শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (কথিত ও লিখিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা গুরুমহারাজের লেখা দ্বিতীয় গ্রন্থ *বাউলের মর্মকথা* থেকে পাঠ তুলে তুলে ধরছিলাম। এইটি করার অন্যতম উদ্দেশ্য হোলো এই যে, *বাউলের মর্মকথা* বইটি পাঠ করে জনৈক ভক্ত একদিন বনগ্রাম আশ্রমের সকালের সিটিংয়ে গুরুমহারাজকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন – ” গুরুজী ! আপনার লেখা *বাউলের মর্মকথা* বইটি বেশ ভালো করে পড়লাম। কিন্তু কিছুই তো প্রায় বুঝতে পারলাম না !” এর উত্তরে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” বাবা ! এই বইটি কি কোনো প্রেমের উপন্যাস – যে তোমার জীবনের নানান অভিজ্ঞতা-প্রসূত ঘটনা, জীবনের উঠা-পড়া, হাসি-কান্নার সাথে মিল পাবে? মানুষের ঐ ধরনের উপন্যাস একবার পড়লে অথবা কোনো নাটক, যাত্রা, সিনেমা দেখলে বহুদিন মনে থাকে – সেই ব্যক্তি গড়গড় করে সেই কাহিনী অপর ব্যক্তিকে শুনিয়েও থাকে ! কিন্তু *বাউলের মর্মকথা* হোলো একটি আধ্যাত্মিক গ্রন্থ ! এখানে যেসব বিষয়ের কথা লেখা আছে – তোমার চেতনা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছায়নি। তুমি তোমার জীবনে এখনো এগুলির experience করো নি ! তবে তোমাকে ঐখানে পৌঁছাতে হবে – তোমাকে ঐগুলি experience করতে হবে। তাই তোমাকে এই ধরনের বই বারবার পড়তে হবে এবং একান্তে বসে এই গ্রন্থের বিষয়বস্তুগুলি নিয়ে মনন করতে হবে – নিদিধ্যাসন করতে হবে, ধ্যান করতে হবে। – তাহলে দেখবে ধীরে ধীরে তোমার কাছে সবকিছুই বেশ পরিষ্কার হোতে থাকবে।”
গুরু মহারাজের উপরিউক্ত কথাগুলি শোনার পর সেদিন আমাদের উপস্থিত সকলেরই চিন্তার জগতে এক নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছিল। সত্যিই তো ! আমরা জীবনের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই মুড়ি-মিছরীর একই দর ভেবে ভুল করে বসি ! আমার নিজস্ব চেতনার Level দিয়ে সবকিছুকেই একইভাবে বিচার করতে যাই এবং সেইজন্যেই জীবনে চলার পথের প্রতিটি বাঁকে ধাক্কা খাই, ঠোক্কর খাই – হিসাব মেলাতে পারি না ! অথচ যুগপুরুষ গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ কতো সহজ করে আমাদের সেদিন বুঝিয়ে দিলেন যে, সব জিনিসকে একই নিক্তিতে মাপা যায় না ! আলু-বেগুন মাপার জন্য যে তুলদাঁড়ি ব্যবহার করা হয় তা দিয়ে সোনা মাপা হয় না — এর জন্য আলাদাভাবে নির্মিত এবং ঘেরাটোপের মধ্যে রক্ষিত অত্যন্ত Sensitive তুলাযন্ত্র ব্যবহার করতে হয়।
যাইহোক, সেইদিনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, অবতার পুরুষদের রচিত কোনো আধ্যাত্মিক গ্রন্থ বারবার পাঠ করতে হয় – তবেই ঐ যুগপুরুষ যে সমস্ত কথা আমাদেরকে বলতে এসেছিলেন, তার মর্মার্থ কিছুটা হোলেও বোধগম্য হয় এবং আমরা তা নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারি ! ভগবান স্বামী পরমানন্দের কাছে এই প্রার্থনা করি যে, আমাদের প্রিয় পাঠকবৃন্দেরা এই প্রচেষ্টার মূল্য দেবেন !
