শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা গুরুমহারাজের লেখা বাউলের মর্মকথা গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ থেকে লাইন তুলে তুলে সৃষ্টিতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, কামতত্ত্ব ইত্যাদির আলোচনায় ছিলাম। এখন আমরা দেখবো – গুরুমহারাজ এই সম্বন্ধে আরও কি কি বলেছেন।
এরপরে উনি বলেছেন – ” বাউলমতে প্রকৃতির এই যে বিশ্বসৃষ্টি তা একমাত্র রমণের জন্য ! উপনিষদের মধ্যেও আমরা দেখেছি – সমগ্র সৃষ্টির মূল হোলো ‘ব্রহ্মে’-র রমণ ! সমস্ত রসের মধ্যে শৃঙ্গার রসই শ্রেষ্ঠ এবং প্রকৃতি হোলো শৃঙ্গার রসের আধার ! শৃঙ্গার রসমাধুর্য্যের মধ্যে প্রকৃতির মূল সত্তাটি নিহিত রয়েছে। এটাই একাধারে আনন্দবিলাস বা রস-রতিবিলাস। তাই প্রকৃতি একাধারে জননী এবং রমণী।”
প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! উপরোক্ত কথাগুলির প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। আর এই কর্ম অসম্ভব বলেই তো সমগ্র জীবজগৎ ঐ কথাগুলিকে স্থূলভাবে নিয়েছে এবং দৈহিকভাবে নারী-পুরুষের মিলনকেই প্রকৃত ‘রমণ’ ভেবে নিয়ে উল্লাস করছে, এটাকেই জীবনের ধ্রুবতারা ভেবে বসে রয়েছে ! যার বিকৃত রূপ আমরা সমাজে দেখি – ‘যৌনবিকৃতি’ অর্থাৎ ‘ধর্ষণ’ বা ‘গণধর্ষণ’ ইত্যাদি, যা আধুনিক সমাজে আজ একটা বিভীষিকার সৃষ্টি করেছে।
আমরা গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম – প্রকৃতিতে অর্থাৎ পশু-পাখি বা আরও নিম্নতর প্রাণীসমাজে সাধারণভাবে যৌনবিকৃতি নাই, যদি কখনও ঘটে সেটার সংখ্যা খুবই নগণ্য। কিন্তু মনুষ্যসমাজেই যৌন বিকৃতির ঘটনা অধিক, আর সেটা হয় মনোবিকৃতির কারণে ! খুব ছোট বয়স থেকে যদি শিশুরা পিতা-মাতার ভালবাসা, স্নেহ, মমতা পায় এবং সঠিক শিক্ষা পায় – তাহলে কখনোই তারা বড় হয়ে ধর্ষক হবে না – এটা নিশ্চিত ! কিন্তু বাস্তবে হয় ঠিক উল্টোটা ! অশিক্ষা এবং কুশিক্ষা মনুষ্যসমাজকে সদা-সর্বদা কলুষিত করে চলেছে। অশিক্ষিত পরিবারগুলিতে পিতা-মাতার একপাল ছেলেমেয়ে ! পৃথক-পৃথকভাবে প্রত্যেককে শিশুবয়স থেকে ঠিক সেভাবে স্নেহ-মমতা-ভালবাসা দেওয়া সম্ভব হয় না, সুশিক্ষা দিয়ে বড় করে তোলা হয় না পিতামাতাদের। তাছাড়া বহু অনাথ বালক-বালিকারাও সমাজে অবাঞ্ছিত, অবহেলিত অবস্থায় বড় হয়ে ওঠে – এরাও ছোট থেকেই মনোবিকৃতির শিকার হয়, ফলে বড় হয়ে সমাজে যত রকমের দুষ্কর্ম রয়েছে সেগুলি করে থাকে এরা। সুতরাং সমাজের এই বিভীষিকাময় দিকটি থেকে মুক্ত হোতে গেলে সমাজের প্রতিটি শিশু যাতে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা পায় তা নিশ্চিত করতেই হবে, পরিবারে সন্তান উৎপাদন কমাতে হবে, অনাথ শিশুদেরকে এমন কোনো অনাথ আশ্রমে বড় করতে হবে যেখানে তারা স্নেহময় পিতা বা মমতাময়ী জননীর ন্যায় অভিভাবক পাবে (যেটা সরকারি হোমে কখনোই সম্ভব নয় – একমাত্র সন্ন্যাসীদের দ্বারা পরিচালিত অনাথ আশ্রমেই এটা সম্ভব)। আর সর্বোপরি ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি শিশুকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, তার বিবেকের জাগরণ এবং আত্মিক উত্তরণের শিক্ষা