শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের নিয়ে এখানে আলোচনা হচ্ছিলো। গত তিন দিন আগে অর্থাৎ 24/08/2021 তারিখে, স্বামী পরমানন্দের আরো একজন সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী অখন্ডানন্দ অমৃতলোকে যাত্রা করলেন ! উনি বনগ্রাম আশ্রমে ‘মানিক মহারাজ’ নামেই পরিচিত ছিলেন। বলা চলে মানিক মহারাজ প্রায় প্রথম থেকেই বনগ্রাম আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ! কেননা, মানিক মহারাজের বাবা মোহন-কবিরাজ মশাই, বনগ্রাম অঞ্চলের পোস্টঅফিসের ডাকপিয়নের চাকরি করতেন। সেই হিসাবে উনি বনগ্রামের বেশিরভাগ মানুষের খুবই পরিচিত ছিলেন। ফলে ১৯৭৮ সালে যখন প্রথম গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ বনগ্রামে ‘পা’ রেখেছিলেন, সেইদিনেই বা তার পরদিন-ই কবিরাজমশাই গুরুদেবের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলেন।
মোহন কবিরাজ ছিলেন কবিরাজ-বংশের সন্তান। সেই হিসাবে উনি পিওনের চাকরি করলেও পারিবারিক কবিরাজীটা side-by-side একটু-আধটু ধরে রেখেছিলেন। গুরু মহারাজের নির্বিকল্পের (১৯৭৯) পরে গুরুমহারাজের শরীরে ‘সাড়’ ফিরিয়ে আনতে বা অন্যান্য অসুবিধা দূর করতে – কবিরাজমশাই-এর দাওয়াই যথেষ্ট কাজে এসেছিল। তাছাড়া গুরুমহারাজ নিজে যে সমস্ত দাওয়াই-এর কথা আগে থেকেই ন’কাকাদের কাছে(মুখার্জি বাড়িতে) বলে গিয়েছিলেন, সেগুলিও কবিরাজমশাই জোগাড় করে দিয়েছিলেন। তাই মোহন কবিরাজমশাই-এর সন্তান হিসাবে ‘মানিক মহারাজ’ একেবারে প্রথম দিকেই গুরুমহারাজের (তৎকালীন রবীন-সাধু) নাম শুনেছিলেন এবং তাঁকে দেখেছিলেন। এইবার পূর্বসংস্কারবশতঃ উনি গুরুমহারাজের কাছে আসা-যাওয়া করতে থাকেন এবং একদিন decision নেন যে, গৃহে ফিরে না গিয়ে – গুরুমহারাজের কাছেই থেকে যাবেন। সেইমতো, তিনি আশ্রমেই থেকে গিয়েছিলেন। যখন বনগ্রাম আশ্রমে গুরুমহারাজের কুটিয়া ছাড়া অন্য কোনো ঘর ছিল না – তখনই মিহির মহারাজ, খোকন মহারাজ, দেবেন্দ্রনাথ, প্রশান্ত মহারাজ প্রমুখদের সাথে__ উনিও বনগ্রামের মুখার্জিবাড়ির কালীমন্দির প্রাঙ্গণে যে টিনের চালাঘর রয়েছে, ওখানেই থাকতে শুরু করেছিলেন।
সেইসময় ঐসমস্ত ত্যাগী ব্রহ্মচারীগণের সে কি তীব্র বৈরাগ্য ! সারাদিন শুধু ধ্যান-জপ আর সৎপ্রসঙ্গেই কেটে যায় ! আবার সারারাত্রির যতক্ষণ জেগে থাকা যায়__তখনও শুধুই ধ্যান-জপ ! কেউ কেউ আবার সকলের অসাক্ষাতে আলাদা করেও ধ্যান-জপে মগ্ন ! সেইসব দিনের কথা এখনো অনেক মহারাজগণ যখন স্মৃতিচারণ করেন – তখন তাঁদের চোখে-মুখে যেন আনন্দের একটা লহর খেলে যায় ! তখন __সেই ভোর-রাতে উঠে গুরুজীর ঘরে গিয়ে ধ্যান-জপ করতে হতো ! ওনারা দেখতেন গুরুজী মাটির বেদীতে শুয়ে দিব্যি নাক ডাকছেন, কিন্তু যেই না _ তরুণ ব্রহ্মচারীরা কেউ হয়তো একটু-আধটু অন্য কিছু ভেবেছে অথবা কেউ একটু অন্যকে খুনসুটি করেছে – সঙ্গে সঙ্গেই গুরুমহারাজের জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে সতর্কীকরণ শোনা গেছে। আবার এমনও হয়েছে যে, গুরুমহারাজ পরে হয়তো ওনাদের কাছে, ভোরে ধ্যান করাকালীন – কার মনোজগতে কি ভাবনা চলছিল, তা গরগর করে বলে দিতেন ! পরমানন্দ-রূপ আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে আর আড়াল করবে কি করে – ওখানে সবাই open, সবার সব-ই open !
