শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর ভক্ত, শিষ্য ও পার্ষদদের সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা এখন ছিলাম গুরুমহারাজের একজন অন্যতম সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী ভাগবতানন্দজীর কথায়। আজিমগঞ্জে (দিয়ার-মাহিনগর) কনসাস্ স্পিরিচুয়াল সেন্টারে অর্থাৎ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের প্রথম শাখা-আশ্রমটির একেবারে সূচনাপর্বে ভাগবতানন্দজী ওখানে ছিলেন। পরবর্তীতে হরি মহারাজ (স্বামী সহজানন্দ) এবং মদন মহারাজ (স্বামী চিৎবিলাসানন্দ)-রাও মাঝে মাঝে গুরুমহারাজের নির্দেশে ঐ আশ্রমে এসে ৫/৭ মাস বা তারও বেশি করে সময় কাটিয়েছিলেন এবং আশ্রমটির রূপ-বিকাশের কাজে সহায়তা করেছিলেন।
তবে, আমরা ফিরে যাবো ভাগবতানন্দজীর নিজস্ব জীবনধারার কথায়। গুরুমহারাজের নির্দেশে বা তাঁর সাথে একান্ত আলোচনায় ভাগবতানন্দজী যখন যেমনটা বুঝতেন – উনি সেই মতোই ওনার জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতেন। মহারাজ আজিমগঞ্জ আশ্রমে (কনসাস্ স্পিরিচুয়াল সেন্টার) ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন। তখন ঐ আশ্রমে দুটো বড় অনুষ্ঠান পালন করা হোতো। গুরুমহারাজের জন্মদিন উপলক্ষে ২৫-শে ডিসেম্বর (এটা পরমানন্দ মিশনের সব শাখাতেই পালিত হয়) এবং শিবরাত্রি। এই দুটো উৎসব পালনের জন্য তখন আজিমগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী স্থানগুলিতে ‘কালেকশন’ করা হোতো আর এর মাধ্যমেই বহু মানুষের সাথে মহারাজের আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। এদের মধ্যে বহু মানুষেরাই পরবর্তীতে গুরুমহারাজের সান্নিধ্যে এসেছিল এবং আশ্রমের উন্নতির ব্যাপারে নানাভাবে সাহায্য করেছিল৷
কিন্তু সদ্য গড়ে ওঠা আশ্রমটির পক্ষে দুটো বড় অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়ে উঠছিলো না। বড় অনুষ্ঠান করতে গেলে যেমন খরচাও বেশি, তেমনি অনেক কর্মীলোকের প্রয়োজন হয় – door to door collection-এর জন্যেও অনেক যুবক ছেলে-মেয়েদের প্রয়োজন। কিন্তু সেটা তখন ছিল না। এইসব অসুবিধার জন্য দু-চার বছর দুটো অনুষ্ঠানে চালানো হোলেও পরে শুধুমাত্র একটাই বড় অনুষ্ঠান অর্থাৎ শুধু পঁচিশে ডিসেম্বরে গুরুমহারাজের জন্মদিন পালন করা হোতো, যেটা আজও পালন হয়ে আসছে।
ইতিমধ্যে শম্ভু মহারাজ (স্বামী সত্যানন্দ) সাঁকোবাজারে থাকতে থাকতেই রসবেরুলিয়ায় পরমানন্দ মিশনের আরো একটি শাখা প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
ওই আশ্রমে তখন প্রথমে সত্যানন্দ মহারাজ এবং পরে ওনার সাথে কৃষ্ণানন্দ মহারাজ থাকতেন। তবে কোনোরকম সুবিধা-অসুবিধা হোলে ভাগবতানন্দ মহারাজ আজিমগঞ্জ আশ্রম থেকে ওখানেও গিয়ে থাকতেন ! আবার সত্যানন্দ বা কৃষ্ণানন্দ মহারাজেরাও এসে আজিমগঞ্জে থাকতেন। এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল ভাগবতানন্দজীর জীবন ! আশ্রমের কাজ, সাধারণ মানুষের সাথে আধ্যাত্মিক আলোচনার মাধ্যমে যোগাযোগ এবং তাঁর জীবনের অন্যতম সাথী ‘বাউল গান’ -কে অবলম্বন করেই কাটছিল ! কিন্তু জীবন তো একভাবে কাটে না ! পথ যেমন সোজা সরল হয় না_ মাঝে মাঝেই বাঁক পড়ে, নদীর (স্রোতস্বিনী) প্রবাহ যেমন সোজা-সরল হয় না_ আঁকাবাঁকা হয়, ঠিক তেমনি মানুষের গতিশীল জীবনেও নানান মোড় থাকে। মহারাজের জীবনেও সেই মোড় এলো ১৯৮৫ সালের পর থেকে !
আজিমগঞ্জে থাকাকালীন সময়েই আমিনাবাজারে শান্তি মাস্টারের (শান্তি দাস) সাথে মহারাজের খুবই ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। শান্তি মাস্টার (প্রাইমারি টিচার) গুরুমহারাজের দীক্ষিত, ভক্ত মানুষ ! শান্তি মাস্টারের-ই কন্যা শ্যামলী দাসকে গুরুমহারাজ আরও একজনের সাথে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন ‘কাঁথা স্টিচে’র কাজ শেখার জন্য ট্রেনিং নিতে এবং তার হাত ধরেই আমিনাবাজারে মেয়েদের স্বাবলম্বী হবার উদ্দেশ্যে “শতভিষা” নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে শান্তি মাস্টারের-ই আর এক কন্যা চৈতালি (নির্মূক্তিপ্রাণা) ঐ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি দিনে দিনে বিকশিত হোচ্ছে – বহু দুস্থ:, অসহায়, খেটে খাওয়া মহিলারা এখানে কাজ করছে এবং এখান থেকে তারা দু-চার পয়সা রোজগারের মুখ দেখছে।
যাইহোক যে কথা বলা হচ্ছিলো – আমিনাবাজারে শান্তি মাস্টারমশাই তখন মালদহের কাদিরপুর অঞ্চলে চাকরি করতেন – ফলে ঐ অঞ্চলের বহু মানুষের সাথে ওনার আলাপ পরিচয় ছিল। উনিই ছোট কাদিরপুরে প্রথম ভাগবতানন্দজীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। মহারাজ ঐ গ্রামে গিয়ে মাষ্টারমশাই-এর স্কুলঘরেই গিয়ে উঠেছিলেন। ওখান থেকে মহারাজ ওঠেন স্থানীয় একটি দুর্গামন্ডপে। তখন সেই মণ্ডপে পাশাপাশি বাড়ির লোকরা গরু রাখতো – ফলে সেই স্থানটা নোংরা হয়ে ছিল। মহারাজ গিয়ে মানুষজনকে বলে দূর্গামন্ডপটি পরিষ্কার করে সেখানেই থাকতে শুরু করেছিলেন। গুরুমহারাজও প্রথমবার কাদিরপুরে গিয়ে ঐ দুর্গামন্ডপেই উঠেছিলেন। (সেসব কথা পরের দিন !)