গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা গুরুমহারাজের সহস্ত লিখিত দ্বিতীয় গ্রন্থ বাউলের মর্মকথা-র কথায় ছিলাম। গুরুমহারাজ বাউলতত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে – বাউল মতে মানুষকে যে তিন প্রকারে (সহজ মানুষ, অযোনিজ মানুষ ও যোনিজ মানুষ) ভাগ করা হয়েছে – সেই আলোচনা করছিলেন। আমরা দেখবো – গুরুমহারাজ এর পরে আরো কি কি বলেছেন।
বাউলতত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে উনি বলেছেন – ” বাউলমতে ‘শব’ বা ‘মৃতদেহ’ হোতে না পারলে প্রেমের বাতাস লাগে না, আর প্রেমের বাতাস না লাগলে ‘সহজ মানুষ’ আবির্ভূত হ’ন না। সেইজন্য এই সহজ মানুষকে বিধাতার সৃষ্টিতে পাওয়া যাবে না। ‘সহজ ভজনে’-ই কেবলমাত্র এটা ‘বোধে বোধ’ হয়। ঐ সহজপুরে অর্থাৎ অপ্রাকৃত বৃন্দাবনে শ্রীরাধা-কৃষ্ণের সহজ প্রেমলীলার যে ধারা নিত্য প্রবাহিত হোচ্ছে, প্রাকৃত জগতের নরনারীর ভিতরও সেই ধারা আংশিকরূপে নিরন্তর সঞ্চারিত হোচ্ছে। সেহেতু প্রাকৃতিক নর-নারী, অপ্রাকৃত শ্রীকৃষ্ণ-রাধার প্রতীক।”
প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! এইবার গুরুমহারাজ আমাদেরকে একটু একটু করে বাউলতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করাচ্ছেন। ঐ যে উনি বলেছেন ‘ শব বা মৃতদেহ না হোতে পারলে প্রেমের বাতাস লাগে না, আর প্রেমের বাতাস না লাগলে সহজ মানুষ আবির্ভূত হ’ন না।’– এইসব কথা আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের অর্থাৎ তথাকথিত শিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিতদের বোধ-বুদ্ধির উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে ! তবে মনে হয় – এই ‘শব’ বা ‘মৃতদেহ’ হবার ব্যাপারটা গুরুমহারাজ পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন – তখন না হয় আমরা ভালোভাবে এই সম্বন্ধে বুঝে নেবার চেষ্টা করবো। তবে যেটুকু বুঝলাম তা হোলো এই যে, যেহেতু মানুষের অন্তঃকরণে প্রেম না জাগলে তার ভিতরে ‘সহজ মানুষে’র আবির্ভাব হয় না – তাই ‘সহজ মানুষ’ বিধাতার সৃষ্টিতে নাই – ‘সহজ ভজন’ যাঁরা করে চলেছেন তাঁদের বোধের জগতে আবির্ভূত হ’ন এই ‘সহজ মানুষ’ (বা অন্তরের অন্তরাত্মা বা পরমেশ্বর), কিন্তু নিত্যবৃন্দাবন বা অপ্রাকৃত বৃন্দাবনে স্থিত নিত্য শ্রীকৃষ্ণ বা নিত্য শ্রীরাধার সাথে সাধারণ প্রাকৃত মানুষের সম্পর্কটা কি ? – এই ব্যাপারেই বাউলতত্ত্ব কি বলে তা বোঝাতে গিয়ে গুরুমহারাজ বলেছেন – ” নিত্যবৃন্দাবনের নিত্য কৃষ্ণ-রাধার লীলার ধারা প্রাকৃত নর-নারীর মধ্যেও পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে প্রবাহিত হয়ে থাকে – তাই সাধারণ নরনারী যেন সেই নিত্যকৃষ্ণ-রাধার প্রতীক। সহজ ভজনের দ্বারা সাধারণ প্রাকৃত নর-নারীও সেই অপ্রাকৃত লীলারসের আস্বাদন করতে পারে।
