শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের ‘প্রাণ ও মন’ সম্বন্ধীয় বলা কথাগুলির আলোচনা প্রসঙ্গে, আগেরদিন ‘প্রকৃত ধর্ম কি’_ সেই প্রসঙ্গেও কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” পৃথিবীতে সকল মানুষ-ই ধর্ম নিয়ে আছে ! ধর্মের বাইরে কেউ নাই।” যেহেতু এই সমগ্র জগৎসংসার ধর্ম দ্বারাই বিধৃত রয়েছে – তাই এর বাইরে কেউ থাকতে পারবেই বা কি করে !!
গুরু মহারাজ আরও বলেছিলেন – ” এই পৃথিবীতে কেউ নিজেকে বলে,’আমি ‘আস্তিক’, কেউ বলে ‘আমি নাস্তিক’ – কিন্তু ‘বোধ’ না হওয়া পর্যন্ত এই কথাগুলি বলা মানেই আহম্মকি !” মাছ জলে থাকা সত্ত্বেও যেমন তার জলের স্বরূপের জ্ঞান নেই তেমনই অজ্ঞানী, আহম্মক মানুষেরাও ধর্মের মধ্যে থেকেও বলে, ‘আমি ধর্ম মানি না’ ! অপরদিকে আর একদল ব্যক্তি বলে, ‘আমি ধর্ম মানি’, ‘আমি আস্তিক’- ইত্যাদি ! কিন্তু ওই ব্যক্তিদেরও ধর্মবোধ নাই ! সেই অর্থে ‘আমি ধর্ম মানি’ অথবা ‘আমি ধর্ম মানি না’ – বলা মানুষগুলোর মধ্যে মূলতঃ কোনো প্রভেদ-ই নাই ! সেই অর্থে, উভয় দলের সদস্য-রাই অজ্ঞান, ভ্রান্ত এবং আহাম্মক ! এখানে ‘আহাম্মক’ বলতে ‘ধর্মবোধ’হীন মানুষদেরকে বোঝানো হোচ্ছে !
‘চরৈবেতি’ অর্থাৎ এগিয়ে চলা ! পূর্ণত্বের দিকে মানবের এগিয়ে চলা-ই মানবজীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। আর এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আচরণীয় কর্তব্যগুলিই যথার্থ ধর্মাচরণ ! এখন একটা প্রশ্ন অবশ্যই আসতে পারে যে, পূর্ণতা কি ? আর এটা মানবজীবনের উদ্দেশ্য অথবা লক্ষ্য হবেই বা কেন ? সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হয় এটাই তো জীবের ‘সহজতা’ বা ‘স্বাভাবিকতা’ ! জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে সকল জীব ছুটে চলেছে তার স্বাভাবিক গতিতে পূর্ণত্বের দিকে ! সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে জড় থেকে জীবে এবং নিম্নতর জীব থেকে উচ্চতর জীবে যে ক্রম-উদবর্তন বা বিবর্তন হয়ে চলেছে – তার চূড়ান্ত পরিণতি-ই হলো পূর্ণতা !
গুরুমহারাজ এইসব কথাগুলি তাঁর প্রথম রচনা “সহজতা ও প্রেম” গ্রন্থে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। আমরা শুনেছিলাম বইটির মূল পান্ডুলিপি গুরুমহারাজ হিমালয়ের কোনো স্থানে প্রথম লিখেছিলেন, পরে বনগ্রাম আশ্রম প্রতিষ্ঠার একেবারে প্রথম লগ্নে উনি এই বইটি বনগ্রামে ন’কাকাদের মাটির বাড়ির দেড়তলার ডানদিকের ঘরটিতে বসে বসে সম্পূর্ণতা দান করেছিলেন। গুরুমহারাজই বলে গেছেন যে, ওই বইটি (সহজতা ও প্রেম) আগামীদিনে মানুষের কাছে ‘গীতা’-র ন্যায় মর্যাদা পাবে। বেশিরভাগ মানুষ সর্বদা বইটি তার সাথে রাখার চেষ্টা করবে। এইভাবেই(যুগপুরুষ গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের শিক্ষা গ্রহণ করে) হয়তো আগামীতে মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন ঘটবে। যুগপুরুষদের তো এইটাই কাজ ! আর সেই কাজটা হোলো – মানুষের জীবনের যে জড়তা, আবদ্ধতা অর্থাৎ কোনো মতবাদে বা আদর্শে অথবা কোনো সংস্কারে আটকে পড়া অবস্থা থেকে টেনে বের করে এনে, তাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে দেওয়া অর্থাৎ জড়তা কাটিয়ে গতিশীল করে দেওয়া !
এই অর্থে এঁরাই হোলেন প্রকৃত ‘ধর্মগুরু’ ! যেহেতু পূর্ণতার দিকে এঁরা সমগ্র মানবজাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে আনার কাজ করছেন, জড়ত্ব-আবদ্ধতা-সংকীর্ণতায় ইত্যাদিতে আটকে যাওয়া মানুষজনেদের জীবনে মুক্তির আস্বাদ দিচ্ছেন – তাই তো তাঁরাই এক এক যুগের পথপ্রদর্শক, সেই যুগের যুগপুরুষ – যুগাবতার ! এবার যেমন স্বামী পরমানন্দ এসেছিলেন যুগপুরুষরূপে ! উনি মানুষকে বাঁধন-কাটার গান শোনালেন, প্রকৃত বাউলভাব কি – তার ব্যাখ্যা করে মানুষের মনে হাজার হাজার বছরের জমে থাকা জঞ্জাল (বদ্ধসংস্কার) সাফ করার কাজ করে গেলেন, স্বয়ং সশরীরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সেখানকার কিছু কিছু মানুষদেরকে (অবশ্যই এঁরা পূর্ব থেকেই নির্দিষ্ট) আধ্যাত্মিকতা, জ্ঞান ও প্রেমের দ্বারা বশীভূত করে তাদেরকেও তাঁর কাজে নিয়োজিত করলেন ! আরও কত কি যে তিনি করে গেলেন তা স্বয়ং তিনি ছাড়া আর কে-ই বা বলতে পারে ?
দেখুন, মানুষ তো ‘মনে’ই বদ্ধ আর ‘মনে’ই মুক্ত ! স্বভাব বলুন, সংস্কার বলুন, আর যাই কিছু বলুন না কেন – সবই তো মনে দৃঢ়ভাবে বসে রয়েছে বলেই আমরা বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ ঘটাই ! জন্ম-জন্মান্তর ধরে মনে গেড়ে বসে থাকা যেকোনো সংস্কারকে যদি আপনি প্রথমে ঐ ‘মনে’ই মুক্ত করতে পারেন – তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই দেখবেন সেই ‘সংস্কার’ যা দীর্ঘদিন ধরে আপনাকে ‘বেঁধে’ রেখেছিল, আপনি তার থেকে তখনই ‘মুক্ত’ হয়ে গেলেন ! এইভাবেই মানুষ সদ্গুরুর সংস্পর্শে এসে, তাঁর লেখা পড়ে অথবা তাঁর কথা শুনে, তার জীবনের সংস্কার-রাশির অনেক বাঁধন কেটে ফেলতে পারে। আর বাঁধন কাটা মানেই তো মুক্তির স্বাদ – তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে চলা !
[ পরের আলোচনায় ‘মনে’-র কথা !]