শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ এবং তাঁর সহচর (অর্থাৎ ভক্ত, শিষ্য ও পার্ষদবৃন্দ)-দের সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। পরমানন্দ-কথায় “প্রাণকে নাড়া” দেবার প্রসঙ্গে আগের দিনের আলোচনায় একটু touch দেওয়া হয়েছিল। সেই ব্যাপারটা নিয়ে এখানে একটু detail-এ আলোচনা করা যেতেই পারে। গুরুজী বলেছিলেন – ” মানুষ সাধনার শুরুতেই মনকে বশে আনতে চায়, কিন্তু দূর্বার-দুর্দম মনকে বাগে আনা অতোটা সহজ কাজ নয়।” মনকে বশে আনার চেষ্টা যেন বারবার একটা শক্তিশালী স্প্রিং-কে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা – যেটা একটু ঢিল পেলেই আবার যে কে সেই ! মনের গতি দূর্বার ! মহাভারতে রয়েছে যক্ষ যখন যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – “পৃথিবীতে সবচাইতে গতিশীল কি ?” তখন যুধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন – “পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে গতিশীল জিনিস হোলো মন।”
গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ মনের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে আরো বলেছিলেন – ” ছোটবেলায় আমিও ‘মন’ নিয়ে খুবই recharch করেছিলাম।” কারণ, উনি ওনার চারপাশের প্রায় সকলকেই (পরিবারের লোক, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী) বলতে শুনতেন – ‘তারা নানারকম মনঃকষ্টে ভুগছে’ অথবা ‘তাদের মনে নানান অশান্তি রয়েছে’ ; কেউ কেউ বলতো – ‘তার আজকে মনটা ভালো নেই!’ গুরুজীর ছোটবেলায় ওনার এক দিদি গান গাইতো – “মন নিয়ে কি মরবো না কি শেষে”, তাছাড়া মন-কে নিয়ে আরও অনেক গান উনি তখন শুনেছিলেন। এইসব কারণে ছোটবেলাতেই গুরুজী (বালক রবীন) মন নিয়ে খুবই গবেষণা (একান্ত চিন্তন বা ধ্যান-সাধনা) করেছিলেন। এরপর উনি মনের সকল প্রকার রহস্য উদঘাটন করে নিজের মন (individual mind)-কে বিশ্বমনে (universal mind) স্থাপিত করে দিয়ে বলেছিলেন, ” হে মন ! তুমি যার, তার কাছেই ফিরে যাও।”
যেহেতু এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছুই সেই ব্রহ্ম (বৃহৎ মন প্রত্যয় করে ‘ব্রহ্ম’ শব্দটি পাওয়া যায়) থেকেই উৎপত্তি, স্থিতি এবং লয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাই যিনি সদাই ব্রহ্মবোধে রয়েছেন তখন তাঁর আবার individuality কি ! তখন তাঁর সবকিছুই তো ব্রহ্মময় – তিনিই তো তখন সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ ! মহাজ্ঞানীরা তাইতো গুরুপ্রনাম মন্ত্রের শেষে লিখেছেন – “গুরুদেব পরমব্রহ্ম, তস্মৈ শ্রী গুরবে নমঃ।”
এরজন্যেই বলা হোলো যে, সদ্গুরুর কোনো individual mind থাকে না – সেটা universal mind হয়ে যায়।
কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তো individual mind ! আর সেখানে জাগতিক ব্যাপারের বিচিত্র বর্ণের, ভিন্ন ভিন্ন রূপ-রসাদির খেলা হয়ে চলেছে ! আর আমরা ভূবনমোহিনী মহামায়ার এই ‘দহে’ পড়ে এমন ফাঁসা ফেঁসেছি যে, আর বেরোতে পারছি না__ নাকানি-চোবানি খেতে খেতেই জন্ম থেকে জন্মান্তরের পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছি !
গুরু মহারাজের একটা সিটিং-এর সংক্ষিপ্তসারটা এখানে বলা যেতেই পারে! আমরা সকলেই একে অপরকে কুশল বিনিময়ের সময়, জিজ্ঞাসিত হোলে বলে থাকি – “হ্যাঁ – হ্যাঁ, আমি ভালো আছি ! আপনি ভালো আছেন তো ?” প্রকৃতপক্ষে কিন্তু আমরা কেউই ভালো নেই ! আমরা নানারকম সমস্যায় সদা-সর্বদা জর্জরিত ! শারীরিক সমস্যা, মনোজগতের সমস্যা, বর্হিজাগতিক (পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক) সমস্যা —- সমস্যার কি আর শেষ আছে ! তবু সেই পরিস্থিতিতে কাষ্ঠহাসি হেসে বলতে হয় – “হ্যাঁ, ভালো আছি !” যদিও প্রকৃতপক্ষে ভালো প্রায় কেউই নেই!
