শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা (কথিত ও লিখিত) এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আমরা ছিলাম গুরুমহারাজের স্বহস্ত লিখিত দ্বিতীয় গ্রন্থ *বাউলের মর্মকথা*-র কথায় ৷ গত সংখ্যায় আমরা উক্ত গ্রন্থের অষ্টম পরিচ্ছেদের আলোচনা শেষ করেছিলাম ৷ এইবার আমরা প্রবেশ করবো এই গ্রন্থের নবম পরিচ্ছেদে ৷ সম্ভবতঃ এটাই *বাউলের মর্মকথা* গ্রন্থের শেষ পরিচ্ছেদ ৷ এই পরিচ্ছেদের শেষে উনি চরৈবেতি কার্যালয়ের সম্পাদক স্বামী স্বরূপানন্দকে(যেহেতু বইটি চরৈবেতি কার্যালয় থেকে ছাপা হয়েছিল) ব,ইটির শেষের দিকে কয়েকটি কবিতাও সংযোজন করতে বলেছিলেন – যার প্রথম কবিতাটিই ছিল *বাউল* এবং দ্বিতীয় কবিতাটি ছিল *বাউলিনী*! সম্ভব হোলে আমরা ওই দুটো কবিতাও এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো ৷ যাইহোক, এখন আমরা চলে যাই উক্ত গ্রন্থের নবম পরিচ্ছেদের কথায় !
এই পরিচ্ছেদের শুরুতেই গুরুমহারাজ নিজেই জিজ্ঞাসা তুলেছেন এবং বাউলগণের (বাউল দর্শনের কথিত) *প্রেম* সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন ৷ অন্যান্য পরিচ্ছেদের মতোই গুরুমহারাজ নিজেই তার উত্তরও দিয়েছেন ৷ উনি বলেছেন – ” প্রিয় আত্মন্‌ ! বাউলদের *প্রেম* সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করছি, তুমি (আমরা সকলে) এই বিষয়ে মনোসংযোগ করো ৷
মন হোলো ইন্দ্রিয় পরিষদের রাজা ৷ সেইহেতু বাসনা বা প্রবৃত্তি দ্বারা মন বশীভূত হোলে তখন আর ইন্দ্রিয়গণ স্ববশে থাকে না ৷ সুতরাং মনকে বাসনার শিকার হোতে দেওয়া সাধকের কখনোই উচিত নয় ৷ মন বাসনামুক্ত হোলে চিত্তে প্রেমের অঙ্কুর বা উন্মেষ হয় ৷ বাসনাবিষ্ট মনের বিকারই কাম ৷
নির্বিকার অন্তরের প্রথম প্রতিক্রিয়া হোলো *ভাব* I আর ভাব প্রগল্‌ভ হয়ে ভাষায় রূপ পরিগ্রহ করে ৷ সেইজন্য ভাবে-ভরা ভাষাই ভালোবাসা ৷”
প্রিয় পাঠকবৃন্দ ! শুনলেন তো গুরুমহারাজের কথাগুলো ! পরম প্রেমিক, মহাপুরুষ, মহাজন ছাড়া এমন কথা আর কে-ই বা বলতে পারে ! এই অংশে উনি বাউল দর্শনে কথিত *প্রেম* বিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে যা বলেছেন, তার সারমর্ম হোলো এই যে, যেহেতু *মন* সমস্ত ইন্দ্রিয়গণের রাজা – তাই মন যদি কামনা, বাসনা ইত্যাদি প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে যায়, তখন ইন্দ্রিয়গণ আর মানবের বশে থাকে না বা থাকতে পারেও না ৷ তাই সাধকেরা চেষ্টা করেন নির্বাসনা হোতে ৷ এই মন যদি একবার বাসনামুক্ত হয়ে যায় – তখনই চিত্তে *প্রেমে*-র উন্মেষ ঘটে ৷ সুতরাং বাসনাবিষ্ট মনের বিকার হোলো *কাম* এবং বাসনামুক্ত হোলেই চিত্তাকাশে উন্মেষিত হয় *প্রেম*৷৷
এছাড়া গুরুমহারাজ সুললিত কবিতায় ছন্দের ন্যায় এককথায় ভাব–ভাষা ও ভালবাসাকে বেঁধেছেন। উনি বলেছেন – ” নির্বিকার অন্তরের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো *ভাব*, আর *ভাব* প্রগল্‌ভ হয়ে *ভাষা*-য় রূপ নেয় এবং সেইজন্য *ভাবে*-ভরা *ভাষা*-ই হোলো *ভালোবাসা* I” আহা-হা ! কি সুন্দর কবিতার ছন্দের ন্যায় কথা। কি অপূর্ব অদ্ভুত অশ্রুতপূর্ব কথা ! দেখুন – এখানে গুরুমহারাজ বলেছেন – ” নির্বিকার অন্তরের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো *ভাব*!” তাহলে আমরা grammaritically যেগুলি *ভাব* বলে ভেবে বসে আছি – সেগুলি কিন্তু *ভাব* নয় ! প্রকৃত *ভাব* আনতে হোলে অন্তরকে নির্বিকার হোতে হবে। তারপর *ভাব* এলেই যে প্রকৃতঅর্থে *ভাষা* আসবে তাও নয়, *ভাব* প্রগল্‌ভ হোলে – সেই অবস্থায় *ভাষা* রূপ নেবে ৷ এই ধরনের *ভাবে*-পূর্ণ . *ভাষা* -ই *ভালোবাসা* বা *প্রেম*!
