শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের আলোচনায় ‘প্রাণ’ ও ‘মন’ বিষয়ক আলোচনা হচ্ছিলো। এই আলোচনায় ‘প্রাণ’ এবং ‘মনে’-র বিভিন্ন দিকও উঠে আসছিল। আমরা আগের দিন ‘প্রাণের উপাসনা’-র কথা বলেছিলাম। গুরুমহারাজ বলেছিলেন একেই উপনিষদে ‘প্রাণবিদ্যা’ বলা হয়েছে। ‘প্রাণ’-ই শক্তি, ‘প্রাণ’-ই ধর্ম ! স্বামী বিবেকানন্দও উপনিষদের ‘প্রাণবিদ্যা’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন অর্থে__ তাঁর “বানী ও রচনা” গ্রন্থাবলীতে উপনিষদে উল্লেখিত প্রাণবিদ্যা-র সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ করেছেন। সেইসব আলোচনায় আমরা যেটা বুঝতে পেরেছিলাম সেটা হোলো এই যে, এই সমগ্র জগৎ-সংসার প্রাণেই বিধৃত রয়েছে ! সেই অর্থে প্রাণ-ই ধর্ম ! কারণ ‘ধর্ম’ কথাটির অর্থই হলো – যা এই সমগ্র বিশ্বচরাচরকে ধারণ করে রাখে।
এই ব্যাপারে আর একটা আলোচনা করে নেওয়াই যায়, আর তা হলো ‘ধর্ম’ এই শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থের দিকটা ধরলে দেখা যায় শাস্ত্রকারেরা বলেছেন – ‘ধৃ’-ধাতুর মন্‌ প্রত্যয় করে ‘ধর্ম’ কথাটি নিষ্পন্ন হয়। ‘ধৃ’ অর্থাৎ ধারণ করা, মনের প্রত্যয় যোগ করার পর সম্পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায় ন্যায়, নীতি, আদর্শ,কর্তব্য_ইত্যাদি আচরণে আনা অর্থাৎ ন্যায়পরায়ণ হয়ে ওঠা, আদর্শ পরায়ণ হয়ে ওঠা ইত্যাদি।।
কিন্তু গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন ধৃ-ধাতুর মন্ প্রত্যয় করে যেমন ‘ধর্ম’ কথাটি নিষ্পন্ন হয়, তেমনি ‘ধৃ’-ধাতুর সাথে ‘গম্’ যুক্ত করেও ‘ধর্ম’ কথাটির সঠিক অর্থ বোঝানো যায়। গম্ অর্থাৎ যা গমনশীল বা গতিশীল, কারণ জীবনে পূর্ণতালাভের জন্য এগিয়ে চলা বা ‘চরৈবেতি’র একান্ত প্রয়োজন। সেই অর্থে ‘ধর্ম’ কখনই একটি নির্দিষ্ট বিধি-বিধান, মতবাদ-সংস্কারাদিতে আবদ্ধ হোতে পারে না। ধর্ম – স্বাধীন, গতিশীল, চিরমুক্ত, চির-উদার। এইজন্যেই ভারতীয় শাস্ত্রে (যেখানে প্রকৃত ধর্ম-বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনা রয়েছে) “বৈধী” এবং “অবৈধী” কথা দুটি রয়েছে। অর্থাৎ বৈধ নিয়ম-পালন করেও ধর্মাচরণ করা যায়, আবার বেদ-বিধি রহিত হয়েও ধর্মাচরণ করা যায়। এছাড়াও ভারতীয় শাশ্ত্রে __পরাশক্তি ৺রী মা-কে জ্ঞানরূপে, বিদ্যারূপে, সত্যরূপে প্রতিষ্ঠা করে যেমন স্তুতি করা হয়েছে – ঠিক তেমনি opposite ভাবে অর্থাৎ সেই পরমাশক্তি বা মাতৃকা শক্তিকে অজ্ঞানরূপে, অবিদ্যারূপে, ভ্রান্তিরূপেও স্তুতি করা হয়েছে ! গুরুমহারাজ এগুলিকে উল্লেখ করে বলতেন – ” কতো bold ছিল এই সব মহাজ্ঞানী মহাজনেরা !” গোটা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মমতের মানুষেরা ভারতীয় ঋষিদের এই boldness দেখে আজো অবাক হয়ে যায়।
তাছাড়া গুরুমহারাজ আরও বলেছিলেন – ভারতবর্ষ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য কোনো দেশেই ‘ধর্ম’– এই ব্যাপারটির কোনো ধারণাই ছিল না ! সব দেশেই পৃথক পৃথক উপাসনা পদ্ধতি রয়েছে, বিভিন্ন আইন বা বিধান রয়েছে, অনুষ্ঠান ও উপাচারের ভিন্নতা রয়েছে – কিন্তু ‘ধর্ম’-পালনের মাধ্যমে ‘সবকিছুকে ধরে রাখার’ concept কোনো দেশের ধর্মমতেই ছিল না ! যেমন, ধর্ম কথাটির ইংরাজী প্রতিশব্দ religion, প্রকৃতপক্ষে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘আইন’ বা বিধান! ইসলামীয় ধর্মাবলম্বীদের কথা যদি বলা হয়, তাহলে দেখা যায় ওরা নিজেরাই বলে যে ‘ইসলাম’ একটি ‘মজহব্’ অর্থাৎ সম্প্রদায়। এইভাবে পৃথিবীর হাজার হাজার ধর্মমত রয়েছে – কিন্তু ভারতবর্ষের ঋষিরা যেভাবে ধর্মপালনের সাথে সাথে ধর্ম যে ‘সমগ্র কিছুকেই ধারণ করা’-কে বুঝিয়েছেন – এটা একটা অসাধারণ concept !
