শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের বলা নানান কথা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। গুরুমহারাজ ‘উপাসনা প্রসঙ্গে’– লেখায় সাধকের আরাধনা বা উপাসনার সময় প্রতীক, প্রতিমা ইত্যাদির প্রয়োজন রয়েছে কিনা, এই নিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিস্তৃত ও পরিষ্কার আলোচনা করেছেন। উনি বলেছেন – ” মানব-মনের ধর্ম প্রকাশিত হয় *রূপ* ও *রেখা”*-র মধ্য দিয়ে।” কি গভীর ভাবব্যঞ্জক কথা !! তার মানে হচ্ছে – যতক্ষণ মানবের মনের ক্রিয়া রয়েছে, ততক্ষণ সে কোনো না কোনো রূপের সাহায্যে বা মনে মনে রেখাচিত্র অংকন করেই যেকোনো বিষয়-বস্তু, ঘটনা অথবা তত্ত্বকে বুঝতে চায় ! এককথায় মানবের পক্ষে ‘মানবিক স্তরে’ থেকে কোনো না কোনো “প্রতীক” বা মূর্তি ছাড়া চিন্তা করাই অসম্ভব।
সুতরাং গুরুমহারাজের এই আলোচনায় আমরা এই সিদ্ধান্ত করতেই পারি যে, কেউ জেনে-বুঝে কোনো স্থূল প্রতীক বা প্রতিমাকে সামনে রেখে উপাসনা করে – আবার কোনো কোনো জন “আমি প্রতীক মানি না”, “আমি মূর্তি উপাসনা পছন্দ করি না”– মুখে বললেও চোখ বুজে পরমেশ্বরের চিন্তা করতে গিয়ে মনোজগতে কোনো না কোনো রূপকেই কল্পনা করে অথবা রেখাচিত্রের সাহায্যে কোনো প্রতীককে নিয়েই ভাবতে থাকে ! সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রাথমিক অবস্থায় যেকোনো উপাসকেরই(তা সে যে কোনো মত বা পথের ই হোক না কেন!) সগুন বা সাকার উপাসনার প্রয়োজন হয় ! এটা তুমি মানো, আর নাই মানো বাছাধন !!
আর এই বিজ্ঞান যদি কেউ অস্বীকার করে এবং বলতে চায় যে, “আমি ঐসব মানি না_আমি প্রথমেই নিরাকার সাধনা করবো !” তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে জানেন – ‘যেমন কোনো ছেলেকে প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারীতে না পড়িয়ে একেবারে ইউনিভার্সিটির কোর্সে ভর্তি করে দেওয়া !’ এতে কি হবে – ওই ছাত্রের একুল-ও গেল, ওকুল-ও গেল ! কোনোটাই শেখা হয়ে উঠলো না ! এক্ষেত্রে শুধু একটাই ব্যাপার হয় যে, ” আমি তোদের মতো প্রাইমারি, সেকেন্ডারীতে পড়ি না, আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি !”–আহাম্মকটি এই ভেবে অহংকারী হয়ে ওঠে এবং নিজের সাথে সাথে সমগ্র মানবসমাজের চরম সর্বনাশ সাধন করে৷
এবার- এখানে একটা কথা এসেই যাচ্ছে যে, তাহলে বিভিন্ন সময়ে এই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করে একাধিক মহাপুরুষগণ প্রতীক-প্রতিমা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন কেন ? কেনই বা তাঁরা তাদের followers-দেরকেও এইগুলির বিরোধিতা করতে বলেছেন ?? এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে গুরুমহারাজের বিভিন্ন আলোচনার সূত্র ধরে আমরা যা জেনেছি তা এই যে, এখানে প্রথম এবং প্রধান শর্তই হোলো__স্থান-কাল-পাত্র !! কে বলেছেন-কখন বলেছেন-কাদেরকে বলেছেন !! মহাপুরুষদের সব কথা কিন্তু সবার জন্য নয় ! তাঁরা স্থান-কাল-পাত্রভেদে আলাদা আলাদা শিক্ষা দেন, আলাদা আলাদা দীক্ষা দেন ।। আর পৃথিবীর সমস্ত মানুষ কখনোই এক‌ই রকম শিক্ষা গ্রহণ‌ও করবে না__এটাই মহাবিশ্বপ্রাকৃতিক বিধান !! এইটা মহাপুরুষগণ ভালোমতোই জানেন _তাই তাঁরা কিছু সার্বজনীন শিক্ষা সকলের জন্য বলে গেলেও বেশিরভাগ শিক্ষাই সেই সময়ের, সেই স্থানের মানুষজনেদের জন্য।
