন্য। এই সময়টা কম কিছু নয় ! তৃষাণ মহারাজের বাবা (পঞ্চানন বন্দ্যোপাধ্যায়) মা কালীর নিত্যপূজা করতেন – ফলে এ ক’দিন তাঁকে ঘরের বাইরের দাওয়ায় বসেই ৺রী মায়ের উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করে_& পূজা করতে হয়েছিল এবং সন্ধ্যার ‘শীতল’-ও সেইভাবেই দিতে হয়েছিল। একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পুরোহিতের কাছে এইটা মেনে নেয়াটাও বড় কম কথা নয় ! এঁরা সাধারণত পূজার ব্যাপারে খুবই গোঁড়া হ’ন – কিন্তু পঞ্চানন ব্যানার্জি যে কতটা উদার এবং আধুনিক মনোভাবাপন্ন বা সংস্কারমুক্ত ছিলেন – সেটা এই ঘটনাতেই বোঝা যায়। অবশ্যই__ এই ঘটনার বেশ কিছুদিন আগে (প্রায় দু-তিন বছর আগে) গুরুমহারাজ (তখন রবীন) যেহেতু মাঝের গাঁয়ে ক্যাম্প করে ইলেকট্রিফিকেশনের কাজ করেছিলেন, তখন গ্রামের স্কুলের মাস্টারমশাই পঞ্চানন বাবুর সাথে গুরুমহারাজের বেশ ভালোই আলাপ হয়েছিল। পরে তৃষাণ মহারাজ এবং পুতুল-মার সাথে যখন গুরুমহারাজের অন্তরঙ্গতা তৈরি হয় এবং গুরুমহারাজ ওনাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া শুরু করেন – তখন পঞ্চানন ব্যানার্জির সাথে গুরুমহারাজের একটা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক (কেননা সাধন-ভজন করার সময় ওনার__ গুরু মহারাজকে নিয়ে নানা রূপ দর্শন হয়েছিল) গড়ে উঠেছিল।
যাইহোক, এইসব বিভিন্ন কারণেই উনি (পঞ্চানন বাবু) তৃষাণ মহারাজের অনুরোধে ৺রী মায়ের নিত্যপূজা, ঘরের বাইরে থেকেই করতেন। এরপরের ঘটনা তো আপনাদের অনেকেরই জানা ! ২১ দিনের দিন গুরুমহারাজের শরীর কাত হয়ে পড়ে গিয়েছিল ! গুরুমহারাজের এটাই নির্দেশ ছিল যে, ” শরীরটা যেদিন পড়ে যাবে – তখন জানবে যে, আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে !” সুতরাং এরপরেই তৃষাণ মহারাজরা গুরুমহারাজের শরীরটাকে বাইরে বের করে আনেন এবং সেবা-শুশ্রূষার কাজে লেগে যান। কিভাবে সেই জড়বৎ শরীরে চেতনা আনতে হবে – তাও গুরুমহারাজ নির্বিকল্পে বসার আগেই বলে দিয়েছিলেন ! অনেক কিছু কবিরাজি materials জোগাড় করে রাখতে হয়েছিল। সেইসব প্রয়োগ করে খুবই ধীরে ধীরে গুরুমহারাজের শরীরের sensation ফিরে এসেছিল, তাছাড়া এর পর থেকে তাঁর চোখের দৃষ্টি ফিরে এসেছিল, মুখের উচ্চারণ ফিরে এসেছিল !
এইসব ঘটনা যেন আধ্যাত্মিক জগতের একটা দিগন্ত খুলে দিতে পারে ! যাঁরা ওই সময়ের সাক্ষী (তৃষাণ মহারাজ, পুতুল-মা বা ওনার বাড়ির লোকজন, বনগ্রামের মুখার্জি বাড়ির অনেকে, কয়েকজন ব্রহ্মচারী মহারাজেরা ইত্যাদি) বা ঐ সময়ে তাঁর সেবা করেছিলেন, তাঁরাও পরমানন্দ-লীলায় এক-একজন দিকপাল হয়ে থেকে যাবেন !
ভাগবতানন্দ মহারাজকে আমি এটাই জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে (অর্থাৎ প্রথম আগমনের ছয়-সাত মাস পরে) যখন আপনি দ্বিতীয়বার বনগ্রামে গিয়েছিলেন – তখন গুরুমহারাজকে কি একেবারে স্বাভাবিক অবস্থাতেই দেখেছিলেন – না তখনও চোখের চশমা ছিল বা ওনার অন্যান্য অসুবিধা ছিল ? উনি বলেছিলেন, ” না – না ! ওইসব কোনো শারীরিক সমস্যা তখন গুরুজীর ছিল না ! তখন উনি একদম তরতাজা অবস্থাতেই ছিলেন এবং আমার সাথে দীর্ঘসময় ধরে কথা বলেছিলেন।” [ক্রমশঃ]