শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের ‘প্রাণ ও মন’ বিষয়ক বিভিন্ন আলোচনার অংশ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছিলো ৷ আগের দিন আমরা অন্তঃকরণ চতুঃষ্টয় অর্থাৎ মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার নিয়ে কিছুটা আলোচনা করেছিলাম। গুরু মহারাজ বলেছিলেন – মন, বুদ্ধি ও অহংকার হোলো চিত্তেরই তিনটি পৃথক পৃথক বৃত্তি ! আমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য উনি উদাহরণ হিসাবে বলেছিলেন – ” চিত্ত যেন হ্রদ বা সরোবর, সেই সরোবরে কোনরূপ বিক্ষেপ সৃষ্টি হলেই তরঙ্গ উৎপন্ন হয় এবং শান্ত সরোবর বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চিত্তের বৃত্তিগুলি সেইরূপ তরঙ্গ বিশেষ।”
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – চিত্তের আবার অনেকগুলি অবস্থা রয়েছে। যেমন – ক্ষুব্ধ চিত্ত, বিক্ষুব্ধ চিত্ত, মূঢ় চিত্ত, শান্ত চিত্ত ও নিরুদ্ধ চিত্ত। আমাদের মতো সাধারন মানুষদের চিত্ত ঐ প্রথম তিন প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে অর্থাৎ আমাদের চিত্ত হয় ক্ষুব্ধ বা বিক্ষুব্ধ অথবা মূঢ় ! আর সেইজন্যেই তো আমাদের (মানব সমাজে) মধ্যে এত অশান্তি, ঝগড়াঝাঁটি-হানাহানি-মারামারি-রক্তপাত-প্রতিহিংসাপরায়ণতা ! আমরা কেউই শান্তিতে নাই – আর থাকতেও পারবো না কখনো – যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা শান্ত-চিত্ত বিশিষ্ট বা নিরুদ্ধ-চিত্ত বিশিষ্ট হোতে পারছি ! আমরা ভাবছি সবাই আমার মতে চললেই সমাজে শান্তি আসবে ! আর এই মানসিকতায় পুষ্ট হয়ে কেউ কেউ ভাবছে__ আমার মনোমত রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় সকলে আসলেই সমাজে শান্তি আসবে ! কেউ কেউ ভাবছে__ আমার মনোমত ধর্মীয় মতবাদের ছত্রছায়ায় সকলকে আনতে পারলেই মানবসমাজে শান্তি নেমে আসবে ! এইরকম নানান ভাবনায় ভাবিত হোচ্ছে মানুষ আর সমাজে ‘শান্তি আনয়নে’-র নামে নিত্যনতুন অশান্তির জন্ম দিচ্ছে !
কিন্তু মূল সূত্রটি হ’ল – “নিজে ‘শান্ত’ হতে পারলেই ‘শান্তি’ পাওয়া যাবে।” নিজের শান্ত হওয়া মানেই হোচ্ছে চিত্তকে শান্ত করা বা শান্ত-চিত্ত হওয়া। যোগের দৃষ্টিতে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘আজ্ঞাচক্রে স্থিত’ হওয়া ! এইটাই ‘ঋষি অবস্থা’ বা ‘সিদ্ধ অবস্থা’ ! ‘সিদ্ধ’ কথাটি বোঝাতে গিয়ে উদাহরণ দিয়ে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” যেমন ছোলা-মটর সিদ্ধ হয়ে গেলে সেগুলি আর অঙ্কুরিত হয় না – ঠিক তেমনই কোনো সাধক সিদ্ধ হয়ে গেলে, আর তাকে এই কামনা-বাসনার জগতে ফাঁসতে হয় না অর্থাৎ তাকে আর জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে ঘুরে মরতে হয় না ! তখন তাঁর জন্ম হয় ঈশ্বরের ইচ্ছায়, মানবকল্যাণার্থে !