এছাড়া ঐ ধরনের কোনো মহাপুরুষেরই নিজের হাতে লেখা কোনো গ্রন্থ নাই ! তাঁরা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অবস্থায় যে সমস্ত কথা বলেছিলেন__ সেইগুলি অনেক পরবর্তীতে তাদের শিষ্যদের দ্বারা লিপিবদ্ধ হয়েছিল (তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ হিসাবে)। কিন্তু এখানেও একটা বিরাট ব্যাপার ঘটে গেছে এই যে, ঐ সমস্ত গ্রন্থগুলিকে authentic হিসাবে ধরে নেওয়া হয় বটে কিন্তু এটা একদম clear যে, সেইসব গ্রন্থের মাধ্যমে ঐ সব মহাপুরুষদের শিক্ষার সবটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি !! এমন‌ও হয়েছে যে, ধর্মগ্রন্থগুলির content-ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে, নতুন সংযোজন হয়েছে (এটা রাজতন্ত্রের যুগে সব ধর্মমতেই ঘটেছে); এক ভাষার গ্রন্থ অন্য ভাষায় translated হোলে অর্থ পরিবর্তনের এবং নতুন কিছু সংযোজনের সম্ভাবনা আরও শতগুণ-সহস্রগুন বেড়ে যায়।
ফলে, সাধারণ মানুষ বড় অসহায় !! কি পাওয়া উচিত_আর কি পেয়ে থাকে ! কি পড়া উচিত_আর কি পড়ে থাকে ! কি বোঝা উচিত_আর কি বুঝে থাকে !!!
আসলে কি ঘটনা ঘটেছিল জানেন ? – তখন ছিল রাজতন্ত্রের যুগ ! ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় যে, রাজারা কখনোই ঠিক ঠিক প্রজানুরঞ্জক হয় না ! বেশিরভাগ রাজারাই তাদের ভোগ-বিলাস-জাঁকজমকতা-ধন-জন-ক্ষমতার গর্ব বা অহংকার, উশৃংখলতা ইত্যাদি নিয়ে সারাজীবন ধরে এতো ব্যস্ত থাকে যে, সাধারন মানুষদের অর্থাৎ প্রজাদের অবস্থা দিন দিন হয়ে ওঠে শোচনীয় ! তাছাড়া রাজন্যবর্গের অন্যতম একটা প্রচেষ্টা সব সময় ক্রিয়াশীল থাকে, আর তা হোলো সাম্রাজ্য বিস্তারের অভিলাষ ! ক্ষমতায় উন্মত্ত রাজা ছলে-বলে-কৌশলে পার্শ্ববর্তী রাজ্য বা অন্যান্য ছোট ছোট জনগোষ্ঠীকে নিজের অধীনে আনতে চায়।
গুরুমহারাজ একবার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, যীশুখ্রীষ্ট এবং হযরত মুহাম্মদ এই দুই মহাপুরুষের প্রচারিত ধর্মমতই সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল ঐসব অঞ্চলের তৎকালীন শক্তিশালী রাজন্যবর্গের দ্বারা ! তবে মজার ব্যাপার হোলো এই যে, যীশুর ক্ষেত্রে ওখানকার তৎকালীন রাজন্যবর্গরা যীশুর মতকে একেবারে দাবিয়ে দিতে চেয়েছিল ! ফলে ওরা যীশুর প্রায় সমস্ত অনুগামীকেই মেরে ফেলেছিল ! একমাত্র সাধু থমাস্ (St.Tomas) কোনোক্রমে বণিকদের বাণিজ্যিক নৌকা বা জাহাজে চেপে ভারতীয় উপকূলে (কেরলে) পালিয়ে এসেছিল এবং ওখানেই বসবাস করাকালীন সে প্রথম যিশুখ্রিস্টের প্রচারিত ধর্মের কথা মানুষজনকে শোনায় এবং কিছু কিছু ‘মছোয়ার’ বা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের লোকজনকে ‘Baptise’ করে। এটাই হলো খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তনের ইতিহাস ! কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা নয় খ্রিস্টের মত অবলুপ্ত হোক, তাই ওইখান থেকেই ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্ম আবার ইউরোপে ফিরে গিয়ে গোটা পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছিল।
কিন্তু হযরত মুহাম্মদের প্রচারিত ধর্মের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটে গিয়েছিল অন্যরকম ! গুরুমহারাজ বলেছিলেন – সেইসময় আরবের শক্তিশালী রাজন্যবর্গ হযরত মুহাম্মদের প্রচারিত মতের শিক্ষাকে capitalised করে সাম্রাজ্যবাদ নীতিকে সফলভাবে কার্যকরী করতে চেয়েছিলেন এবং আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে ধর্মের নামে এক ছত্রছায়ায় আনতে অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। [ক্রমশঃ]