শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (লিখিত এবং কথিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো ৷ আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের স্বহস্ত লিখিত দ্বিতীয় গ্রন্থ *বাউলের মর্মকথা*-র অষ্টম পরিচ্ছেদের কথায় ৷ এই অংশে উনি বাউল সাধনার এমনই সব গুঢ়াতিগুঢ় রহস্যের কথা বলেছেন এবং তার প্রয়োজনে এমন সব term ব্যবহার করেছেন যে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সেইসমস্ত কথার মর্মার্থ অনুধাবন করা খুবই দুরূহ হয়ে যাচ্ছে ৷

এই প্রসঙ্গে একটি জিজ্ঞাসার উত্তরে গুরুমহারাজ বলেছিলেন *বাউলের মর্মকথা*-র ন্যায় আধ্যাত্মিক গ্রন্থগুলি সাধারণ গল্প-উপন্যাস জাতীয় কথা-কাহিনী নয়, ঐগুলি সমাজের সাধারণ মানুষজনেদের দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ঘটনা-অঘটন নিয়ে সাজানো ৷ ফলে, ঐ সমস্ত গ্রন্থের বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষ একবার পড়লেই বুঝে যায় – কারণ তার জীবনেও ওইরকম অভিজ্ঞতাসমূহ রয়েছে। কিন্তু ‘বাউলের মর্মকথা’-র ন্যায় আধ্যাত্মিক গ্রন্থের বিষয়বস্তু সাধনজগতের উচ্চ উচ্চ অবস্থার কথা – যেখানে সাধনবিহীন সাধারণ মানুষ এখনো পৌঁছাতেই পারেনি। তাই তারা এই গ্রন্থগুলি একবার বা দুইবার পড়ে এর মর্মোদ্ধার করতে পারে না এবং বিষয়বস্তু সমূহ বুঝতেও পারে না ! এরজন্য তাদেরকে এইসব গ্রন্থ বারবার পড়তে হবে। মনোযোগ সহকারে বারবার পড়তে পড়তে এর মর্মার্থ ধীরে ধীরে ধারণায় আসে ৷ এইজন্যেই বলা হয়েছে গীতা, ভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থগুলি রোজ নিয়মিত পাঠ করতে হয়। আর তা করতে করতে দেখা যায় যে, ওই সমস্ত গ্রন্থের বিষয়বস্তুর প্রকৃত মর্মার্থ ধীরে ধীরে সত্যি সত্যিই ঐ মানুষটির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

বহু মানুষকে আমরা বলতে শুনেছি – “আজ ১০ বছর ধরে নিয়মিত গীতা পাঠ করছি, এতদিনে ভগবদ গীতার রহস্য একটু একটু বুঝতে পারছি ৷ আর প্রথম প্রথম যখন গীতার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতাম – তখন যেন কিরকম জোলো মনে হোতো – কোনো interest পেতাম না । পড়তে হয় – তাই পড়তাম! এখন বুঝতে পারি ‘ভগবদ গীতা’-কে কেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ বলা হয় !”

এইভাবেই গুরুমহারাজের লেখা গ্রন্থগুলি, যেগুলি এই যুগের গীতা__ সেইসব গ্রন্থ অর্থাৎ *সহজতা ও প্রেম*, *বাউলের মর্মকথা*, *বাউলকথা* ১ম খন্ড ও ২য় খন্ড ইত্যাদি গ্রন্থগুলি একবার-দুবার নয়, আমাদেরকে বারবার পড়তে হবে – তাহলেই ধীরে ধীরে আমরা এই গ্রন্থে লিখিত বিষয়সমূহের ধারণা করতে পারবো। আর এই কারণেই আমাদের এই প্রয়াস – যাতে করে ওইসব মহান গ্রন্থের একটু একটু অংশ আমরা বারবার পাঠ করে কিছুটা হোলেও মর্মোদ্ধার করতে পারি এবং সেই করুণাময় ভগবান যুগপুরুষ স্বামী পরমানন্দের শিক্ষায় নিজেদের জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি ৷৷

