গুরু মহারাজ স্থূলশরীর ছেড়ে চিন্ময়লোকে গমন করেন ১৯৯৯ সালের ২৭শে নভেম্বর (ন’কাকা শরীর ছাড়লেন ২০১৮ সালের ২২শে অক্টোবর, ১৮_বছর পর। ১৮-সংখ্যাটি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থবহ। ) । তারপর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে – সবার চোখে জল, মুখে কথা নাই, কর্মে স্পৃহা নাই – আশ্রমিকরা সকলেরই পিতৃহীন অভিভাবকহীন অবস্থা । সেই অবস্থায় পরমানন্দ হাইস্কুলে প্রথম মিটিং ডাকলেন তৃষাণ মহারাজ (স্বামী পরমেশ্বরানন্দ) । আমি তখন পরমানন্দ হাইস্কুলের শিক্ষক । তাই আমিও সেখানে উপস্থিত। প্রথমেই উনি একটা গল্প বলে আলোচনাটা শুরু করেছিলেন । গল্পটা বলছি –
বেনারসে গঙ্গার ঘাটে ভোরবেলার আলো-আধাঁরিতে এক ভদ্রলোক উঁচু জায়গায় বসে বসে গঙ্গাস্ত্রোত্র আওড়াচ্ছিলেন – হঠাৎ তার নজরে এল এক ভদ্রলোক গঙ্গার ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে জলের কাছে গিয়েই – পায়ে করে করে স্রোতে ভেসে এসে ঘাটে জমে থাকা কাশী বিশ্বনাথের পূজার ফুল বেলপাতা সরাচ্ছে ! গঙ্গা স্ত্রোত্র পড়া (উঁচুতে থাকা) লোকটি তাড়াতাড়ি দৌড়ে নিচে নেমে এসে স্নান করতে আসা লোকটিকে ধমকে বলল – ” এ্যাই ! এটা কি কোরছো ? জানোনা – এগুলো কাশী বিশ্বনাথের পূজার ফুল বেলপাতা ? এগুলো তুমি পায়ে করে করে সরাচ্ছো ?” স্নানরত লোকটি বলল – ” হ্যাঁ সরাচ্ছি — তাতে কি হয়েছে ?” উপরের লোকটি বলল – ” আবার জিজ্ঞাসা করছ – কি হয়েছে ? পাপে মরবে যে! দেখবে ঐ পায়ে তোমার কুরুকুষ্টি (কুষ্ঠ) হবে !” তখন স্নানরত লোকটি জল থেকে উঠে এসে উপরের লোকটির দিকে ওর পা-টা তুলে দেখালো ৷ দেখা গেল লোকটির পায়ে কুষ্ঠরোগ হয়েই আছে । পা দেখানোর পর লোকটি বলল – ” দেখলে তো ! আমার পায়ে কুরুকুষ্টি হয়েই আছে – আর নতুন করে কি হবে বল ?”
এই গল্প বলে তৃষাণ মহারাজ সকলকে সম্বোধন করে বলেছিলেন – ” দ্যাখ্ , আমাদের যা ক্ষতি হবার তা হয়েই গেছে ! এর থেকে বেশী ক্ষতি আর কিছু হবার নাই ৷ তবু আমাদেরকে শক্ত হতে হবে । তাঁর আরব্ধ কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।”
আজ আবার সেই একই কথা বলার দিন ৷ ন’কাকার অনুরাগী ভক্তদের আবার উঠে দাঁড়াতে হবে – ন’কাকা তাঁর জীবন দিয়ে যে শিক্ষা দিয়ে গেলেন — তার অনুসরণ ও অনুশীলন করতেই হবে ৷ মহাপুরুষদের কৃপা বর্ষিত হয়েই চলেছে – শুধু ধরে নিতে পারলেই হোল ! তাই ধরতেই হবে ! ন’কাকাই বলেছিলেন – ” বাবা ! ধ্যান-জপ আর কতক্ষণ মানুষ করতে পারে ! তাঁর আলোচনা, তাঁর স্মরণ-মননেই ভালো কাজ হয় — এতেই সাধারণ মানুষের অগ্রগতি হয় ।”
তাই আসুন ! আমরা সকলে বলি “জয় গুরুজী জয় ন’কাকা”! – আর তাঁদের-ই স্মরণ-মনন করি, তাঁদের দেখানো পথ ধরে সামনের দিকে ‘চরৈবেতি’-র চিকন রেখাটি ধরে এগিয়ে চলি !
আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই কার্ত্তিক মাসের কালীপূজা শুরু হবে ৷ আমার মতো বহু ভক্তবৃন্দ অপেক্ষা করে থাকতাম “কালীপূজায় বনগ্রাম যাবো”। কেন যাবো — বা কেন যেতেই হবে ? – তখন এর উত্তর অতটা জানতাম না । এখন ন’কাকার মহাপ্রয়াণের পর বেশ বুঝতে পারছি – এই তীব্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ন’কাকা !! গুরু মহারাজ শরীরে থাকাকালীন বহুবার কালীপূজায় আশ্রমে থেকেছি। বনগ্রামে ন’কাকাদের কালীপুজোর সময় ওখানে থেকেছি_কত ঘটনার সাক্ষী থেকেছি, কিন্তু সেসব কথায় পরে আসছি। আগে বনগ্রামের পাশাপাশি গ্রামগুলির কালীপুজোর গল্প বলি।
কুচুটের কাছে ‘মেলনা’ গ্রামে খুব ধুমধাম করে কালীপুজো হয়। প্রচুর পাঁঠাবলি হয় _তাই আত্মীয় স্বজনে গ্রামটি একেবারে থিকথিক করে।বনগ্রাম আশ্রম থেকেও অনেকে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যায়।
আশ্রমের নব মহারাজের (করুনানন্দ) বাবা একজন কালীসাধক ছিলেন। জাবুইডাঙা তে ওনার আশ্রমেও বেশ জাঁকজমক করে পুজো হয় _আশ্রমের বহু ব্রহ্মচারী ওখানেও উপস্থিত থাকে।
মাঝেরগ্রামের কালীপুজোরও খুব নামডাক! একবার গুরু মহারাজের Permission নিয়ে কালীপূজার রাত্রে মধ্যমগ্রাম বা মাঝের গ্রামে তৃষাণ মহারাজের বাবা ৺পঞ্চানন বন্দোপাধ্যায়ের কালীপূজাও দেখে এসেছিলাম । উনি গ্রামের ঐ জাগ্রত কালীর পূজা করতেন – সারা রাত পূজা হোত । ঐ বৃদ্ধবয়সে, দূর্বল শরীরে গভীর নিষ্ঠা সহকারে উনি পূজা করতেন ! আর ন্যাস করতে করতে পূজার মন্ত্রে যে যে অঙ্গেঁ বা চক্রের স্থানে মনোনিবেশ করে ফুল ঠেকাতে হয় – পঞ্চানন ব্যানার্জীর মন্ত্রের ক্রিয়ায় সেই সেই অঙ্গে কুলকুণ্ডলিনী ক্রিয়াশীল হয়ে উঠতো ! এটা হাজার হাজার লোকের সামনে ঘটত – ফলে বহু মানুষ এটা প্রত্যক্ষ করেছেন। গুরুমহারাজ নিজে একদিন সিটিং-এ এই ব্যাপারটি আলোচনা করার পর-ই আমি মাঝেরগ্রামে ওনার পূজা করা দেখতে গিয়েছিলাম।
অবশ্য তার বেশ কয়েক বছর আগে গুরুমহারাজের permission নিয়ে আমি আর শ্রীরামপুরের অসীমদা মাঝেরগ্রামে তৃষাণ মহারাজদের বাড়ির কালীমন্দির দেখতে গিয়েছিলাম। কারন ওখানেই গুরুমহারাজের নির্বিকল্প সমাধি হয়েছিল। ওখানে পৌঁছে দেখলাম যে মাটির ছোট্ট মতো একটা ঘর, খড়ের চাল। মন্দিরে ঢোকার দরজাও খুব নিচু_ঘরটা প্রায় অন্ধকার। মন্দিরটা ওনাদের বাড়ির উঠোনেই অবস্থিত।মন্দিরের দরজার শেকল খুলে ভিতরে ঢুকে দেখলাম পূজার আসন পাতাই রয়েছে, চারপাশে পূজার সামগ্রী ছড়ানো। চারিদিকে ইঁদুরের মাটি তোলা (যেহেতু মেঝেও মাটির ছিল )। ভিতরে ঢুকে দুজন মানুষের দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়াই মুস্কিল (পূজার আসন এবং অন্যান্য উপাচারের ছোঁয়া বাঁচিয়ে)! কিন্তু যেই ঘরের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালাম _অমনি মেঝের মাটি যেন টেনে আমাকে নিচের দিকে নামিয়ে দিতে লাগল (সত্যি সত্যিই এই আশ্চর্য অনুভূতি সেদিন হয়েছিল ওই ঘরে!) হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে মাথা ঠেকালাম মাটিতে! এখন অবশ্য আর মাটি নাই, এখন ওখানে মন্দির হয়ে গেছে _তবু আজও ওখানে শুদ্ধসত্ব ভক্তদের মধ্যে স্থানমাহাত্মের মহিমা ক্রিয়াশীল হবে বই কি!
ওই স্থান কি যে সে স্থান!! ওখানে স্বামী পরমানন্দের নির্বিকল্প সমাধি হয়েছিল! প্রায় ২১-দিন (বোধহয় বনগ্রামের ৩-দিন ধরে) গুরুমহারাজ ঐ ঘরে ধ্যানমগ্ন হয়ে ছিলেন! ওনার শরীরের পিছনের দিকটা ইঁদুরে কেটে দিয়েছিল! নাক মুখ দিয়ে পিঁপড়ে ঢুকে শরীরের মধ্যে বাসা বেঁধেছিল।
গুরুমহারাজের নিজের মুখে বলা এই প্রসঙ্গে অনেক কথা শুনেছিলাম। পরে ন’কাকার কাছে আরও বিস্তারিত শুনেছিলাম। নির্বিকল্প ভঙ্গ হবার পর কিভাবে গুরুমহারাজের শরীরে হুঁশ ফেরাতে হবে__তার উপকরনের কথা গুরুমহারাজ আগেই বলে রেখেছিলেন। ন’কাকা সেইসব জিনিস (অর্থাৎ বহুবছরের পুরোনো ঘি, ইত্যাদি আরো অনেক জিনিস) কিছু কিছু যোগাড় করে রেখেছিলেন। তৃষাণ মহারাজ, পুতুল মা ঐগুলি মালিশ করে করে ধীরে ধীরে গুরুমহারাজের শরীরে হুঁশ আসতে সাহায্য করেছিলেন। (ক্রমশঃ) ।
জয় গূরূজী ।জয় ন’কাকা ।