শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা গুরুমহারাজের লেখা দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা গ্রন্থে উল্লেখিত ‘বাউল’ সম্বন্ধীয় আলোচনায় ছিলাম ৷ আমরা ধীরে ধীরে গুরুমহারাজের পরবর্তী আলোচনায় প্রবেশ করবো এবং দেখবো ‘বাউল’ সম্বন্ধে এবং ‘বাউল সাধনা’ সম্বন্ধে উনি আরো কি কি বলেছেন ! উনি এরপরে ‘সহজিয়া বাউল’দের উৎপত্তি সম্পর্কে কিছু কথা বলেছেন, আমরা এখানে সেই কথাগুলি শুনে নিই !
গুরুমহারাজ ‘সহজিয়া বাউল’-দের উৎপত্তি নিয়ে বলেছেন – ” সহজিয়া বাউলদের উৎপত্তি বিষয়ে নানাজনের নানারকম মতবাদ প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন বৌদ্ধ বজ্রযান, সহজযান এবং হিন্দুতন্ত্রের সংমিশ্রণ ধারা হোতে এঁদের উৎপত্তি। কিন্তু বৌদ্ধ বজ্রযান, সহজযান এবং তন্ত্রের ধারা সংমিশ্রিত হয়ে কিভাবে তা সহজ সিদ্ধান্তরূপে আবির্ভূত হোলো তা ঐতিহাসিক আলোচনা এবং পর্যবেক্ষণ-সাপেক্ষ বিষয়। সুতরাং এখানে সেই বিষয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন বা নিরর্থক। তবুও এটা নিশ্চিত যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবকালের পূর্বেও ‘সহজিয়া সিদ্ধান্ত’ বাংলাদেশের প্রচলিত ছিল এবং তা যথেষ্ট প্রমাণসিদ্ধ। যেমন – উল্লেখযোগ্যরূপে জয়দেব, বিল্বমঙ্গল, বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস প্রভৃতি সহজিয়া বৈষ্ণবগণ বিদ্যমান ছিলেন। তাহলেও একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায় – শ্রীমন্মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পরবর্তীকাল হোতে এই মতবাদের যথেষ্ট পুষ্টি তথা বিকাশ সম্ভব হয়েছিল, এমনকি এই মতবাদের যথেষ্ট পুষ্টি তথা বিকাশও সম্ভব হয়েছিল।৷”
প্রিয় পাঠক ! এখানে গুরুমহারাজের আলোচনা থেকে আমরা এটাই জানতে পারলাম যে, ‘বাউলমত’ বা ‘সহজিয়া’-দের উৎপত্তি প্রসঙ্গে গবেষকরা মনে করে থাকেন যে, বৌদ্ধ বজ্রযান ও সহজযান এবং ভারতীয় তন্ত্রমতের সংমিশ্রণে এই মতের উৎপত্তি হয়েছিল। তবে এখানে গুরুমহারাজ প্রশ্ন তুলেছেন যে, হয়তো গবেষকদের ঐ মতামত ঠিক, কিন্তু এই তিন মতের সংমিশ্রণ থেকে ‘সহজ সিদ্ধান্ত’ কিভাবে এলো – তা কিন্তু এখনও জানা যায় নি, তা এখনও পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ। গুরুমহারাজ এই আলোচনাটি না বাড়িয়ে, এবার অন্য একটা দিকে আমাদের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিয়েছেন এবং তা হোলো যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগেও সহজিয়া বৈষ্ণবগণ অর্থাৎ ‘সহজিয়া’ মত ভারতবর্ষে (বিশেষতঃ এই বাংলায়) প্রচলিত ছিল। প্রমাণ হিসেবে উনি চৈতন্যপূর্ববর্তী কয়েকজন সহজিয়া সাধকদের নাম উল্লেখ করেছেন, যাঁরা বৈষ্ণব মহাজন (পদকর্তা অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ লীলারস-কাহিনী রচয়িতা) নামে পরিচিত, যেমন – জয়দেব, বিল্বমঙ্গল, বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস প্রমুখ।