সেদিন গুরুমহারাজকে নিয়ে কথা হোচ্ছিলো নানু মহারাজ (স্বামী নির্বেদানন্দ)-এর সাথে ৷ উনি দীর্ঘদিন বনগ্রাম আশ্রমে ছেলেদের (বনগ্রাম অনাথ বালক ভবন) দায়িত্বে ছিলেন, বর্তমানে উনি পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার সন্নিকট বারেন্দা পরমানন্দ মিশনের শাখায় রয়েছেন ৷ এখানেও উনি প্রায় 40 টি অনাথ বালককে রেখে তাদের ‘মানুষ’ করে তোলার চেষ্টায় ব্রতী রয়েছেন। এই কাজে ওনাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করে চলেছেন ব্রহ্মচারিণী কানন-মাতা (বর্তমানে উনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন এবং ওনার নাম প্রব্যাজিকা শিবময়ীপ্রাণা) এবং দেবু মহারাজ (স্বামী নির্মলানন্দ) ৷
আমার গৃহের খুবই কাছাকাছি হওয়ায় এই আশ্রমের সাথে আমার প্রায় নিত্য যোগাযোগ। আর নানু মহারাজের সাথে দেখা হোলেই অন্যান্য কথার ফাঁকে স্বাভাবিকভাবেই গুরুমহারাজের সান্নিধ্যে থাকা সেই মধুর দিনগুলির কথা ফিরে ফিরেই আসে।
তখনকার দিনগুলিতে থাকার কষ্ট ছিল, খাবারের কষ্ট ছিল, (শুধু দুবেলা এক তরকারি ডাল-ভাত, বলা হোতো rice to rice) ! মনে-প্রানে সদাই ভয় ছিল — সে ভয় গুরুমহারাজকে, সে ভয় শ্রদ্ধা মিশ্রিত মহাভয় !! ‘কি জানি – বোধহয় আমার সেবাকর্মে কোনো ত্রুটি হোচ্ছে’ – এই ভয় ! ‘হয়তো গুরুমহারাজ আমার কোনো কাজে, কোনো কথায়, কোনো আচরণে অসন্তুষ্ট হোতে পারেন’- এই ভয় ! ‘হয়তো আমার Lifestyle-এ কোনো বেচাল হোচ্ছে’ – এই ভয় ! তবু কি যে ভালো লাগতো !!!
ভগবানের সাথে (সালোক্য) বাস করছি – সেই পরম আনন্দ, সেই অপার্থিব শান্তি, সেই একান্ত নিশ্চিন্ততা-নির্ভরতার কি কোনো বিকল্প হোতে পারে ? কখনোই হয় না !
তাইতো দুজন গুরুভাই একত্র হোলেই আমরা আলোচনা করি সেই সুমধুর দিনগুলির কথা ! আর সেইসব আলোচনা প্রসঙ্গেই উঠে আসে টুকরো টুকরো গুরুমহারাজের বাণী – যা জীবন পথের পাথেয় ৷ এমন কিছু কথা _যা বর্তমানের কর্মযোগী (যেহেতু নানু মহারাজের কাছে শোনা এবং উনি যেহেতু সেবাকর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন)-দের ক্ষেত্রে সাধন সহায়ক হয়ে উঠতে পারে ৷ একবার (1986-87) গুরুমহারাজ সকালের দিকে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে বনগ্রাম আশ্রমের মাঠ পেড়িয়ে সোজা চলে এলেন ছেলেদের building-এর কাছে ৷ নানু মহারাজ তখন ছেলেদেরকে নিয়ে তিনতলা বিল্ডিংটার সামনের মাঠে P.T. করাচ্ছিলেন ৷ তখন শুধুমাত্র অনাথ বালক ভবনের বসবাস এবং লেখাপড়ার জন্য ওই তিনতলা বিল্ডিংটুকুই ছিল, বাকি আর কিছু তখনও তৈরি হয় নি ৷ ওইটারই নিচের দিকের মাঠে নানু মহারাজ ছেলেদের নিয়ে P.T. করাচ্ছিলেন ৷
গুরুমহারাজ সরাসরি ছেলেদের কাছে এসে পৌঁছাতেই স্বাভাবিকভাবেই নানু মহারাজ একটু এগিয়ে গিয়ে গুরুমহারাজকে প্রণাম করেছিলেন । তারপর ওনার পাশে দাঁড়াতেই গুরুমহারাজ ওনাকে জিজ্ঞাসা করলেন – ” কি রে ! ছেলেদেরকে দিয়ে এগুলো কি সব করাচ্ছিস ?” নানু মহারাজ বলেছিলেন – ” P.T. করাচ্ছি !” এটা শুনেই গুরুমহারাজ বলেছিলেন – ” বাচ্চাদের P.T. করাবি না ! ওটা ইউরোপীয়দের আমদানি ! আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এবং ভারতীয় শরীরের জন্য ওটা এমন কিছু উপযোগী নয়। তুই ছেলেদেরকে নিয়ে যোগাসন করাবি – সকাল বিকাল ওদেরকে বিশেষ করে ‘জীবনতত্ত্বে’-র আসনগুলি নিশ্চয়ই করাবি (‘জীবনতত্ত্ব’ – হোলো আটটি সহজ সহজ আসন, যেগুলি ৮ থেকে ৮০ সকল বয়সের মানুষই করতে পারে ৷ এই আসনগুলিকে একত্র করে গুরুমহারাজ “জীবনতত্ত্ব” নাম দিয়েছেন ৷ বনগ্রাম আশ্রম থেকে মুরারী মহারাজ বা স্বামী নিষ্কামানন্দ মহারাজের লেখা ‘জীবনতত্ত্ব’ পুস্তক পাওয়া যায়।)
এরপর গুরুমহারাজ নানু মহারাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – “তোরা সকালে এবং সন্ধ্যায় ছেলেদেরকে দিয়ে প্রার্থনা করানোর সময় কি কি স্তব-স্তোত্র এবং মন্ত্র ব্যবহার করিস ?” নানু মহারাজ বলেন যে ভোরের দিকে বৈদিক দ্বাদশ শান্তিপাঠ, সূর্য প্রণাম মন্ত্র, গায়ত্রী পাঠ ইত্যাদি করান ৷ তখন গুরুমহারাজ বলেন – “তোরা ‘গায়ত্রী’ কতবার করতে শেখাস?” নানু মহারাজ বলেছিলেন – “তিনবার !” এটা শুনে গুরুমহারাজ বলেছিলেন – প্রায় সকলেই ‘গায়ত্রী মন্ত্র’ বলে বটে, কিন্তু কথাটা ঠিকমতো বললে ওটা হবে সাবিত্রী মন্ত্র, যা গায়ত্রী ছন্দে গীত হয় ৷ যাইহোক, তোরা ছেলেদেরকে ‘গায়ত্রী’ তিনবার নয় – অন্তত ১২ বার করাবি, ৯ x ১২ = ১০৮__ব্যাপারটা বুঝলি কি ৷ ওঁঙ্কার বাদ দিলে সাবিত্রী মন্ত্রে নটি (৯) শব্দ রয়েছে(ভু-র্ভুবস্য-তৎসবিতুর বরেণ্যম ভর্গ দেবস্য ধিমহি ধিয়োয়নঃ প্রচোদয়াৎ)- আর বৈদিক মন্ত্রাদির প্রথমে ওঁ এবং শেষে ওঁ থাকা বাঞ্ছনীয় ৷৷
