শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (বলা ও লেখা) নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আগের দিন ‘মুক্তি’-র প্রসঙ্গ উঠেছিল। সেই প্রসঙ্গেই গুরুমহারাজ বলেছিলেন, ” প্রিয় আত্মন – ‘মুক্তি’ বা ‘মোক্ষ’ নামক কথাটি জগতে প্রচারিত আছে, কিন্তু এটা নতুন কিছু প্রাপ্তি নয় – যা পূর্ব হোতে বিদ্যমান বা নিত্যস্বরূপ অর্থাৎ পূর্ণতা যেখানে পূর্ব হোতেই বিদ্যমান, সেই পূর্ণতাকে শুধু ‘বোধে বোধ’ করা মাত্র। মানব আপন পুরুষার্থ দ্বারা মুক্ত হয়, কেউ তাকে মুক্তি দিতে পারে না, আর ওই পুরুষার্থই হোলো প্রেম।”
গুরুমহারাজের এই কথাগুলি ব্যাখ্যা করার ধৃষ্টতা আমার নাই, এখানে শুধুমাত্র আমরা আলোচনাই করতে পারি – তার বেশি কিছু নয়। তাহলে, আমরা ‘মুক্তি’ বা ‘মোক্ষ’ সম্বন্ধে যা ধারণা করতাম – গুরুমহারাজ সেখান থেকে আমাদেরকে অর্থাৎ আমাদের চেতনাকে অনেকটাই ঊর্ধ্বে নিয়ে চলে গেলেন। ‘মুক্তি’ বা ‘মোক্ষ’ হোলো পূর্ণতা। আর যে ‘পূর্ণতা’ সম্বন্ধে বলা হোলো – যা পূর্ব হোতেই বিদ্যমান, এটা নতুন কোনো ‘প্রাপ্তি’ নয়। এই কথা যেন উপনিষদের সেই মহামন্ত্র – ” পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং……”–কেই সিদ্ধ করছে।
কিন্তু শুধুমাত্র ঋষিদের উক্ত (কথিত) কথা-ই নয়, সেই কথাগুলিকে ‘বোধ’ করা, ‘বোধে বোধ’ করা – এটাই প্রকৃত কাজ বা ‘কাজের কাজ’। ‘কাজের কাজ’টি করতে পারলেই তো হয়ে গেল – আর চাইটাই বা কি ? তখন ‘উহা যেমন পূর্ণ’ – তেমনি ‘ইহা-ও পূর্ণ’! এমন মানুষের কথাই তো গুরুমহারাজ বারবার উল্লেখ করেছেন ‘সহজ মানব’ রূপে। ‘সহজ’ মানুষ বলতে উনি বলেছেন – ” সহজই আত্মা, সহজই সাঁই – সাঁই-এর ঊর্দ্ধে আর কিছু নাই।”
আর একটা গুরুমহারাজ উপরোক্ত লাইনগুলিতে বলেছেন, সেটা হোলো – ‘পূর্ণতা’ লাভ করার জন্য যে ‘পুরুষার্থ’ প্রয়োজন হয়, তা হোলো ‘প্রেম’ ! কি সাংঘাতিক কথা ! প্রেম-ই পুরুষার্থ ! কিন্তু ‘প্রেম লাভ’ কি এতই সহজ কথা ? ওই যে গুরুমহারাজ বলেছেন – ” জ্ঞানের সিংহাসনে বিরাজ করুক ‘প্রেম’ !” সমস্ত কথাটা হোলো – ” কর্ম হোক ধ্যান, ধ্যানে ভর করুক জ্ঞান, আর জ্ঞানের সিংহাসনে বিরাজ করুক প্রেম !” এই কথার ব্যাখ্যাও গুরুমহারাজ করেছিলেন – “এই কথার মর্মার্থ হোলো শরীর, হৃদয় ও মস্তিষ্কের পূর্ণ বিকাশ ঘটানো !” দেহ বা শরীরের পূর্ণ উপযোগ তখনই হবে যখন এই শরীর দিয়ে ‘সেবা’ হবে। ‘সেবা’ অর্থে সম্পূর্ণরূপে স্বার্থমুক্ত ‘জীব সেবা’ । এইরূপ ‘সেবা’ই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ উপাসনা। পূজা-পাঠ, সাজসজ্জা, আচার-অনুষ্ঠান অপেক্ষা এতেই ঈশ্বর অধিক প্রসন্ন হন। এই নিঃস্বার্থ সেবা-ই ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ পূজা। মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যও তাই ভজন-পূজনের পর দরিদ্র-নারায়ণ ‘ভোজনের’ ব্যবস্থা প্রচলন করেছিলেন। ক্ষুধার্ত, বুভুক্ষু মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াটা অন্যতম এক সেবা। এটিও একপ্রকার যজ্ঞ__যেখানে পেটের ক্ষুধা-রূপ অনল হু-হু করে জ্বলছে এবং অন্ন দিয়ে__তাতে আহুতি দেওয়া হোচ্ছে! এইজন্যেই বলা হয়__’আহার নয় আহুতি!’