যাইহোক, এখন আমরা দেখবো গুরুমহারাজ *বাউলের মর্মকথা* গ্রন্থের অষ্টম পরিচ্ছেদে বাউল সাধনার বিভিন্ন অবস্থা এবং বাউল সাধন-তত্ত্ব সম্বন্ধে আরো কি কি বলেছেন ৷ এরপরে উনি রাধাভাব বা মহাভাব সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন – ” প্রাকৃত বুদ্ধিবিশিষ্ট মানব এইসব ধারণা করতে পারে না – কারণ এটা অপ্রাকৃত ৷
এখন বুঝলে তো — তটস্থ জীব যখন মায়ার রাজ্যে অবস্থান করে তখন সেই মায়ার প্রভাবহেতু সে নিজে আনন্দস্বরূপ হয়েও ভ্রান্তিবশতঃ বিক্ষিপ্ত হয়ে আনন্দের অনুসন্ধান করতে থাকে এবং ইতস্ততঃ ভ্রমণ করতে থাকে জন্ম-মৃত্যুর ভিতর দিয়ে দেহ হোতে দেহান্তরে ৷ ওই জীবের যখন গুরুকৃপায় বিবেক জাগ্রত হয়, তখন বহিরঙ্গা মায়ার রাজ্য হোতে অর্থাৎ বর্হিমুখীভাব হোতে অন্তর্মুখী হয় অর্থাৎ অন্তরঙ্গা চিৎশক্তির রাজ্যে প্রবেশ করে ৷ এটাই হোলো জীবের আত্যন্তিক দুঃখ-মুক্তি বা মোক্ষ ৷
বহিরঙ্গা মায়ার ছায়া যখন তার স্বরূপ হোতে অপসৃত হয়, তখন সে আবার স্বরূপানন্দ ফিরে পায়। আত্যন্তিক দুঃখ চিরতরে দূরীভূত হয় এবং তখন সে আপন স্বরূপানন্দে মগ্ন থাকে ৷ এই অবস্থাই মুক্তি বা মোক্ষ ৷”
প্রিয় পাঠক – গুরুমহারাজ যে কথাটা বারবার আমাদেরকে মনে পাড়িয়ে দিচ্ছেন যে, প্রাকৃতবুদ্ধি বা দেহবুদ্ধি অর্থাৎ ইন্দ্রিয়বুদ্ধি নিয়ে অপ্রাকৃত তত্ত্বের ধারণা করতে পারা দুরূহ – তবু আমরা চেষ্টা তো করতে পারি ! এই চেষ্টাটাই সাধনা, আর সাধনাতেই সিদ্ধিলাভ সম্ভব হয় ! সুতরাং আমাদের চেষ্টা থাকলেই সফলতা আসবে – এটা নিশ্চিত ! গুরুমহারাজ যা বললেন তাতে আমরা এটাই বুঝলাম যে, আমরা তটস্থ জীব, আর এই অবস্থায় আমরা নিজেরা আনন্দস্বরূপ হয়েও (যেহেতু আমরা সচ্চিদানন্দ পরমেশ্বরেরই অবরোহ ক্রমে বিস্তারের মধ্যে রয়েছি) বহিরঙ্গা মায়াশক্তির প্রভাবে বিভ্রান্ত হই এবং নিজের বাইরে ইতস্ততঃ ঘুরে ‘আনন্দ’ খুঁজতে চাই – কিন্তু তা তো পাওয়া সম্ভব নয়, তাই আমাদের মতো সাধারণ মানবকে জন্ম থেকে জন্মান্তর ধরে বৃথাই দেহধারণ করে ছায়াবাজি করতে হয়। এটাই ভ্রান্তি, এটাই আহাম্মকি, এটাই অজ্ঞানতা !

এইখানেই সদ্গুরুর ভূমিকা ! সদ্গুরু কৃপা করে তটস্থ জীবের এই ভ্রান্তি দূর করার মন্ত্র দেন, নিরন্তর উত্তরণের শিক্ষা দেন যাতে মানব বহির্মুখী ভাব ত্যাগ করে অন্তর্মুখী হোতে পারে অর্থাৎ অন্তরঙ্গা চিৎশক্তির রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে ৷ এই অবস্থায় মানব ত্রিতাপ জ্বালা মুক্ত হয়, তার আর কোনো দুঃখকষ্ট থাকে না – সে তখন আপন স্বরূপের আনন্দে মগ্ন থাকে ৷ এই যে অবস্থা – এই অবস্থাকেই গুরুমহারাজ বলেছেন জীবের প্রকৃত মুক্তি বা মোক্ষ অর্থাৎ জীবত্বের মুক্তি !!