শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের সম্বন্ধে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন আমরা ছিলাম স্বামী পরমানন্দের একজন অন্যতম সন্ন্যাসী শিষ্য মানিক মহারাজ বা স্বামী অখন্ডানন্দের সম্বন্ধে কিছু কথা বলার চেষ্টা করছিলাম৷ আজ 08/09/2021 তারিখে মহারাজের মহাপ্রয়াণের (24/08/2021) ষোলদিনের দিন ওনার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং সাধু ভান্ডারর আয়োজন করা হয়েছিল। পরমানন্দ মিশনের বিভিন্ন শাখার সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণীগণ এবং অনেক পরমানন্দভক্তগণ ধরমপুর আশ্রমে এসে হাজির হয়েছিলেন – মহারাজকে তাদের অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন জানানোর জন্য। আমরাও সকলে ভগবান পরমানন্দের কাছে প্রার্থনা জানাই__ তিনি যেন পরমানন্দলোকে স্বামী পরমানন্দের চরণপ্রান্তে তাঁর স্থানটি পাকা করে নেন !
আমরা আগের দিনের আলোচনায় ছিলাম যে, পূর্ণিমা-মায়ের স্বামী প্রহ্লাদ শবর হঠাৎ করে আত্মহত্যা করে বসায়__ অমূল্য মহারাজ এবং মানিক মহারাজের দুয়ারীপালে আশ্রম বানানোর কাজটি একেবারে শুরুতেই চরম বাধার সম্মুখীন হয় ! স্থানীয় জনগণ এবং থানা-পুলিশেরও বক্র নজরে পড়ে যায় সাধুবাবাদের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করার কাজটি !
আমরা যারা কলকাতাকেন্দ্রিক সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত – তারা কখনোই জানতে পারি না বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদনীপুর ইত্যাদি স্থানের প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলগুলিতে এখনো কি সাংঘাতিক বিভিন্ন কুসংস্কার-তুকতাক-ঝাড়ফুঁক- ডাইন-গুনীন-ওঝার দাপট ! ওইসব সরল-সাদাসিধে মানুষগুলোর মনে যদি একবার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, অর্থাৎ যদি ওদের প্রচলিত বিশ্বাসে আঘাত লাগে – তাহলেই সব গোলমাল !
এক্ষেত্রেও প্রায় এমনটাই হয়েছিল ! কিন্তু করুণাময় ভগবান স্বামী পরমানন্দের সংকল্পে (devine plan) রয়েছে যে, ওই অঞ্চলে পরমানন্দ মিশনের শাখা হবে – তাই সমস্ত প্রতিকূলতা কেটে গেছিলো।
স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ একটু কমার পরই বাসনা-মা পূর্ণিমা-মাকে (সদ্য স্বামীহারা) নিয়ে বনগ্রাম আশ্রমে এসেছিলেন এবং বেশ কিছুদিন বনগ্রামে ছিলেন।
এরপর গুরুমহারাজ বাসনা-মা এবং পূর্ণিমা-মায়ের সাথে অমূল্য মহারাজ (স্বামী অভয়ানন্দ)-কে দুয়ারীপালে পাঠিয়ে দেন। এই কঠিন সময়ে স্থানীয় মানুষজন এবং পরমানন্দ ভক্তদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য‌ই গুরুমহারাজ অমূল্য মহারাজকে ফুলকুসমা অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন। মহারাজ যেহেতু ঐ অঞ্চলেরই মানুষ (পুরুলিয়া) তাই ওনাকে সবধরনের জনজাতির মানুষই ভালোভাবে গ্রহণ করে নিতো – সেবারও তাই হয়েছিল৷
ওখানে পূর্ণিমা-মায়ের বাড়ির বাইরের দিকের একটা ঘরেই মহারাজ থাকতে শুরু করেছিলেন। ওখানকার জনগণ একটু শান্ত হোলে অমূল্য মহারাজ শুশুনিয়া (পুরুলিয়া) চলে যান। ফলে গুরুমহারাজ মানিক মহারাজকে পুনরায় দুয়ারীপালে পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় মানিক মহারাজ ভীষণ ধ্যান-জপ করতেন, যেহেতু অন্য কাজ প্রায় ছিলই না – তাই উনি দিন ও রাতে বেশিরভাগ সময়টাই ধ্যানে কাটাতেন। এর ফলেই সেইসময়ে ওনার মধ্যে কিছু কিছু সিদ্ধি-ও এসে গেছিলো। তাঁর মধ্যে খানিকটা ‘বাক্-সিদ্ধি’ও এসে গিয়েছিল। উনি সেই সময় ফটাফট্ যাকে যা বলতেন – বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ফলে যেতো ! অনেকসময় সেগুলো অভিশাপের মতো শোনালেও ভালো-মন্দ একটা কিছু কিন্তু ঘটে যেতো ! এইরকম দু-একটা ঘটনা ঘটার পরই সাধারণ মানুষ মানিক মহারাজ (স্বামী অখন্ডানন্দ)-কে একটু ভয় পেতে শুরু করেছিল, আবার ভক্তিও করতো অর্থাৎ সহসা চট্ করে ওনাকে কেউই চটাতে চাইতো না !
এইভাবেই ওখানে (দুয়ারীপালে) প্রায় চার বছর মানিক মহারাজ ছিলেন। অমূল্য মহারাজ (স্বামী অভয়ানন্দ) মানিক মহারাজের সাথে যোগাযোগ রাখতেন, ঐ আশ্রমের জন্য collection-ও করতেন ! কিন্তু ১৯৮৯ সালে__ যখন ধরমপুরে ভবেশ দে-র দেওয়া জমিতে দুই-কুঠুরি বিশিষ্ট আশ্রমের ঘর তৈরি হয় – সেই সময় অভয়ানন্দ মহারাজ পাকাপাকিভাবে ওখানে থাকতে শুরু করেছিলেন।
ধীরে ধীরে ওখানে বিভিন্ন ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণীরাও (যেমন বিন্দু মহারাজ, অপূর্ব মহারাজ, শিবানী-মা প্রমুখরা) যোগদান করছিলেন। আশ্রম তৈরির ব্যাপারে অন্যান্য শিক্ষিত-ধনী মানুষজনেদের সাথে স্থানীয় খেটেখাওয়া মানুষেরাও আশ্রম তৈরি করার ব্যাপারে খুবই সাহায্য করেছিল। এখানে উল্লেখ করা যায়_ ধরমপুরের পাশে কুমারপাড়ার কয়েকজন খেটে-খাওয়া যুবক ছেলেদের কথা ! যারা সারাদিন ‘জন’ খেটে আসতো – সংসার প্রতিপালনের জন্য, তারপর বিকাল চারটের পর থেকে রাত্রি আটটা পর্যন্ত আশ্রমের কাজে নিঃস্বার্থ পরিশ্রম কোরতো ! আশ্রম তৈরি হবার পরেই প্রথমবার গুরুমহারাজ বাঁকুড়া আশ্রমে গিয়েছিলেন এবং উনিই ঐ আশ্রমটির নামকরণ করেছিলেন – “পরমানন্দ যোগাশ্রম” !