গুরুমহারাজ ‘বাউল কথা’ ২-য় খন্ড গ্রন্থে অন্তঃকরণ চতুঃষ্টয়ের কার্যকারিতা কিভাবে সম্পন্ন হয় তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছেন। উনি বলেছেন – ” মনের ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিগুলি বুদ্ধিতে এবং বুদ্ধির সংস্কারগুলি অহংকারে আর অহংকার চিত্তে প্রসুপ্ত হয়।” এইরকমটা হয় স্বপ্নহীন গাঢ় নিদ্রার সময় বা সুষুপ্তিতে। এই অবস্থা থেকে মানব যখন আবার জাগ্রত হয় তখন – ” অহংকার বা অভিমান প্রথম জাগ্রত হয় চিত্তে, তারপর ‘অভিমান’ বুদ্ধিতে ক্রিয়াশীল হয় এবং বুদ্ধির সংস্কারগুলি মনে আন্দোলিত হয়ে ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিরূপে ক্রিয়াশীল হয়।”
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” মানবশরীরে ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া, মনের ক্রিয়া, বুদ্ধির ক্রিয়া – এই সমস্তই বায়ু বা প্রাণস্পন্দনজাত।” অর্থাৎ মানবের শরীরে যতক্ষণ প্রাণের স্পন্দন থাকে – ততক্ষণই ইন্দ্রিয়, মন বা বুদ্ধি সেই শরীরে ক্রিয়াশীল থাকে। আবার অন্যত্র গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “অহংকার মনেতে অধিষ্ঠিত, মন বুদ্ধিতে অধিষ্ঠিত কিন্তু বুদ্ধি কোনোকিছুতে অধিষ্ঠিত নয় – বুদ্ধির সাক্ষী আত্মা। আত্মাই সমস্ত কিছুর অধিষ্ঠান এবং প্রকাশক।” এইভাবে গুরুমহারাজের বলা কথায় এবং তাঁর লেখা থেকে আমরা অন্তঃকরণ চতুষ্টয় সম্বন্ধে এবং সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারি।
যাইহোক, আমরা আলোচনা করছিলাম মন-কে নিয়ে ! চিত্তের সংকল্প-বিকল্পাত্মিকা বৃত্তিই হোলো মন। গুরুমহারাজ মানবশরীরে মনের অবস্থানের কথা বলেছিলেন “দ্বিদল পদ্মের (আজ্ঞাচক্র) মধ্যস্থলে যোনিরূপিনী ত্রিকোণ বিরাজমান। ….. মানবের সূক্ষ্মরূপী ‘মন’ও ওইস্থানে অবস্থান করে।” এই কথা থেকে মানবশরীরে মনের অবস্থান সম্বন্ধেও একটা ধারণা পাওয়া গেল।
গুরুমহারাজ মনের তিনটি অবস্থার কথা বলেছিলেন – চেতন অবস্থা, প্রাক্-চেতন অবস্থা ও অবচেতন অবস্থা। জাগ্রত অবস্থায় মানুষের মনের অবস্থাকে বলা হয় চেতন অবস্থা (conscious mind), আর সুপ্ত অবস্থায় বা স্বপ্নাবস্থায় মনের অবস্থাকে অবচেতন (sub-conscious mind) বলা হয়। প্রাক্-চেতন বা pre-conscious mind এই দুটি অবস্থার মধ্যে সংযোগ-সাধন ঘটিয়ে থাকে। গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ভারতীয় দর্শনে যেভাবে চিত্ত এবং চিত্তবৃত্তিগুলির ভাব ব্যাখ্যা করা হয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের দর্শনশাস্ত্রে সেইভাবে এগুলিকে পরিস্ফুট করা যায়নি। ইংরেজিতে তো ‘মন’ এবং ‘চিত্ত’ এই দুটিরই প্রতিশব্দ করা হয়েছে ‘mind’ ! কিন্তু ‘মন’-কে mind বলা হলেও চিত্তের ইংরাজী প্রতিশব্দ হলো mind-stuff ! [ক্রমশঃ]