শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন আমরা রয়েছি মানিক মহারাজ (স্বামী অখন্ডানন্দ)-এর কথায়। আমরা জানতে চাইছিলাম – কিভাবে তিনি ধরমপুর আশ্রমে গিয়ে পৌঁছেছিলেন (পরবর্তীতে আমরা দেখেছি যে, তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি ঐ আশ্রমেই কাটিয়েছিলেন) ! এখন তো ওই আশ্রমেই ওনাকে সমাধিস্থ‌ও করা হোলো (ওনার অন্তিম ইচ্ছামতোই ওনাকে ধরমপুর আশ্রমের মন্দিরের পাশে, ওনারই নির্দিষ্ট করা জায়গায় ‘সাধুদের সমাধিস্থ করার নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে’– সমাধি দেওয়া হয়েছে।), ফলে আরও বহুদিন ওনার অস্তিত্ব, ওনার স্মৃতি ঐ আশ্রমকে কেন্দ্র করে থেকেই যাবে।৷
যাইহোক, আমরা আমাদের পুরোনো আলোচনায় ফিরে যাই – কিভাবে মহারাজ ধরমপুর আশ্রমে এসেছিলেন – সেই কথায়! আমরা আগের আলোচনায় বলেছিলাম যে, এই কথা জানার জন্য স্বামী অভয়ানন্দ বা অমূল্য মহারাজের কথা একটু জানা দরকার ! আর সেই অনুযায়ীই আমরা জেনেছিলাম যে, অমূল্য মহারাজের মধ্যে গাছ-গাছরা নিয়ে culture-এর একটা সংস্কার ছিল। উনি পারিবারিকভাবে এই বিদ্যা হয়তো কিছুটা পেয়েছিলেন – কিন্তু উনি পুরুলিয়ার আদিবাসী সমাজের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তাদের মধ্যে যে সমস্ত চিকিৎসা পদ্ধতি (গাছ-গাছড়ার ব্যবহার) রয়েছে – সেগুলো জেনে নিতেন এবং রোগগ্রস্ত মানুষদের প্রতি সেগুলি ব্যবহার করতেন। গুরুমহারাজ ছিলেন সর্বান্তর্যামী ! তিনি সবার মনের কথাই জানতেন। তাই অমূল্য মহারাজকে কিছুদিন বনগ্রামে থাকার সুযোগ দেবার পরই ওনাকে বলেছিলেন – ” তুই বাঁকুড়া-পুরুলিয়া অঞ্চলে গিয়ে একটা আশ্রম তৈরী কর্ এবং ওখানকার গরীব মানুষদের চিকিৎসা কর্। হোমিওপ্যাথিক এবং গাছ-গাছড়া (আয়ুর্বেদ)-র মাধ্যমে চিকিৎসা করবি। তাহলে দেখবি তোর অসুবিধা হবে না !”
কিন্তু তখন (১৯৮৩-৮৪ সাল) বাঁকুড়ার ঐসব অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামগুলির খুবই করুণ অবস্থা ছিল। মানুষের ছিল নিত্য অভাব – তার মধ্যে সেখানে গিয়ে আশ্রম বানানো সত্যিই প্রায় অসম্ভব ছিল। অভয়ানন্দকে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” তুই মানিক (স্বামী অখন্ডানন্দ) বা খোকন (স্বামী আত্মানন্দ) – এই দুজনের মধ্যে যে কোনো একজনকে সঙ্গে নিবি। কারণ প্রথমাবস্থায় আশ্রম প্রতিষ্ঠা করার এবং এই ধরনের সেবা কাজ করার জন্য একাধিক লোকের প্রয়োজন হয়।” সেইমতো অভয়নন্দ মহারাজ, মানিক মহারাজকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে, অমূল্য মহারাজকে একজন ভদ্রলোক বলেছিলেন যে, উনি আশ্রম বানানোর জন্য কিছুটা জায়গা দেবেন – সেইটা গুরুমহারাজকে বলার পরেই উনি অমূল্য মহারাজকে বাঁকুড়ায় পাঠিয়েছিলেন।
আরও একটা কথা বলে রাখা উচিৎ যে, ইতিমধ্যেই ফুলকুসুমা এবং ধরমপুর অঞ্চলের বেশ কিছু মানুষ বনগ্রামে আসা-যাওয়া শুরু করেছিল এবং তাদের অনেকে গুরুমহারাজের কাছে দীক্ষাও নিয়েছিল। ‘বাসনা-মা'(বাসনা মায়ের খুব মজবুত শরীর ছিল, বনগ্রাম আশ্রমে এলে রান্নাঘরের বড় বড় ভাতসমেত হাঁড়ি একাই উনোন থেকে নামাতেন। আর ‘পূর্ণিমা-মা’ বা ‘শবরী-মা’ এবং তাঁদের পরিবারের লোকজনও তখন গুরুমহারাজের দীক্ষিত ছিলেন(এসব কথায় পরে আসছি) ! এইজন্যেই মহারাজরা অনায়াসে এসে “বাসনা-মা”র বাড়িতে উঠতে পেরেছিলেন। ওখান থেকে ওনারা ‘তারাফেনী’ নদীতে স্নান করতে গিয়ে, ওখানকার ফাঁকা জায়গা দেখে – ঐ নদীর তীরে একটা ‘কুটিয়া’ মতো কিছু বানাতে চেয়েছিলেন। এই ব্যাপারে এগিয়ে অসেন পূর্ণিমা-মা (শবরী-মা, ইনি খুবই উচ্চ-আধ্যাত্মিক মহিলা, ইনি-ই গুরুমহারাজের সূক্ষ্মশরীর অবস্থাতেও ধরে ফেলেছিলেন এবং তাঁকে স্থূলশরীরে প্রকট হোতে বাধ্য করেছিলেন!) ! উনি মহারাজদেরকে বলেছিলেন যে, ‘কুটিয়া বানানোর যতটা জায়গা দরকার, তা উনিই দেবেন’৷ সেইমতো পূর্ণিমা-মা এবং ওনার স্বামী প্রহ্লাদ (শবর) ওনাদেরকে সাদরে ওনাদের বাড়িতে অর্থাৎ দুয়ারীপাল গ্রামে নিয়ে আসেন।
তখনকার দিনে ঐ সমস্ত অঞ্চলে গ্রামের বাড়ি মানে একেবারেই ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর। তবু সেখানে থেকেই ওনারা আশ্রমে কুটিয়া বানানোর তোড়জোড় শুরু করে দেন। আশেপাশের অঞ্চলে অনেক স্থানীয় যুবক ছেলেও এই ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠে, ফলে ধীরে ধীরে বাঁশ, কাঠ, খড় জোগাড় হতে থাকে ! যেমন যেমন জোগাড় হচ্ছিলো সেগুলিকে একজায়গায় জড়ো করা হচ্ছিলো। সেই জড়ো করা খড়ের গাদাতেই ঘটে গেল একটা চরম অঘটন ! (সেসব ঘটনা পরে আলোচনা হবে।) [ক্রমশঃ]