প্রিয় পাঠক ! এমন কথা কখনো শুনেছেন ? এ যে যুগপুরুষ স্বামী পরমানন্দের কথা ! তাই এতো মিষ্টি – এতো মধুর – এতো প্রাণকারা ভাবে-ভরা ভাষা !
দেখা যাক্ – এরপরে গুরুমহারাজ আরো কি কি বলেছেন ! এরপরে উনি বলেছেন – ” বাউল বা বাতুল হোলেন প্রেমের উন্মাদ ৷ তাঁর ভগবৎ প্রেম ব্যক্ত হয় ভগবৎ কথায় – ভগবৎ গানে – ভগবৎ নামে ও ভগবৎ চর্চায় ! এইজন্য তিনি ভাষামুখর বাতুল বা বাউল ৷
বাউলের হৃদয় যেন পদ্মের অন্তরখানি – মধু বা অমৃত যেখানে বিদ্যমান ৷ কিন্তু সে মধু যোগাড় করতে হয় মাধুকরী বৃত্তিতেই ৷ “বাউলের মৃত্যুঞ্জয় প্রেম, ত্যাগের পাত্রে নিকশিত হেম ৷”
সুতরাং বাউল মতে কোনো আলাদা ধর্ম নাই ৷ মানুষই বাউলদের ধর্ম ৷ সোনার মানুষই তাঁদের জাত ৷ এই মানুষকেই জানতে হবে – মানুষকেই ভালবাসতে হবে ৷ সকল মানুষই তাঁদের আত্মার আত্মা – আত্মীয়, হৃদয়ের হৃদয়—প্রাণের —কেহ পর নয়— সকলেই আপনজন।”
প্রিয় পাঠক ! গুরুমহারাজ এখন বাউলের প্রকৃত সংজ্ঞা দিচ্ছেন, বাউলের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ! আমরা এখন সেইসব কথাগুলিকে বোঝার চেষ্টা করি ৷ গুরুমহারাজের কথা অনুযায়ী – ‘ ভগবৎ প্রেমে উন্মাদ ব্যক্তিই *বাউল* I” এই ‘ভগবৎ প্রেম’ বাউলগণ ভগবৎ কথায় –ভগবৎ গানে – ভগবৎ নামে ও চর্চায় ব্যক্ত করে থাকেন ৷ তিনি সদা-সর্বদাই ভাষামুখর থাকেন – তাই তো তিনি বাতুল বা বাউল ৷৷
গুরুমহারাজ বলেছেন, ‘ বাউলের হৃদয় ঠিক যেন পদ্মের অন্তর – যেখানে মধু বা অমৃত (প্রেম) থাকে এবং সেটি জোগাড় হয় মাধুকরী বৃত্তির দ্বারা – একটু একটু করে সঞ্চয়ের দ্বারা ৷ এই মাধুকরী বৃত্তি করতে গিয়ে বাউলগণকে বহু মানুষের সঙ্গ করতে হয়। তাঁরা সকল মানুষকেই আপনজন মনে করেন – আর শুধু আপনজনই নয় – যেন তারা আত্মার আত্মীয়, হৃদয়ের হৃদয়, প্রাণের প্রাণ ৷ বাউলদের আলাদা কোনো ধর্ম নাই – মানুষই তাদের ধর্ম, সোনার মানুষই তাদের জাত, সোনার মানুষকে জানাই বাউল জীবনের উদ্দেশ্য ৷৷