আসলে ব্যাপারটা কি জানেন তো – আমরা এইরকমই ! ‘আমরা’ অর্থাৎ আমরা সাধারণ মানুষেরা ! তা সে আমরা শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শূদ্র-ভদ্র, সাধু-সন্ত-ব্রহ্মচারী বা গৃহস্থী যেই হই না কেন ! আত্মজ্ঞান-আত্মসাক্ষাৎকার না হওয়া পর্যন্ত, নির্বিকল্প সমাধি না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো মানুষ যেসব কথা বলে – তার বেশিরভাগটাই ‘বাকওয়াশ্’- সব আলতু-ফালতু কথা ! শুধু লেকচার দেওয়াই হয়, আর মানুষজন শুনে বলে – “বেড়ে বলেছেন মশাই !” আর এইটা বার বার শুনতে শুনতে ঐ বক্তাদের গর্বে বুকটা ভরে ওঠে, ঐ বক্তারা ভাবতে শুরু করে – “আমি-ই বা কম কি ! এই তো আমাকে কতো মানুষ মানে-গনে !!”
কিন্তু গুরুমহারাজ (বা যে কোনো অবতারপুরুষ) তো আর সাধারণ মানুষ ছিলেন না ! তিনি ছিলেন অসাধারণ-অনন্যসাধারণ ! তাঁর ছিল সবই জানা ! জগৎরহস্য, জীবনরহস্য, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু রহস্য রয়েছে – সে সবই ছিল তাঁর হস্তমলকবৎ ! সেইজন্যেই তিনি যখন যে কথাই বলতেন – তা সত্য ! তা সবকালে যুগোপযোগীভাবে তো সত্য বটেই, প্রকৃত অর্থে তা চিরন্তন সত্য ! অবতারপুরুষেরা যখন নরশরীরে লীলা করতে আসেন – তখন তাঁকে বলা হয় ‘ভগবান’ ! যেমন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভগবান শ্রীচৈতন্য, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, ঠিক তেমনি ভগবান শ্রীপরমানন্দ ৷৷
গুরুমহারাজ (ভগবান শ্রী শ্রী স্বামী পরমানন্দ) একবার আমাদেরকে বলেছিলেন – “পৃথিবী গ্রহের বাইরে থেকে যদি কেউ পৃথিবীর উপর মনসংযোগ করে – তাহলে দেখবে শুধু একটা কোলাহল উঠছে অর্থাৎ হো-হো-হো-হো – এইরকম আওয়াজ উঠছে ৷” এই আওয়াজের মধ্যেই প্রকৃতির শব্দ (বাতাস, অগ্নি, জল ইত্যাদির শব্দ) জীবজন্তুসহ পশুপাখির আওয়াজ এবং সমগ্র পৃথিবীর মানুষের গলার আওয়াজ – সবকিছু মিলেমিশে রয়েছে ৷ এবার মানুষের আওয়াজের মধ্যে আবার কোটি কোটি মানুষের সাধারণ কথাবার্তা যেমন রয়েছে, তেমনি তাদের চিৎকার-চেঁচামেচি-খিস্তি-খেউরও রয়েছে ! আবার রয়েছে ধর্মীয় আলোচনা, বক্তৃতা, সভা-সমিতির আওয়াজ ইত্যাদিও! কিন্তু এই সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে (নির্লিপ্তভাবে) শুনলে শুধুই ‘হো’ ‘হো’ ! তবে এইসবের মধ্যেও শ্রীভগবানের বাণী অথবা নির্বিকল্প সমাধি থেকে ফিরে আসা মহাপুরুষগণের বাণী চিরন্তন হিসাবে নিজেদের identity অক্ষুন্ন রাখে ৷