কিন্তু ‘ভালো থাকাটা’ কি একেবারেই অসম্ভব ? – না, তাও নয় ! সুপ্রাচীন ভারতবর্ষের ঋষিরা উপনিষদের বিভিন্ন ছত্রে কিভাবে ভালো থাকা যায় – তার কথা বলে গেছেন। ভালো থাকার রাস্তা ভোগ-ঐশ্বর্য-ক্ষমতালিপ্সা ইত্যাদিতে নাই, ভালো তারাই থাকতে পারে__যারা ত্যাগ-সংযম-সাধনার মধ্যে রয়েছে। ভারতীয় ঋষিরা ছাড়া, ঐতিহাসিক great man হিসাবে আড়াই হাজার বছর আগে ভগবান বুদ্ধ (যেহেতু আধুনিক পন্ডিতেরা বুদ্ধ-পূর্ববর্তী ইতিহাসকে এখনও সেভাবে মান্যতা দেয়নি) বলে গেছেন – ‘কিভাবে ভালো থাকতে হয় !’ উনি অষ্টাঙ্গিক মার্গ(আট প্রকারের নিয়ম পালন)বিধান দিয়েছিলেন । তাছাড়াও বলেছিলেন – ” নির্বাণ লাভ হোলো মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং যোগমার্গ-ই (মজ্ঝিম্ মার্গ বা মধ্যপথ অর্থাৎ সুষুম্মাপথ) মানুষকে নির্বাণের পথে নিয়ে যায়।”
গুরুজীও তাই বললেন। উনি সর্বাধুনিক যুগপুরূষ, তাই একটু পরিমার্জন করে বললেন – “পূর্ণতা লাভই মানবজীবনের উদ্দেশ্য !” পূর্ণতালাভ বা ঈশ্বরলাভ প্রকৃতপক্ষে —‘ঈশ্বরত্ব’-লাভ ! জীবের শিব হয়ে ওঠা!
কিন্তু আমাদের আলোচনার শুরুতে যে কথা বলা হয়েছিল যে, ‘সাধারণ মানুষের মন-কে নিয়েই যত সমস্যা’ – তাহলে এখন একটা জিজ্ঞাসা এসেই যাচ্ছে যে, মনকে বশে কিভাবে আনা যাবে ? গুরুমহারাজ বললেন – ” প্রাণকে স্থির করতে পারলে তবে মনকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় – অন্যথায় তা কিছুতেই সম্ভব হয় না !” ‘প্রাণ’ স্থির হওয়া অর্থে প্রাণায়াম সিদ্ধ হওয়া। প্রাণ-উপাসনার দ্বারাই প্রাণ স্থির হয়, আর একমাত্র তখনই মনকে স্ববশে আনা যায়।
সদ্গুরুর সান্নিধ্যে এলে – সেই পরমপ্রেমময় সর্বজনহিতকারী গুরু মানুষকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করান। তাঁর পরম করুণাময় রূপ, মধুর প্রেমপূর্ণ ব্যবহার, জ্ঞানগর্ভ ‘প্রাণে নাড়া’ সৃষ্টিকারী বাণী___ মানুষকে horizental জগত থেকে vertical জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। তাই তো বলা হয় – ” মর্তের গুরু-ই ভগবান !” ( horizental- vertical জগত, মন ও প্রাণের বাকি কথা আগামী আলোচনায়) [ক্রমশঃ]
গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ মনের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে আরো বলেছিলেন – ” ছোটবেলায় আমিও ‘মন’ নিয়ে খুবই recharch করেছিলাম।” কারণ, উনি ওনার চারপাশের প্রায় সকলকেই (পরিবারের লোক, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী) বলতে শুনতেন – ‘তারা নানারকম মনঃকষ্টে ভুগছে’ অথবা ‘তাদের মনে নানান অশান্তি রয়েছে’ ; কেউ কেউ বলতো – ‘তার আজকে মনটা ভালো নেই!’ গুরুজীর ছোটবেলায় ওনার এক দিদি গান গাইতো – “মন নিয়ে কি মরবো না কি শেষে”, তাছাড়া মন-কে নিয়ে আরও অনেক গান উনি তখন শুনেছিলেন। এইসব কারণে ছোটবেলাতেই গুরুজী (বালক রবীন) মন নিয়ে খুবই গবেষণা (একান্ত চিন্তন বা ধ্যান-সাধনা) করেছিলেন। এরপর উনি মনের সকল প্রকার রহস্য উদঘাটন করে নিজের মন (individual mind)-কে বিশ্বমনে (universal mind) স্থাপিত করে দিয়ে বলেছিলেন, ” হে মন ! তুমি যার, তার কাছেই ফিরে যাও।”
যেহেতু এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছুই সেই ব্রহ্ম (বৃহৎ মন প্রত্যয় করে ‘ব্রহ্ম’ শব্দটি পাওয়া যায়) থেকেই উৎপত্তি, স্থিতি এবং লয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে, তাই যিনি সদাই ব্রহ্মবোধে রয়েছেন তখন তাঁর আবার individuality কি ! তখন তাঁর সবকিছুই তো ব্রহ্মময় – তিনিই তো তখন সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ ! মহাজ্ঞানীরা তাইতো গুরুপ্রনাম মন্ত্রের শেষে লিখেছেন – “গুরুদেব পরমব্রহ্ম, তস্মৈ শ্রী গুরবে নমঃ।”
এরজন্যেই বলা হোলো যে, সদ্গুরুর কোনো individual mind থাকে না – সেটা universal mind হয়ে যায়।
কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তো individual mind ! আর সেখানে জাগতিক ব্যাপারের বিচিত্র বর্ণের, ভিন্ন ভিন্ন রূপ-রসাদির খেলা হয়ে চলেছে ! আর আমরা ভূবনমোহিনী মহামায়ার এই ‘দহে’ পড়ে এমন ফাঁসা ফেঁসেছি যে, আর বেরোতে পারছি না__ নাকানি-চোবানি খেতে খেতেই জন্ম থেকে জন্মান্তরের পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছি !
গুরু মহারাজের একটা সিটিং-এর সংক্ষিপ্তসারটা এখানে বলা যেতেই পারে! আমরা সকলেই একে অপরকে কুশল বিনিময়ের সময়, জিজ্ঞাসিত হোলে বলে থাকি – “হ্যাঁ – হ্যাঁ, আমি ভালো আছি ! আপনি ভালো আছেন তো ?” প্রকৃতপক্ষে কিন্তু আমরা কেউই ভালো নেই ! আমরা নানারকম সমস্যায় সদা-সর্বদা জর্জরিত ! শারীরিক সমস্যা, মনোজগতের সমস্যা, বর্হিজাগতিক (পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক) সমস্যা —- সমস্যার কি আর শেষ আছে ! তবু সেই পরিস্থিতিতে কাষ্ঠহাসি হেসে বলতে হয় – “হ্যাঁ, ভালো আছি !” যদিও প্রকৃতপক্ষে ভালো প্রায় কেউই নেই!
কিন্তু ‘ভালো থাকাটা’ কি একেবারেই অসম্ভব ? – না, তাও নয় ! সুপ্রাচীন ভারতবর্ষের ঋষিরা উপনিষদের বিভিন্ন ছত্রে কিভাবে ভালো থাকা যায় – তার কথা বলে গেছেন। ভালো থাকার রাস্তা ভোগ-ঐশ্বর্য-ক্ষমতালিপ্সা ইত্যাদিতে নাই, ভালো তারাই থাকতে পারে__যারা ত্যাগ-সংযম-সাধনার মধ্যে রয়েছে। ভারতীয় ঋষিরা ছাড়া, ঐতিহাসিক great man হিসাবে আড়াই হাজার বছর আগে ভগবান বুদ্ধ (যেহেতু আধুনিক পন্ডিতেরা বুদ্ধ-পূর্ববর্তী ইতিহাসকে এখনও সেভাবে মান্যতা দেয়নি) বলে গেছেন – ‘কিভাবে ভালো থাকতে হয় !’ উনি অষ্টাঙ্গিক মার্গ(আট প্রকারের নিয়ম পালন)বিধান দিয়েছিলেন । তাছাড়াও বলেছিলেন – ” নির্বাণ লাভ হোলো মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং যোগমার্গ-ই (মজ্ঝিম্ মার্গ বা মধ্যপথ অর্থাৎ সুষুম্মাপথ) মানুষকে নির্বাণের পথে নিয়ে যায়।”
গুরুজীও তাই বললেন। উনি সর্বাধুনিক যুগপুরূষ, তাই একটু পরিমার্জন করে বললেন – “পূর্ণতা লাভই মানবজীবনের উদ্দেশ্য !” পূর্ণতালাভ বা ঈশ্বরলাভ প্রকৃতপক্ষে —‘ঈশ্বরত্ব’-লাভ ! জীবের শিব হয়ে ওঠা!
কিন্তু আমাদের আলোচনার শুরুতে যে কথা বলা হয়েছিল যে, ‘সাধারণ মানুষের মন-কে নিয়েই যত সমস্যা’ – তাহলে এখন একটা জিজ্ঞাসা এসেই যাচ্ছে যে, মনকে বশে কিভাবে আনা যাবে ? গুরুমহারাজ বললেন – ” প্রাণকে স্থির করতে পারলে তবে মনকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় – অন্যথায় তা কিছুতেই সম্ভব হয় না !” ‘প্রাণ’ স্থির হওয়া অর্থে প্রাণায়াম সিদ্ধ হওয়া। প্রাণ-উপাসনার দ্বারাই প্রাণ স্থির হয়, আর একমাত্র তখনই মনকে স্ববশে আনা যায়।
সদ্গুরুর সান্নিধ্যে এলে – সেই পরমপ্রেমময় সর্বজনহিতকারী গুরু মানুষকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করান। তাঁর পরম করুণাময় রূপ, মধুর প্রেমপূর্ণ ব্যবহার, জ্ঞানগর্ভ ‘প্রাণে নাড়া’ সৃষ্টিকারী বাণী___ মানুষকে horizental জগত থেকে vertical জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। তাই তো বলা হয় – ” মর্তের গুরু-ই ভগবান !” ( horizental- vertical জগত, মন ও প্রাণের বাকি কথা আগামী আলোচনায়) [ক্রমশঃ]
