যাইহোক, আমরা বিভিন্ন ভক্তের মুখ থেকে শোনা গুরুমহারাজের সঙ্গে তাদের একান্ত কথাবার্তার ক্রম চালিয়ে যাবো – তবে আজকে আমি স্বামী তপেশ্বরানন্দ মহারাজ বিরচিত (যেটি ভারত সেবাশ্রম সংঘের স্বামী প্রণবানন্দ বন্দনার সাথে অনেকটাই মিল) “পরমানন্দ বন্দনা” নিয়ে একটু আলোচনা করবো ৷ আসলে প্রতিদিন প্রাতঃকালে ও সন্ধ্যায় “পরমানন্দ বন্দনা” করার সময় মনে হয় – এটার সব কথাগুলির অর্থসহ ব্যাখ্যা করলে হয়তো আমাদের খানিকটা উপকার হোতে পারে ! অর্থ বুঝে প্রার্থনা করলে আমরা আরও ভালোভাবে, আরও আন্তরিকতার সাথে ওই বন্দনা-গীতি গাইতে পারবো ৷
গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দ কথায় কথায় প্রায়ই বলতেন – ” নাম-নামী অভেদজ্ঞানে ‘নাম’ করতে হয় !” আমরা প্রথম প্রথম এই কথার মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারতাম না ৷ কিন্তু পরে একদিন উনি নিজেই বুঝিয়ে দিলেন, বললেন – ” ব্যাপারটা কেমন জানিস্ – যেমন ধর্ তোকে কেউ রাস্তায় আমার নাম নিয়ে কিছু কথা বললো, তখন সাথে সাথেই তোর অন্ত:র্জগতে কি হোলো বলতো — স্বামী পরমানন্দ (অথবা গুরুজী বা গুরুমহারাজ) নামটা শোনার সাথে সাথেই আমার মুখমন্ডলসহ সমগ্র অবয়বটি তোর মানসপটে ভেসে উঠলো – তাই না ! এইজন্যেই বলা হয়েছে, শুধু ‘নাম করা’ নয় ‘নাম সুমিরণ (স্মরণ) করা’ !”
তাহলে ঐ যে “পরমানন্দ বন্দনা”-য় পরমানন্দ স্তুতিবাচক কিছু শব্দ রয়েছে, সেইগুলি উচ্চারণের সাথে সাথে যেমন স্বামী পরমানন্দকে আমাদের স্মরণ হয়, তেমনি তাঁর নানাবিধ গুণের কথা – তাঁর মহিমার কথা আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে– তাই নয় কি!!
সুতরাং যখনই বলা হোচ্ছে – ” ওঁ শুদ্ধং বুদ্ধং মুক্তং শ্রীপরমানন্দম্ “- তখনই আমাদের মানসপটে ভেসে উঠছে গুরুমহারাজের সেই সাক্ষাৎ শুদ্ধতার, পবিত্রতার প্রতিমূর্তি রূপটি ! আমরা এটাও বুঝতে পারি যে, তিনি মহাজ্ঞানস্বরূপ এবং তিনি নিত্যমুক্ত পুরুষ ! এইবার বলা হয়েছে- “ধৃত নরবিগ্রহ দেবম্” – সত্যিই তো ! তিনি দেব-বিগ্রহ স্বরূপই তো ! কৃপা করে বা করুণা ভরে তিনি স্থুলশরীর রূপ বিগ্রহ ধারন করেছেন মাত্র ! ঐ একনম্বর শ্লোকের শেষে বলা হয়েছে “বন্দে বিশ্বেশম্” অর্থাৎ ‘হে বিশ্বপিতা, হে বিশ্বেশ – আমি (আমরা) তোমাকে বন্দনা করি – তোমার বন্দন-গান গাই’ ৷
এরপরের শ্লোক শুরু করা হয়েছে এইভাবে – ” শান্তং-দান্তং-সুন্দরকান্তং করুণাঘন মূর্তিম্ – জয় করুণাঘন মূর্তিম্ !” সত্যিই গুরুমহারাজ ‘শান্ত’ এবং ‘দান্ত’ ছিলেন এবং অবশ্যই তাঁর অপার্থিব ‘সুন্দরকান্ত’ ছিল ।
সাধারণতঃ ভগবান বুদ্ধকে ‘শান্ততার প্রতিমূর্তি’ বলা হয়। ‘বুদ্ধ’ অর্থাৎ জ্ঞানী, যে কোনো ব্রহ্মজ্ঞানী ব্যক্তিই ব্রহ্মজ্ঞান লাভের পর ‘শান্ত-সমাহিত’ হয়ে যান! ঐ ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি নারী শরীর বিশিষ্টও হোতে পারেন বা পুরুষ শরীরধারী ! সুতরাং গুরুমহারাজের তো কথাই নাই _তিনি সদাসর্বদাই শান্ত থাকতেন! যে কোনো অবস্থাতেই তিনি ছিলেন যেন শান্ততার প্রতিমূর্তি!!