এতোদূর পর্যন্ত আমরা যা হোক করে একটু আধটু বোঝার চেষ্টা করলাম এবং এটাও বুঝলাম যে বাউলমতে কেন ‘মানুষ’-কে এতটা প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। প্রাকৃত নর-নারীকে প্রতীকী করে অপ্রাকৃত কৃষ্ণ-রাধা লীলামাধুর্য্য লাভের জন্য সহজ ভজন করে যাওয়া – এটাই বাউল মত ! যাইহোক, আমরা দেখবো গুরুমহারাজ এর পরে আরো কি কি বলেছেন। উনি বলেছেন, ” বাউলগণ বলেন – প্রকৃত নর শ্রীকৃষ্ণের প্রতীক এবং প্রকৃত নারী শ্রীরাধার প্রতীক। তাঁদের মতে শ্রীরাধাকৃষ্ণই প্রাকৃত নর-নারীরূপে বিহার করছেন – কোথাও আংশিকভাবে আবার কোথাও পূর্ণভাবে। অতএব প্রাকৃত নর-নারীর প্রেম অপ্রাকৃত শ্রীরাধা-কৃষ্ণের সহজ প্রেমেরই প্রতিচ্ছবি।
অপ্রাকৃত শ্রীরাধাকৃষ্ণের সহজ লীলা অনাবিলভাবে নিরন্তর চলেছে – এটাই সৃষ্টির মূল তত্ত্ব। আর ঐ রাধাকৃষ্ণের যুগল-স্বরূপই হোলো বাউলদের চরম ও পরম তত্ত্ব এবং এর ‘বোধে বোধে’র (বোধে বোধ করার) পথ হোলো একান্ত ঘনীভূত প্রেম।”
প্রিয় পাঠক – গুরুমহারাজের করা বাউলতত্ত্বের এই অংশে উনি বাউলদের মানুষ-ভজনের রহস্যের কথা বলেছেন। বাউলগণের মতে – প্রাকৃতের মধ্যেই অপ্রাকৃতের প্রতিচ্ছবি রয়েছে, তাই তাঁরা প্রাকৃত বা সাধারণ নর-নারীর মধ্যেই অপ্রাকৃত শ্রীকৃষ্ণ-রাধার প্রকাশ দেখেন – তাই তো তাঁরা অনায়াসে বলতে পারেন – ” সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই !” তবে বাউলগণ এটাও জানেন যে, প্রাকৃত নর-নারীর মধ্যে অপ্রাকৃত শ্রীকৃষ্ণ-রাধার প্রকাশ থাকলেও – তা কোথাও আংশিক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে (সে দু-একটি ক্ষেত্রে) তা পূর্ণভাবে প্রকাশিত।
বাউলগণ এটাও মানেন (জানেন) যে, ‘অপ্রাকৃত শ্রীকৃষ্ণ-রাধার যে লীলা (সহজলীলা) অনাবিলভাবে এবং নিরন্তর হয়ে চলেছে, আর এটা সৃষ্টির মূল তত্ত্ব।’– এই কথাগুলিও আমাদের মাথার উপর দিয়েই চলে যাবার মতো ! আশা করবো এর পরের অংশে গুরুমহারাজ সৃষ্টির এই মূলতত্ত্ব নিয়ে আরো একটু বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
যাইহোক, উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা আরো জানতে পারলাম যে, ‘রাধাকৃষ্ণের যুগল স্বরূপই হোলো বাউলদের চরম ও পরম তত্ত্ব।’ তার মানে হোচ্ছে প্রকৃত নরনারীর প্রেমকে আশ্রয় করে এবং সহজ সাধনার মধ্যে দিয়ে বাউলগণ অপ্রাকৃত শ্রীকৃষ্ণ-রাধার যুগল রহস্যের বোধ করতে সমর্থ হ’ন। আর যুগল-তত্ত্ব অর্থে পুরুষ ও প্রকৃতি, বাহ্যতঃ দুই কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ‘দুই-এই এক’– এই বোধে উপনীত হওয়াই চরম লক্ষ্য। আর এই বোধপ্রাপ্তির একমাত্র পথ হোলো একান্ত ঘনীভূত প্রেম।৷