এখন আমরা পুনরায় গুরু মহারাজের লিখিত কথায় আসি – দেখি তিনি আমাদের মতো অভাজনদের জন্য কি অমৃতবাণী লিখে রেখে গেছেন ! প্রকৃত বাউল কি এবং বাউলের উদ্দেশ্য কি – এই সম্বন্ধে গুরুমহারাজ কথা বলছিলেন, আমরা সেই প্রসঙ্গেই ফিরে যাই ! –
গুরুমহারাজ এরপরে ‘বাউল’ সম্বন্ধে বলেছেন – ” বাউলের সম্প্রদায়গত কোনো বিরোধ নাই। মতবাদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করেন না বাউল। এঁরা তত্ত্বমুখী বা জীবনমুখী। জীবন বিরোধী অনাত্ম বা অজ্ঞান-অবিদ্যাকে বাউলগণ আশ্রয় করেন না। নিত্য, শাশ্বত, আত্মতত্ত্বই বাউলের লক্ষ্য। সেই তত্ত্ব-ই (আত্মতত্ত্ব) নিত্য শাশ্বত ‘আত্মা’– জীবন তার প্রকাশ। বাউল ‘বাদ’ নিয়ে বিবাদ না করে পরমতত্ত্ব বোধের জন্য তৎপর বা উন্মুখ হ’ন। আর সেইজন্যেই অনিত্যের প্রতি তাঁর বৈরাগ্য এবং নিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ।”
গুরুমহারাজের ঐ কথাগুলি থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারছি যে, ‘বাউল মত’-ই আধুনিক পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে ! কারণ বাউলেরা কোনো ‘মতবাদ’ নিয়ে বিবাদ করেন না – ‘বাদ’ নিয়ে কোনোই বিবাদ নাই তাঁদের। ফলে শতশত অশান্তির হাত থেকে এমনিতেই তো মানুষ রক্ষা পেতে পারে ! তাছাড়া সেই সাথে চলে বাউলদের আত্মতত্ত্ব লাভের সাধনা ! সুতরাং, যে কোনো মানুষ বাউলভাব অবলম্বন করে চরম শান্তিতে বাঁচতেই পারে এবং মানব জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্যের পথে এগিয়ে যেতে পারে। আমার তো মনে হয় বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন ‘মতবাদ’ অর্থাৎ ধর্মীয় মতবাদ, রাজনৈতিক মতবাদ, অর্থনৈতিক মতবাদ, সামাজিক মতবাদ – ইত্যাদিগুলিই তো যত সমস্যার মূল !! তাই ‘বাদ’ থেকে বাইরে বের হতে পারাটাই তো আমাদের চরম মুক্তি !
এই প্রসঙ্গে গুরুমহারাজ আরো বলেছেন – ” যেখানে সকল ‘বাদ’-ই সমাপ্ত, সেখানেই ‘তত্ত্বে’-র বোধ। সমস্ত মতবাদের যেখানে পরিসমাপ্তি, সেখানেই প্রকৃত সহজ ধর্মের বোধ ! মানব যেদিন ‘বাদ’-মুক্ত হবে, সেইদিনই তার আত্মবোধ হবে। তাই ‘বাদে’-র কবলে না পড়ে পরম আত্মবোধের জন্য তৎপর বা অগ্রসর হতে হবে। এটাই প্রকৃত জীবনমুখী ধর্ম !”
প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! দেখেছেন __কেন বাউল মত-কে সহজ মত বা সহজ পথ বলা হয় ! কি সহজ কথায় গুরুমহারাজ বলে দিলেন যে, ‘বাদ’-মুক্ত হোতে পারলেই ‘বোধে’-র জগতে প্রবেশ করা যায়। উনি আরও বললেন – ” মানব যেদিন ‘বাদ’-মুক্ত হবে, সেইদিনই তার আত্মবোধ হবে।”
গুরুমহারাজ আগেই বলেছিলেন যে, বাউলগণ তত্ত্বমুখী বা জীবনমুখী। আর প্রকৃত জীবনমুখী ধর্ম-ই হোলো সম্পূর্ণরূপে ‘বাদ’-মুক্ত হ‌ওয়া ! তাই আমাদেরকে ‘বাদ’-মুক্ত হয়ে আত্মবোধের জন্য তৎপর হোতে হবে, আত্মিক উত্তরণের পথে অগ্রসর হোতে হবে–আর সেটাই হবে গুরু মহারাজের প্রতি আমাদের ঠিক ঠিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রর্দশন।