শ্রী শ্রী গুরুমহারাজের কথা এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন আমরা ছিলাম স্বামী অখন্ডানন্দ বা মানিক মহারাজের কথায়, অর্থাৎ কিভাবে মানিক মহারাজ ধরমপুর আশ্রমে settled হোলেন – সেইসব কথায় ! প্রকৃতপক্ষে, ১৯৮৫ সালে মানিক মহারাজ (স্বামী অখন্ডানন্দ), অমূল্য মহারাজ (স্বামী অভয়ানন্দ)-এক সাথেই বাঁকুড়ায় গিয়েছিলেন গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের নির্দেশে। বনগ্রাম থেকে বাঁকুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবার আগে ওই মহারাজদ্বয় যখন গুরুমহারাজের কুটিয়ায় বিদায় জানাতে এবং ওনার কাছে আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন – তখন গুরুমহারাজ ওনাদেরকে ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী হিসাবে কিভাবে সমাজের মানুষের সাথে মিশতে হবে, কিভাবে নিজের জীবন-যাপন করতে হবে, কিভাবে ওইসব অঞ্চলের গরীব অসহায় মানুষগুলোর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে – এইসব উপদেশ দিয়েছিলেন।
গুরুমহারাজ আরও বলেছিলেন যে, ঐ সমস্ত backword area (১৯৮৫ সালে সত্যি সত্যিই ধরমপুর, দুয়ারীপাল ইত্যাদি জায়গা খুবই backward area ছিল)-য় যদি পরমানন্দ মিশন তৈরি হয় – তাহলে পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষজনেদের সাথে সাথে__ অনেক শহরের ভক্ত মানুষেরাও ঐ আশ্রমের সাথে যুক্ত হবে এবং এরফলে ওইসব স্থানের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটতে থাকবে। এরপর গুরুমহারাজ ওনাদের হাতে পঞ্চাশ (৫০/-) টাকা বাসভাড়া হিসাবে দিয়েছিলেন। তখন (১৯৮৫ সাল) জাবুইডাঙ্গা থেকে বর্ধমান লোকাল বাসের ভাড়া ছিল দুই (২/-) টাকা আর বর্ধমান থেকে বাঁকুড়া Express Bus-এর ভাড়া ছিল নয় (৯/-) টাকা। ফলে আরামসে ওনারা ঐ টাকাতেই বাঁকুড়ায় পৌঁছে গেছিলেন। প্রথমেই ওনারা উঠেছিলেন – বাঁকুড়ার রাজুডির কাছে ‘জুনবেদা’ গ্রামে। ওখানকারই এক ভদ্রলোক সুব্রত মন্ডল আশ্রমের জন্য জায়গা দেবে বলেছিল(যে জায়গার কথা গুরু মহারাজকে বলা হয়েছিলো)। ওনার বাড়িতে অমূল্য মহারাজ এবং মানিক মহারাজ প্রায় এক মাস ছিলেন। কিন্তু যে জায়গায় আশ্রম হবার কথা – সেটি ছিল vested land ! সেই জায়গাটিকে কোনমতেই আশ্রমের নামে record করা সম্ভব হোতো না – তাছাড়া ওখানে থাকাকালীনই মানিক মহারাজের ঠান্ডা-সর্দি লেগে গিয়ে হাঁপানির টান উপস্থিত হয়েছিল।
এই জন্যেই অমূল্য মহারাজ, মানিক মহারাজকে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য শাশপুরে মুরারী মহারাজ (স্বামী নিষ্কামানন্দ)-এর মেজদির বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানে প্রায় মাসখানেক থাকার পর মানিক মহারাজ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। এদিকে বর্ধমান জেলার বিশ্বনাথ ক্ষেত্রপাল নামে একজন ব্যক্তি তখন বাঁকুড়ার ফুলকুসুমা অঞ্চলে সেটেলমেন্ট অফিসে চাকরি করতেন এবং ওখানকার ব্যবসায়ী মহলে বা শিক্ষিত মহলে বেশ পরিচিত ছিলেন। উনি ছিলেন গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের দীক্ষিত। ওনার সংস্পর্শে এসে ঐ একই অফিসের আরও দুই-একজন স্টাফ রবি মল্লিক, নিরঞ্জন বিশুই প্রমুখরাও বনগ্রামে গিয়ে গুরুজীর কাছে দীক্ষাগ্রহণ করেছিল।
ওই বিশ্বনাথ ক্ষেত্রপালের পরিচিত ফুলকুসুমা অঞ্চলের জনার্দন সিং আশ্রম তৈরির ব্যাপারে সাহায্য করবে বলেছিল। সেই অনুযায়ী অভয়ানন্দ মহারাজ ফুলকুসুমার কাছে সাতখুলিয়া গ্রামে গিয়েছিলেন। উনি ছিলেন “বাসনা মায়ে”র আত্মীয় ! সেখানেই বাসনা-মার সাথে অমূল্য মহারাজের যোগাযোগ হয়। বিশ্বনাথ বাবু ছিলেন বাসনা মায়ের “ধর্ম ব্যাটা”! পরবর্তীতে ওনার সাথেই বাসনা-মা, দুয়ারীপালের পূর্ণিমা-মা এবং ঐ অঞ্চলের আরও অনেকেই গুরুমহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন।
যাইহোক, সেইসময় অমুল্য মহারাজ বাসনা মায়েদের বাড়ি দিন তিনেক ছিলেন এবং ঐ বাড়িতে থাকাকালীন সময়েই ওখান থেকে এক কিমি দূরে পূর্ণিমা-মায়েদের বাড়ি যে গ্রামে অর্থাৎ দুয়ারীপালে তারাফেনী নদীতে স্নান করতে যেতেন। সেখানেই পূর্ণিমা-মার সাথে আলাপ ! উনি মহারাজের কাছে সব কথা শুনে, আশ্রমের জন্য জমি দিতে স্বীকার করেছিলেন। জমিটা ছিল ওনাদের ঠাকুমার জায়গা। আশ্রমের জায়গা স্থির হওয়ায় অভয়ানন্দ মহারাজ পুনরায় ‘জুনবেদা’ গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন-ওখান থেকে সবার কাছে বিদায় নিয়ে পাকাপাকিভাবে দুয়ারীপালে চলে আসার জন্য ! ততদিনে মানিক মহারাজও শাশপুর থেকে সুস্থ হয়ে চলে এসেছিলেন।
তখন অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিক – শীত পড়ে গেছিলো। অভয়ানন্দ মহারাজের পুরুলিয়ার শুশুনিয়া (এখন সেখানে অমূল্য মহারাজের আশ্রম রয়েছে)-য় দু’চারটে কম্বল এবং শীতবস্ত্রাদি রাখা ছিল। উনি সেইগুলি নেবার জন্য পুরুলিয়া চলে গিয়েছিলেন এবং মানিক মহারাজকে ঠিকানা দিয়ে দুয়ারীপালে পূর্ণিমা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দিন-দুয়েক পরেই অমূল্য মহারাজও দুয়ারীপালে পৌঁছে গেলেন এবং পূর্ণিমা মায়েদের‌ই একটা মাটির চালাঘরে, একটাই বিছানায় ঐ দুই মহারাজ একসাথে থাকতে শুরু করলেন ! [ক্রমশঃ]
[*গুরু মহারাজ, অমূল্য মহারাজ এবং মানিক মহারাজের ফোটো দেওয়া হোলো।।*]