গুরুমহারাজ আরো একবার বলেছিলেন – ” অবতার পুরুষেরা বা উন্নত মহাত্মা-মহাপুরুষেরা ‘পরা’ (পরা, পশ্যন্তি, মধ্যমা, বৈখরী – এই চার রকমের স্তর থেকে ‘শব্দ’কে প্রকাশ করা যায়) স্থিতি থেকে কথা বলেন। এছাড়াও উনি বলেছিলেন – ” অনাদিকাল থেকে যত শব্দ সৃষ্টি হয়েছে সেই সমস্ত কিছুই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তরঙ্গের আকারে পরিমণ্ডলে রয়ে গেছে ৷ তার মধ্যে বেশিরভাগ শব্দরাশি মিলেমিশে গিয়ে থাকলেও__ এদের মধ্যে ‘পরা’-স্থিতি থেকে সৃষ্ট শব্দসমূহের identity অক্ষুন্ন রয়েছে ৷” আধুনিক বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন – ঐ অনন্ত শব্দরাশির মধ্যে মহাপুরুষদের কথার strong তরঙ্গগুলি ধরার ! যদি তারা এতে successful হ’ন – তাহলে ভগবান রামচন্দ্রের voice, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের voice, ভগবান বুদ্ধের voice বা যীশুর voice — ইত্যাদি গুলি মানুষের কাছে তুলে ধরা যাবে।
যাইহোক, আমরা কথায় কথায় আমাদের বর্তমানের মূল আলোচনা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি ৷ সুতরাং আমরা এখন আবার পুনরায় ফিরে যাই গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের ‘বন্দনা গানে’র কথায় ৷ যে বন্দনাগীতির প্রথম stanza-র কথায় আমরা ছিলাম ৷ আমরা এর আগে – “শান্তং – দান্তং- সুন্দরকান্তং – করুনাঘন মূর্তিম্” – পর্যন্ত আলোচনা করেছিলাম ৷ এইবার আমরা তার পরের লাইনে চলে যাচ্ছি৷ সেখানে রয়েছে – ” মঙ্গলমন্ডিত মঙ্গং – মঙ্গলমন্ডিত মঙ্গং বিশ্বম্ভররূপম ৷ ওঁ হর হর সদগুরো মহাদেবঃ ৷৷
গুরুমহারাজের শ্রীঅঙ্গ মঙ্গলমন্ডিত তো ছিলই ! গুরুমহারাজকে যারাই দেখেছে – তারা সকলেই এই কথার সাক্ষী দেবে। এখনো যারা গুরুমহারাজের ছবি মনোযোগ সহকারে দেখে থাকে (অর্থাৎ যারা স্থূলশরীরে গুরুমহারাজকে চোখে দেখেনি) – তাহলে তারা সেই মহান মানুষটির “মঙ্গলমন্ডিত” অঙ্গের কথা চোখ বুজে একটু ভাবলেই আজকেও দেখতে পায় !! এখানে একটা কথা আসতেই পারে যে, গুরুমহারাজের দেহকে ‘মঙ্গলমন্ডিত’ বলা হোচ্ছেই বা কেন ? এর কারণ হোলো – গুরুমহারাজ(ভগবানের নরতনু)-কে একবার দর্শন করলেই মানুষের মঙ্গল সাধন হয় ৷ তাঁর মুখের কথা শ্রবণ করলেও মঙ্গল হয়। কারণ_ ভগবানের শরীর ধারণ তো জীবের মঙ্গলের জন্যই ! তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলা, দীক্ষা দান, সৎসঙ্গ – এসবের দ্বারা শুধুমাত্র সবার মঙ্গলই হয়। তাঁর প্রতিটি কথাই ‘শ্রবণমঙ্গল’, আর তিনি স্থূলতঃ, সূক্ষ্মতঃ এবং কারণতঃ এই ত্রিবিধভাবেই ‘মঙ্গলমন্ডিত’ ৷ প্রকৃতপক্ষে যুগে যুগে ভগবানের শরীরধারণের ব্যাপারটা জীবজগতের মঙ্গলের জন্যই!!(ক্রমশঃ)
