শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত-শিষ্য-পার্ষদদের নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আমরা স্বামী ভাগবতানন্দের কথায় ছিলাম৷ আমরা আগের আগের আলোচনা থেকে জেনেছিলাম যে, ভাগবতানন্দ মহারাজের ছিল সংগ্রামপূর্ণ জীবন। প্রথম জীবনে উনি কাঠের কাজ করতেন – এই কাজের বড় শিল্পী ছিলেন উনি। যখন উনি মালদহ বা মুর্শিদাবাদ অঞ্চল (কারণ প্রথম থেকে ওই দুই অঞ্চলেই মহারাজ বেশি থাকতেন) থেকে বনগ্রাম আশ্রমে আসতেন – তখনও উনি আশ্রমের ছেলেদের জন্য (ছাত্রাবাসে) এবং পরমানন্দ মিশন স্কুলের জন্য চেয়ার, বেঞ্চ, ডেস্ক, রান্নাঘরে বসার পিঁড়ে – এইসব তৈরি করে দিতেন বা অনেককে জুটিয়ে নিয়ে কাজে নেমে পড়তেন।
আমরা শেষ এপিসোডে আলোচনা করেছিলাম – ভাগবতানন্দ মহারাজ ১৯৭৯ সালেই (অর্থাৎ যে বছরে গুরুমহারাজের ‘নির্বিকল্প’ হয়েছিল এবং প্রথমবার মহারাজ আশ্রমে এসেছিলেন) শেষের দিকে আরো একবার বনগ্রাম আশ্রমে এসেছিলেন এবং তখন গুরুমহারাজের সাথে ওনার অনেক কথাবার্তা হয়েছিল। নির্বিকল্পের পর গুরুমহারাজের শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক হোতে অনেকটাই সময় লেগেছিল। এসব কথা আমরা অনেক আগে আলোচনা করেছিলাম – তাই পুনরায় আর বিস্তারে যাচ্ছি না। তবু গুরু মহারাজের মুখের কথা, চোখের দৃষ্টি – এইসব স্বাভাবিক হোতে অনেকটা সময় লেগেছিল।এর কিছুদিনের মধ্যে ভাগবতানন্দ মহারাজ যখন বনগ্রাম আশ্রমে গেছিলেন – তখন গুরুমহারাজ প্রায় সম্পূর্ণটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছিলেন।
গুরুমহারাজের সাথে দেখা হোতেই উনি মহারাজকে বলেছিলেন – ” তুমি এখনো গান-বাজনা করছো তো ?” মহারাজ সম্মতি জানিয়েছিলেন। এরপর গুরুমহারাজ ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ” তোমার পরিবারে কোনোরকম অসুবিধা (অর্থনৈতিক) আছে নাকি ?” মহারাজ উত্তর দিয়েছিলেন – ” না – না ! এখন আর তেমন কোনো সমস্যা নাই !” তখন গুরুমহারাজ উত্তর দিয়েছিলেন – ” তাহলে, সংসারের মায়া কাটিয়ে, এখন থেকে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ো ! সারাদিন চলবে, রাত্রে বিশ্রাম নেবে। তবে বিশ্রাম নেবে কোনো বৃক্ষের তলে বা কোনো দেবালয়ে –কখনোই কোনো গৃহস্থবাড়িতে নয় ! যদি কোনো স্থানে দেবালয় না পাও – তাহলে রাত্রে কোনো গৃহের বাইরের বারান্দায় রাত কাটাবে, কিন্তু ভোর হোতে না হোতেই স্থানত্যাগ করবে ! যতই অসুবিধা হোক না কেন – কোনো স্থানে তিনদিনের অধিক থাকবে না !”
গুরুমহারাজের নির্দেশ মেনে নিয়ে ভাগবতানন্দ মহারাজ পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন – সাথী ছিল, তাঁর সর্বকালীন সঙ্গী একটি একতারা !
গুরু মহারাজের কাছে ঐ সমস্ত কথা শোনার পর___ প্রায় সমস্ত ত্যাগী-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীদের মতো স্বাভাবিকভাবেই ভাগবতানন্দ মহারাজ উত্তর ভারতের দিকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। ওখানে বিভিন্ন স্থান ঘুরে উনি এসেছিলেন বৃন্দাবনে। তখন ছিল শীতকাল – তেমন শীতবস্ত্র না থাকায়‌ এবং থাকার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় – সেইসময় উনি খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন। এইটা দেখে একজন সাধু ওনাকে বলেন যে,____”যদি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেই হয় – তাহলে এই শীতকালটা উত্তরভারতে না কাটিয়ে দক্ষিণভারতে চলে যাও ! কারণ সেখানে শীতের প্রকোপ অনেক কম “!
সেই সাধুর কথামতো মহারাজ সেইদিনই ‘কালকা মেলে’ চেপে পড়েন, কিন্তু উনি যখন স্টেশনে পৌঁছান তখন ট্রেন প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল! উনি ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে চেপে পড়েন ঠিকই, কিন্তু রিজার্ভ কম্পার্টমেন্টে ওঠায় – শীতের রাত্রি বলে প্রতিটি কামরার দরজাই বন্ধ ছিল ! উনি বহু ডাকাডাকি করেন, ধাক্কাধাক্কি করেন – কিন্তু কেউই দরজা খুলতে এগিয়ে আসেনি ! সেই ভয়ঙ্কর ঠান্ডায়, তীব্রবেগে ছুটে চলা ট্রেনের গতিশীল ঠাণ্ডা হাওয়ায়__ ওনার শরীর একেবারে জমে যাবার মতো হয়েছিল, আর হাত-পা অসাড় হয়ে যাচ্ছিলো। উনি নিশ্চিত বুঝতে পারছিলেন যে, যেকোনো সময় ওনার হাত-পা আলগা হয়ে যাবে এবং উনি running ট্রেন থেকে নিচে পড়ে যাবেন!
কিন্তু গুরুমহারাজ তো সবসময়েই তাঁর ভক্তদের সাথে সাথেই থাকেন, বিশেষতঃ বিপদের সময়ে – এক্ষেত্রেও ছিলেন ! হঠাৎ করে দরজা খুলে যায় এবং একজন ওনাকে ভিতরে টেনে নেন। ওই কম্পার্টমেন্টটা ছিল মিলিটারীদের জন্য reserved ! আর আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, ওই মিলিটারিদের মধ্যে যারা বাঙালি ছিল, তাদের মধ্যে একজন ছিল মহারাজের পূর্ব পরিচিত ! সে-ই মহারাজকে গরম কম্বল চাপা দিয়ে, গরম চা এবং কফি খাইয়ে সুস্থ করে তুলেছিল এবং গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল। [ক্রমশঃ]