শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা ছিলাম তাঁর লেখা দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা-র কথায় ! গুরুমহারাজের লেখা বইগুলি প্রায় সকল পরমানন্দ ভক্তদের ঘরের বই-এর তাকে (rack) রয়েছে। অনেকেই বইগুলি দুই-একবার বা দু-চার বার পড়েছেনও, কিন্তু ঠিক যেন তেমনভাবে আত্মস্থ করতে পারেন নি। আবার আমরা এটাও দেখেছি যে, হঠাৎ করে যখন কোনো একদিন সেই বইগুলি টেনে পড়তে শুরু করা হয়, তখন মনে হয় – এই বইয়ের কথাগুলি যেন নতুন ঠেকছে, আগে পড়েছিলাম ঠিকই কিন্তু এগুলো যেন নতুন লাগছে,যেন ভালো করে বোঝা হয় নি ! অনেকের হয়তো বইয়ের তাক (rack/self) থেকে আর টেনে নিয়ে পড়াটা হয়েই ওঠে না ! সেইজন্যেই আমাদের এই প্রচেষ্টা অর্থাৎ পরমানন্দ প্রণীত গ্রন্থ সমূহের line-by-line আর একবার ‘পাঠ’! ভগবান পরমানন্দ এই যুগের যুগপুরুষ ! তাঁকে অতিক্রম করা বা তাঁকে এড়িয়ে গিয়ে অন্য কোনো সংকীর্ণ মতবাদকে আঁকড়ে পড়ে থাকাটা আহাম্মকি ছাড়া আর কিছুই নয় ! কারণ যুগবিবর্তনে, মানুষ সহ জীবজগৎ জড়জগৎ সবকিছুই এগিয়ে এগিয়ে চলেছে, সবকিছুই বিবর্তিত-পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। সুতরাং মানুষের জীবনের চরম ও পরমলক্ষ্য যে আত্মবোধ, প্রেমবোধ বা ঈশ্বরলাভ – তার জন্য প্রয়োজনীয় সাধন-পদ্ধতিও যে বিবর্তিত হবে, আরো সহজ-সরল-যুগোপযোগী হবে_ এতে কোনো সন্দেহ নাই। আর সেইগুলি শেখাতেই তো যুগপুরুষের আগমন হয়। যাইহোক, আমরা আবার ফিরে যাই স্বামী পরমানন্দ বিরচিত দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা-র কথায়। আগের দিন আমরা দেখেছিলাম বাউলরাজ, মহাবাউল স্বামী পরমানন্দ মানবকে, মানবের জীবনকে_ চরম মর্যাদা দিয়েছেন এবং উপনিষদের ঋষিদের ঋত বা উপলব্ধ সত্যের বাণী শুনিয়ে মানুষকে উদ্দেশ্য করে (প্রিয় আত্মন্) বলেছেন – ” তুমিই সেই আত্মতত্ত্ব, তুমিই অমৃততত্ত্ব, তুমিই অমৃতের পুত্র, তত্ত্বমসি।” আবার তিনি বৈষ্ণব মহাজন চন্ডীদাসের কথার পুনরুক্তি করে বলেছেন – ” সবার উপরে মানুষ সত্য।” এইবার আমরা দেখবো তিনি আরো কি কি বলেছেন ! এরপরে গুরুমহারাজ বাউলের মর্মকথা গ্রন্থে জিজ্ঞাসা ও উত্তরের মাধ্যমে বাউলতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, কামতত্ত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন গুহ্যরহস্যের আলোচনা করেছেন। আমরা জিজ্ঞাসাগুলি কথার মাধ্যমে পরিবেশন করে ওনার উত্তরগুলিকে inverted comma-র মাধ্যমে উল্লেখ করবো। তাহলে শুরু করা যাক পরবর্তী আলোচনা।৷
এরপরে গুরুমহারাজ ‘বাউল’ শব্দের তাৎপর্য এবং ঐ কথার প্রকৃত রহস্য সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। উনি বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্ ! ‘বাউল’ শব্দটি ‘বাতুল’ শব্দের অপভ্রংশ। ‘বাতুল’ শব্দ ক্রমশঃ রূপান্তরিত হয়ে ‘বাউল’ শব্দে পরিণতি প্রাপ্ত হয়েছে। ‘বাউল’ শব্দের প্রকৃত মর্মার্থ হোলো – ‘বাহ্যজ্ঞান রহিত উন্মাদ’ ! অর্থাৎ তিনি বাহ্য ইন্দ্রিয়ের চেতনাশূন্য, বিষয়বুদ্ধিরহিত ভগবৎ-প্রেমে পাগল। আর এই ভাবমুখী প্রেমোন্মাদ মানুষকেই ‘বাউল’ বলা হয়।” গুরুমহারাজের এই কথাগুলি থেকে আমরা এইটা বুঝতে পারলাম যে, যিনি প্রকৃত ‘বাউল’, তিনি বাহ্যইন্দ্রিয়ের চেতনাশূন্য, তাঁর বিষয়বুদ্ধি থাকে না এবং তিনি ভগবৎ-প্রেমে পাগল !