দিতে হবে। ছোট থেকেই ধ্যান-প্রাণায়াম-যোগাসনের শিক্ষা দিতে হবে, সত্য-ত্যাগ-প্রেম-শান্তি বা সংযমের শিক্ষা দিতে হবে। কোনরকম ভেদবুদ্ধি, সম্প্রদায়বুদ্ধি, প্ররোচনামূলক শিক্ষা থেকে শিশুদেরকে দূরে রাখতে হবে – এমনটা করতে পারলেই সমাজে একটা সুশৃঙ্খল ভাব আসবে, আর ঐ ধরনের ব্যভিচার বা বীভৎস নারকীয় ঘটনাসমূহ ঘটবে না। এইগুলি সবই গুরুমহারাজের কথা। কোনো মানব সমাজ কিভাবে সুন্দর হয়ে উঠবে -সেইসব আলোচনা প্রসঙ্গে উনি এসব কথা বলেছিলেন।
যাইহোক, ঐ যে গুরুমহারাজ বললেন – ‘ শৃঙ্গার রস-মাধুর্য্যের মধ্যে প্রকৃতির মূল সত্তাটি নিহিত রয়েছে – এটাই আনন্দবিলাস বা রস-রতি বিলাস। তাই প্রকৃতি একাধারে জননী এবং রমণী।’ এই কথাগুলির খুবই সুগভীর তাৎপর্য রয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে নারী রমনী–নারী কামিনী কিন্তু মহাত্মা-মহাপুরুষদের কাছে নারী হোলো জননী। এই প্রসঙ্গে একটা কথা খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হোচ্ছে, সেইটা বলে নেওয়া যাক্। এই দু’দিন হোলো বনগ্রাম আশ্রমে গিয়েছিলাম (11/10/2022), ওখানে কথা হচ্ছিলো শ্রীধরপুরের আশীষ মাস্টারমশাই (আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, রিটায়ার্ড হাইস্কুল শিক্ষক, বর্তমানে মেমারীতে থাকেন)-এর সাথে। কথায় কথায় উনি সাতগেছিয়ার (পূর্ব বর্ধমান) কাছে বেগুনিয়া গ্রামে গুরুমহারাজ যখন গিয়েছিলেন (হয়তো ১৯৯৪/৯৫ সাল হবে) তখনকার সিটিং-এর প্রসঙ্গ তুললেন। ওই গ্রামে কোনো একসময় একজন ভগবৎ-ভক্ত সাধুকে গ্রামবাসী বিনা দোষে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। সেই অভিশাপে দীর্ঘসময় ধরে এই গ্রামে কোনো সাধু-সন্ত পা রাখেনি।
গুরুমহারাজ শরীর ধারণ করেছিলেন জগতের পাপ-তাপ হরণ করার জন্য, জগৎকে কলুষমুক্ত করার জন্য। সুতরাং ওনাকে তো ঐ গ্রামে যেতেই হবে, গ্রামের মানুষগুলোর কল্যাণ যে ওনাকেই করতে হবে, গ্রামটিকে অভিশাপ মুক্ত করার দায়িত্ব যে ওনারই ! তাই গুরুমহারাজ বেগুনিয়া গ্রামে একবার সিটিং করেছিলেন। বহুলোকের (৭০০/৮০০) সমাগম হয়েছিল সেই সভায়। বহু মানুষ বহু জিজ্ঞাসার অবতারণা করেছিল এবং গুরুমহারাজ প্রত্যেকের যথোপযুক্ত উত্তর দিয়েছিলেন। ওই সিটিং-এর পর আমরা আশ্রমে শুনেছিলাম যে, ‘বেগুনিয়া গ্রামে গুরুমহারাজের যে সিটিং হয়েছে – অমনটা যেন আর হয় না !’ শ্রীধরপুরের আশীষ মাস্টারমশাই ঐ সিটিং-এ উপস্থিত ছিলেন, তাই উনি ঐ সিটিং-এর দুই-একটি টুকরো টুকরো কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে একটা হোলো – এই সিটিং-এ থাকা একজন ঝকঝকে চেহারার এবং কেতাদূরস্ত পোশাকপরা একটি ইউনিভার্সিটিতে পড়া যুবক (ছেলেটি নিজের পরিচয় দিয়েই জিজ্ঞাসা শুরু করেছিল) সভার মাঝে উঠে দাঁড়িয়ে গুরুমহারাজকে বলে উঠলেন – ” আচ্ছা স্বামীজী ! আমি দেখছি আপনার সাথে আমার তো বিশেষ কোনো তফাৎ নেই, শুধুমাত্র আপনি গেরুয়া পোশাক পড়ে রয়েছেন আর আমি প্যান্ট-শার্ট পড়ে রয়েছি ! আর কোনো তফাৎ রয়েছে কি ?” গুরুমহারাজ এক লাইনে উত্তর দিয়েছিলেন – ” তোমার সাথে আমার তফাৎ হোলো – তুমি কোনো নারীকে দেখে ভাবো কামিনী, আর আমি ভাবি জননী ।৷”