কিন্তু এখন ভজন-পূজনের পর যে ভোজনের আয়োজন করা হয়, তা তো নিয়মতান্ত্রিকতায় অথবা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোয় পর্যবসিত হয়েছে !
সাধারণ মানুষ এই দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করে দুইরকম বিপরীত তত্ত্বের আয়ত্তে পড়ে যায় – যেমন হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, দিন-রাত্রি, ভালো-মন্দ ইত্যাদি। ‘দুই’ নিয়া বলেই এর নাম হয়েছে দুনিয়া ! তাইতো আমরা সাধারন জীব সবসময় সবকিছুতেই ভেদ দেখি – বহু দেখি। ‘এক’ থেকে ‘দুই’ এবং দুই থেকেই অনেক – এই সাধারন ক্রমে পড়ে যায় সাধারণ মানুষ ! এইভাবেই আমরা ভেদদৃষ্টিতে, বিভিন্নতায় এমন ভাবে ফেঁসে গেছি যে, আমরা স্বরূপতঃ যে অভেদ – তা ভুলে বসেছি। এইটাই গুরুমহারাজ তাঁর কবিতায় বলেছেন – ” কি হারিয়েছো তুমি ? সহজতা হারিয়েছো !” হ্যাঁ, আমরা সহজতা হারিয়ে অসহজ হয়ে পড়েছি এবং জাগতিক জ্বালা-যন্ত্রণার শিকার হয়ে কষ্ট পাচ্ছি। এই জন্যেই প্রয়োজন হয় আধ্যাত্মিক গুরুর অর্থাৎ সদ্গুরুর ! প্রকৃত সদ্গুরু তিনিই, যিনি নিজে ‘সহজ’ স্থিতিতে পৌঁছেছেন_ ‘সহজ’ হয়েছেন। তিনি সদাসর্বদা সেই আনন্দময় সহজ অবস্থার মধ্যেই বিরাজ করছেন।
গুরুমহারাজ বললেন – ” আনন্দময় সহজ সদ্গুরু লাভ হোলে সমস্ত ভেদের নিরসন ঘটে এবং মানব দ্বৈতাদ্বৈতবাদ মুক্ত হয়ে পরমতত্ত্বে অবস্থিত হয় বা আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করে স্ব-স্বরূপে সমাহিত হয়।” এইজন্য ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে রয়েছে মানবজীবনে পূর্ণতালাভ করতে হোলে তিনটি প্রধান শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয় – ” মনুষ্যত্বম, মুমুক্ষুত্বম্, মহাপুরুষ-সংসর্গম্ !” মনুষ্যজীবন লাভ হওয়াটাই জীবের পক্ষে একটা মহাসৌভাগ্যের ব্যাপার ! কারণ ৮৪ লক্ষ বার শরীর ধারণ করে মনুষ্যজন্ম পাওয়া যায়। কিন্তু এরপরেও আত্মসাক্ষাৎকারের প্রচেষ্টা আসতে আরও বেশ কয়েকজন্ম লেগে যায়। এই প্রচেষ্টাকে বলা হয়েছে “মুমুক্ষুত্বম”! মুমুক্ষু মানবের পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য – ব্যস্ শুধু আর একটা ধাপ অতিক্রম করতে হয় – আর তা হোলো মহাপুরুষসংসর্গ বা সদ্গুরুর সান্নিধ্যলাভ।
একবার সদ্গুরুর পদপ্রান্তে বসে সমিকপানি হয়ে নিজেকে তাঁর কাছে নিবেদন করতে পারলেই গুরু ঐ ব্যক্তির প্রতি প্রসন্ন হ’ন – আর একবার গুরু প্রসন্ন হলেই তিনি ঐ সাধককে দীক্ষাপ্রদান করে তাকে শিষ্য করে নেন। এইবার যদি সেই শিষ্য, গুরুর সাথে সম্বন্ধ স্থাপন করে নিতে পারেন – তাহলেই হয়ে গেল ! গুরু তাকে হাত ধরে ‘মুক্তি’র দরজায় পৌঁছে দেবেন। যে মুক্তি তার চিরআকাঙ্খিত প্রিয়ের সাথে ঘটাবে মিলন !