‘বাউল’ কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত কিনা এবং বাউলগণ কিভাবে নিজেদের পরিচয় প্রদান করেন –এরপর গুরুমহারাজ সেই সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। উনি বললেন – ” প্রিয় আত্মন্ ! বাউলগণ নিজেদের ‘সহজিয়া বৈষ্ণব’ নামে পরিচয় দিয়ে থাকেন, বাউলগণ কোনো সাম্প্রদায়িক মতবাদ স্বীকার করেন না। সহজিয়া বাউলগণ নিজেদেরকে অসাম্প্রদায়িক ‘সহজ পথের পথিক’ নামে আখ্যাত করেন এবং তাঁদের সাধনাকে রসসাধনা ও নিজেদেরকে ‘রসিক’ নামেও পরিচয় প্রদান করে থাকেন।” কি চমৎকার ব্যাপার ! জগতের মানুষ যেখানে নিজেকে কোনো না কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত বলতে ভালোবাসে, নিজেদের সম্প্রদায়ই যে শ্রেষ্ঠ – তা প্রমাণ করার জন্য ঝগড়া-মারামারি-কাটাকাটি-রক্তপাত কোনো কিছুই করতে কসুর করে না – সেখানে বাউলগণ নিজেদেরকে বলেন ‘অসাম্প্রদায়িক’ ! এইটা ভাবতেই কেমন যেন ভালো লাগছে ! চিন্তার জগতে এতোটা উন্নত এঁরা !! কতোটা সংস্কারমুক্ত হোলে তবে এই কথা ভাবতে পারা যায় – বলুন তো ? এমন ভাবনা যখনই সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ভাবতে পারবে এবং বলতে পারবে – তখন তো সামাজিক সমস্যার নব্বই (৯০%) শতাংশ দূর হয়ে যাবে। মানুষে মানুষে অকারণ হানাহানি-কাটাকাটি বন্ধ হয়ে যাবে – তাই নয় কি ?
এইজন্যেই তো এই যুগের যুগধর্ম হোতে চলেছে “বাউল মত”! বিবর্তন বা সংবর্তনে মানুষের চেতনা যত উন্নত হবে, ততই সে নিজেকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলতে পারবে, সমস্ত প্রকার সংস্কারমুক্ত হতে পারবে – নিজেকে শুধুই ‘মানুষ’ ভাবতে শুরু করবে ! তাছাড়া বাউলগণ নিজেদেরকে ‘সহজিয়া’ বলে পরিচয় দেয় এবং বলেন তাঁরা ‘সহজ পথের পথিক’ ! এই কথাগুলি শুনতেই কতো ভালো লাগছে বলুন তো ! কোন্ মানুষ আর নিজে জটিল বা কুটিল হোতে চায় বলুন তো, সকলে তো ‘সহজ-সরল’-ই হোতে চায় – তাই না ? একমাত্র বাউলগণ-ই নিজেদেরকে ‘সহজিয়া’ বা ‘সহজ পথের পথিক’ বলে পরিচয় দিতে পারেন। তার মানে তাঁদের যে সাধনা সেইটি ‘সহজ সাধনা’, আর তাঁরা এই ‘সহজ সাধনা’-ই করে থাকেন। সেইজন্যই তো তাঁরা “সহজ সাধন পথের পথিক” !