যাইহোক, আজকে আমরা ছিলাম মানিক মহারাজের কথায়। বনগ্রামের মুখার্জিবাড়ির কালীমন্দিরের ঘরে থাকতে-থাকতে ওইসব তরুণ ব্রহ্মচারীদের একাংশের একটা ‘জোট’ হয়ে গেছিলো এবং তাঁরা ‘চা’ খাবার নেশায় বনগ্রামের দু-একটা বাড়িতে বিশেষতঃ নবু-মাস্টারের বাড়িতে যাওয়া-আসা শুরু করেছিল। সেই দলের মধ্যেই একজন ছিলেন – মানিক মহারাজ। প্রথম থেকেই মানিক মহারাজ অদ্বৈত-বেদান্তবাদী মনোভাবাপন্ন ছিলেন। ফলে ঐ গ্রুপটির সদস্যদের মধ্যে আলোচনাকালে অদ্বৈতবাদের-ই প্রাধান্য থাকতো। আচার্য শঙ্করের বইগুলি এবং অধ্যাত্ম-রামায়ণ পাঠও খুবই চলতো। মিহির মহারাজ (স্বামী প্রজ্ঞানন্দ)-এর কাছে আমি এই কথাগুলি শুনেছিলাম। উনি আরও বলেছিলেন যে, ওদের মধ্যে তখন কর্মবাদ, মায়াবাদ ইত্যাদি নিয়ে এমন তর্ক-বিতর্ক হোতো যে, একসময় সকলেই চুপ করে যেতেন। পরে, গুরুমহারাজের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে_উত্তর জানতে পারলে__তবে মীমাংসা হোতো। বলাই বাহুল্য, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানিক মহারাজের যুক্তিই অধিক প্রাধান্য পেতো। কারণ বরাবরই কথা বলার “মুখ-জোর” ওনার খুবই ছিল ।
কিন্তু এইসব করতে গিয়ে বা অন্যান্য কারণে ব্রহ্মচারীদলের ঐ গ্রুপটির সদস্যবৃন্দ “বনগ্রাম আশ্রম” গঠনের মূল কর্মকান্ড থেকে যেন একটু দূরে সরে যেতে লাগলেন। তখন গুরুমহারাজ তাঁদেরকে বিধান দিলেন যে, তাঁরা প্রত্যেকে যেন পৃথক পৃথক স্থানে গিয়ে এক একটা আশ্রম তৈরি করে সেবামূলক কাজ করে ! মানিক মহারাজ সেইমতো বাঁকুড়া অঞ্চলে চলে যান এবং সেখানে ফুলকুশুমার সন্নিকট ধরমপুর নামক আদিবাসী-অধ্যুষিত একটি গরিব এলাকায় গিয়ে থাকতে শুরু করেন। কিভাবে তিনি ওখানে গিয়েছিলেন_সেইসব আলোচনা পরের দিন ‼️ [ক্রমশঃ]