গুরুমহারাজ আরও বলেছিলেন – ” জীবনের মধ্যে পরমাত্মার বোধ-ই (মানবের) ধর্ম !” তাহলে সমগ্র মানবজাতি যে বিষয়কে অবলম্বন করে এই পরমাত্মাকে বোধ করার জন্য অথবা পূর্ণতালাভের জন্য পরান্মুখ হয়ে উঠবে – সেটাই হবে সমগ্র মানবজাতির জীবন-ধর্ম ! প্রত্যেকের মধ্যে যখন এই concept আসবে যে, “যো সো করে আমাকে (নিজেকে) ‘পূর্ণ’ হতে হবে”– তখন আর তার অপরের সাথে বিবাদ-বিসম্বাদের জায়গা কোথায় ? তার মনে এইসব ভাবই আসবে না ! তখন তো প্রত্যেকে প্রত্যেকের পরিপূরক হয়ে উঠবে – একজন অপরের কাছে helpful হয়ে উঠবে !!
কিন্তু গুরুমহারাজ কি বলেছিলেন – ” একজন মহাপুরুষ (বা মহান ব্যক্তি)-কে কেন্দ্র করে প্রথম প্রথম কিছু অনুরাগী একনিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে। ফলে ক্রমান্বয়ে সেই আদর্শের ক্রমবিকাশ ও বিস্তার ঘটে এবং পরে নিজেরাই একটি পৃথক সম্প্রদায়ে পরিণত হয় !” এক-দুই generation-এর পর থেকেই ঐ সব সম্প্রদায়ে নানান বিধি-নিষেধ, নিয়ম-কানুনের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে মূল মহাপুরুষটির ‘সহজ’-ভাব থেকে অনুগামীরা সরতে সরতে বহুদূরে চলে যায় এবং তারা অ-সহজ, বিকৃত হয়ে পড়ে। তবু সেই সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরা ভাবতে থাকে যে, “তারাই বুঝি ধর্মের পথে সঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে !”
গুরুমহারাজ আরও বলেছিলেন – “এইরূপ সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবশতঃ ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত অবিবেকী মানবেরা মানবজাতির কল্যাণ করা তো দূরের কথা বরং তার পরিবর্তে মানবসমাজে অধিক ক্লেশ উৎপন্ন করে !”
গুরুমহারাজ বলেছিলেন যে – এইসব সম্প্রদায়ভুক্ত, অবিবেকী, অসহজ মানুষেরা নিজেদের মতকে অপরের উপর চাপানোর চেষ্টা পৃথিবীকে বারবার রক্তস্নাত করেছে, অপরকে মেরেছে – নিজেরাও মরেছে, কিন্তু তবুও ঐসব অসহজ-অবিবেকী মানবের শিক্ষা হয়নি ! আর হবেও না কখনো ! সেইদিনই হবে – যখন আবার মানুষ ‘ধর্ম’ কথাটির সঠিক অর্থ অনুধাবন করে প্রত্যেকেই ‘সহজ’ হবে অর্থাৎ অপরকে disturb-না করে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ পূর্ণতালাভের জন্য সচেষ্ট হবে !
# ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ !!#
****[ গত কয়েকটি এপিসোডে গুরু মহারাজের যে ছবিগুলো আপলোড করা হচ্ছিলো__সেগুলির বেশিরভাগই নর‌ওয়ের বেয়র্ন পিটারসনের। এগুলি ওদের ওখানকার “মাউন্ট টর্ন” নামে একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে গুরু মহারাজ সম্বন্ধীয় যে লেখাগুলি ছাপছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ! যেহেতু বেয়র্ন এই ফোটোগুলি fb-এ দেয় নি, তাই এগুলি ওখান থেকে নেওয়া এবং fb-এ পোস্ট করা উচিত নয় এবং আইনতঃ দন্ডনীয়। আমিও এই ব্যাপারটা জানতাম না, তাই করেছি। এখন আপনারাও জেনে গেলেন__আপনারাও কেউ ঐ ধরণের কোনো ছবি বা লেখা fb-এ পোস্ট করবেন না।]****