এবার আসি ‘দান্তং’ শব্দটির অর্থের কথায় ! আমাদের পরমানন্দ মিশনের ভক্তমন্ডলীর অনেকগুলি পন্ডিতব্যক্তির সাথে ঐ শব্দের প্রকৃত অর্থ কি হোতে পারে __এই নিয়ে কথা বলছিলাম। ওনাদের কেউ বললেন _মুখমন্ডলের সৌন্দর্য বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে, অনেকে (দ+অন্তং) = দান্তং এইরূপ ব্যাখ্যাও করলেন ৷ বললেন _সংস্কৃতে ‘দ’ শব্দটির অনেক অর্থ যেমন – দান করা, দমন করা, দয়া করা ইত্যাদি। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ‘দান্তং’ শব্দটি ঐগুলির সাথে সংপৃক্ত ! কিন্তু ঐ শব্দটির প্রকৃত অর্থ খুঁজে দিল আমাদের আশ্রমের ভক্ত কুর্চির সান্তনু! অমরকোষ খুঁজে ও ‘দান্তং’ শব্দের অর্থ বের করলো _ “যিনি তপঃক্লেশ অনায়াসে জয় করতে পারেন।” খুবই গভীর ভাবব্যঞ্জক ও অর্থবোধক শব্দ এটি -তাই না!!
আর ‘সুন্দরকান্তং’ – যেটা বলা হয়েছে সেটা তো একশো ভাগের বেশি সত্যি ! যে সমস্ত ব্যক্তিরা গুরুমহারাজকে সাক্ষাৎ করেছেন – তাঁরা সকলেই জানেন যে, গুরুমহারাজ কি অনন্য সুন্দরই না ছিলেন ! তার কান্তি প্রকৃতই অনিন্দ্যসুন্দর ছিল। গৌরাঙ্গমহাপ্রভুর রূপের কথা বলতে গিয়ে তৎকালীন মহাজনগণ এতো ভালো ভালো কথা বলে গিয়েছেন যে, বোধহয় আর তার থেকে বেশি ভালো কথা বাংলা শব্দভান্ডারে নাই। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাকাহিনী বর্ণনাকারী মহাজনগণও শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গকান্তির সৌন্দর্য্য নিয়ে কম কথা কিছু বলেন নি ! কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রং কালো ছিল, আর মহাপ্রভুর গৌরবর্ণ – তাই গৌড়বিষয়ক পদকর্তারা যেন আরো বেশি বেশি করে সৌন্দর্য্যের কথা তুলে ধরতে পেরেছিলেন ৷
তবে আমরা বলছিলাম আমাদের গুরুদেব স্বামী পরমানন্দের কথা ! তাঁর সৌন্দর্য্যের কথা, তাঁর সুন্দরতম অঙ্গকান্তির কথা ! কিন্তু মহাজনগণের ঐসব বর্ননার পর আর কি-ই বলা যায় ? শুধু এইটুকুই বলতে পারি যে, আজ পর্যন্ত যত মহাজন-মহাকবিগণ ভগবানের (শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, মহাপ্রভু প্রমুখরা) রূপ বর্ণনা করেছেন – ভগবান পরমানন্দর দেহসৌন্দর্য্য ছিল সেই সমস্ত বর্ণনারও অতীত ৷ কি সুন্দর যে তিনি দেখতে ছিলেন ! কি সুন্দর শ্বেতশুভ্র দাঁতের গঠন !! কি সুন্দর মধুর হাসি তাঁর !! মাথার চুল একদম কালো কুচকুচে !! চোখ দুটি করুণাভরা প্রেমদাতার চোখ !! আর সর্বোপরি শরীরের জ্যোতি — যা শরীরের সমগ্র অংশ থেকে নির্গত হোতো !! সত্যি সত্যিই – যে একবার ঐ নয়নে নয়ন দিয়েছিল – সেই তাঁর প্রেমে বশীভূত হয়ে গিয়েছিল !!