এঁনারা সকলেই ভগবান শ্রী শ্রী চৈতন্যদেবের শরীর ধারণের পূর্বেই জন্মেছিলেন এবং সহজ-সাধনার অনুসারী ছিলেন। চন্ডীদাসকে বলা হয় যে, উনি নাকি মৃত্যুর পূর্বে শ্রীচৈতন্যের আগমনবার্তা জানতে পেরেছিলেন। তাই উনি ওনার একটি পদে লিখেছিলেন – “যে করে কানুর আশ_ ধরে তার পায়, সোনার পুতলী যেন_ ধুলাতে লুটায়।”
সে যাই হোক, গুরুমহারাজ বললেন – ‘সহজিয়া বৈষ্ণবদের ধারা চৈতন্য পূর্ববর্তী হোলেও – এই সাধনা চৈতন্য পরবর্তী সময়ে ব্যাপকতা লাভ করেছিল এবং এই সাধনা পূর্ণ বিকাশপ্রাপ্ত হয়েছিল।’
এরপরে গুরুমহারাজ সহজিয়া বাউলদের উৎপত্তি বিষয়ে বলেছেন – ” সহজিয়া বাউলদের ভিতর এইরূপ ধারণা প্রচলিত আছে যে, – শ্রীমন্মহাপ্রভু-পার্ষদ স্বরূপ দামোদর গোস্বামী হোলেন এই মতের আদি গুরু। তাঁর নিকট হোতে শ্রীরূপ গোস্বামী রসতত্ত্ব এবং সহজ সাধনার রহস্য অবগত হয়েছিলেন। তাঁর পর যথাক্রমে শ্রী রঘুনাথ গোস্বামী, শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ এবং সিদ্ধ মুকুন্দদেব গোস্বামী এই রসতত্ত্ব ও সহজ সাধনার রহস্য জ্ঞাত হয়েছিলেন। এই মুকুন্দদেব গোস্বামী রাজপুত্র ছিলেন। তিনি বৈরাগ্য অবলম্বন করে কৃষ্ণদাস গোস্বামীর আশ্রয় পেয়েছিলেন। এইরূপ কথা বাউলদের ভিতর প্রচলিত আছে যে, শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী তাঁকে দিয়েই শ্রী শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ লিখিয়েছিলেন৷ আবার এইরূপ কিংবদন্তিও আছে যে, শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলে যেতেন আর শ্রী মুকুন্দদেব গোস্বামী তা লিখতেন।
শ্রী মুকুন্দদেব গোস্বামীর শিষ্য হোলেন শ্রী মুকুন্দরামদাস গোস্বামী। ইনি বেশ কিছু সহজ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার প্রায় সমস্তই লুপ্ত হয়ে গেছে, মাত্র কিছু কিছু সহজ গ্রন্থ অতি গোপনভাবে সহজিয়া বাউলদের ভিতর রক্ষিত আছে।”
প্রিয় পাঠক – আমরা তো সহজিয়া বাউল (বৈষ্ণব)-দের উৎপত্তি বিষয়ক একটা মত থেকে পরম্পরার ‘ক্রম’-টি পেয়ে গেলাম। আর সেই ক্রমটি হোলো – মহাপ্রভু -> স্বরূপ দামোদর -> শ্রীরূপ গোস্বামী -> রঘুনাথ গোস্বামী -> শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ মহাশয় (চৈতন্যচরিতামৃতকার) -> সিদ্ধ মুকুন্দদেব গোস্বামী-> মুকুন্দরাম দাস গোস্বামী। আমরা দেখলাম যে, এঁদের মধ্যে সিদ্ধ মুকুন্দদেব সম্বন্ধে গুরুমহারাজ আরও দু-চার কথা বলেছেন – আর তার মানেটা হোলো এই যে, ইতিহাস যাই বলুক না কেন – এই সিদ্ধ মুকুন্দদেব কিছুটা হোলেও ঈশ্বরের অধিক প্রিয় ছিলেন এবং অবশ্যই তিনি সহজ সাধনার পরম্পরা রক্ষার বিষয়ে অধিক কিছু কাজ করেছিলেন।
গুরুমহারাজ এই পরম্পরা বিষয়ে এবং বাউল সাধনা বিষয়ে আরো অনেক কথাই বলেছেন – সেগুলি আমরা পরে পরে আলোচনা করবো।৷