আমরা ‘পরমানন্দ বন্দনা’র প্রথম stanza-র একেবারে শেষ অংশে ছিলাম ৷ সেখানে গুরুমহারাজকে ‘বিশ্বম্ভররূপম্’ বলা হয়েছে ৷ ‘বিশ্বম্ভর’ কথাটির অর্থ – যিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ব্যাপৃত হয়ে রয়েছেন_ আবার সমগ্র জগৎ যাঁর মধ্যে অবস্থিত, সমস্ত জগতের ভর যিনি ধারণ করে রয়েছেন। এবার গুরুমহারাজের সাথে এই কথাটির কি সম্পর্ক – তার একটা উদাহরণ দিই ৷ তখন কাটোয়ার কাছে বারেন্দা আশ্রমটি সবে গড়ে উঠেছে ৷ গুরুমহারাজ তখন প্রতি শীতেই অর্থাৎ নভেম্বরের শেষে অথবা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আজিমগঞ্জে স্পিরিচুয়াল কনসাস (পরমানন্দ মিশন) আশ্রমে যেতেন, অবশ্যই ওখান থেকে মেয়েদের আশ্রম ‘শতভিষা’-তেও পরিদর্শনে যেতেন ৷
যাইহোক, মূল কথায় আসি ৷ গুরুমহারাজ যখনই বনগ্রাম আশ্রম থেকে আজিমগঞ্জে যেতেন তখন কাটোয়া হয়েই যেতেন। প্রথম প্রথম যেতেন হাওড়া-আজিমগঞ্জ (ভায়া কাটোয়া) ট্রেনে, অথবা কাটোয়া লোকালে ধাত্রীগ্রাম স্টেশন থেকে কাটোয়ায় নেমে– কাটোয়া থেকে কাটোয়া-আজিমগঞ্জ ট্রেন ধরে আজিমগঞ্জে যেতেন। কতবার উনি কাটোয়াতে একা একা ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে বসে বা পায়চারি করে কাটিয়েছেন – তিনি ছাড়া কেই বা খবর রাখে ! ধাত্রীগ্রাম স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেও উনি কত সময় কাটিয়েছেন ! এখনকার ভক্তরা বা আরও পরবর্তীতে যেসব ভক্তরা এইসব কথা জানবেন – তারা আফসোস করবেন এই ভেবে যে, ‘ হায়-হায় – সেই সময় আমরা যদি থাকতাম ! তাহলে সেই দেবতনুবিশিষ্ট স্বয়ং ভগবানের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে পারতাম, সরাসরি তাঁর কিছু সেবায় লাগতে পারতাম !’ আরও অবাক করার মতো কথা এই যে, গুরুমহারাজ জাবুইডাঙ্গা থেকে ধাত্রীগ্রাম বাসে করেই আসতেন এবং বেশিরভাগ সময়ে বাসের মাথায় চেপে আসতেন ! দেখুন – তিনি physically এই সমস্ত কষ্ট করে গেছেন বলেই হয়তো তাঁর সন্তানেরা আজকে অনেক আরামের জীবন-যাপন করতে পারছে !
আবার কথায় কথায় প্রসঙ্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলাম – কিন্তু করাই বা যায় কি বলুন ! গুরুমহারাজের প্রসঙ্গ হোতে থাকলে কখন যে সেই প্রসঙ্গ কোন দিকে বাঁক নেয় – তা কি আগে থেকে ঠিক করা যায় ? সে আপন মনে যখন যেদিকে খুশি বাঁক নেবেই ! সেই flow-কে আটকাবে – আর তা করার সাধ্যই বা আছে কার ? সুতরাং ভগবান পরমানন্দ ‘কলম’ যেভাবে চালাচ্ছেন সেইভাবেই চলুক – ওই ব্যাপারে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই ৷ কারণ এতে লোকসানও তো নাই ! পরমানন্দের কথাই তো হোচ্ছে, আর তাঁর”সকলং মধুরম্” !
যাইহোক, যা বলছিলাম – গুরুমহারাজ প্রথম প্রথম ট্রেনে করে বনগ্রাম থেকে আজিমগঞ্জ যাওয়া-আসা করলেও পরের দিকে ভক্তরা গুরুমহারাজের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতো ! বিশেষতঃ গুরুমহারাজ যখন যখন বনগ্রাম থেকে বেরিয়ে নবদ্বীপের ভক্তদের অনুরোধে ওদের ওখানে দু-এক দিন কাটিয়ে আজিমগঞ্জে যেতেন – তখন ওই ভক্তরা (রবীন মালাকার, কাজল ডাক্তার, শিবু, গৌড়, প্রলয় অর্থাৎ বর্তমানে চিন্ময়ানন্দ ব্রহ্মচারী, দেবাশীষ প্রমুখরা) গুরুমহারাজের জন্য চারচাকা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতো ৷ এবার কথা হোচ্ছে কি – নবদ্বীপ থেকে কাটোয়া হয়ে আমাদের বারেন্দা আশ্রমের পাশ দিয়ে যে পাকা রাস্তা চলে গেছে – ওই পথেই আজিমগঞ্জ যেতে হয়। সুতরাং গুরুমহারাজের গাড়িও ওই পথ ধরেই যেতো। আমরা কাটোয়া অঞ্চলের তৎকালীন ভক্তরা একথা জানতে পেরে মনঃস্থ করেছিলেন যে, গুরুমহারাজকে আমরা অনুরোধ করবো – যাতে উনি যাওয়া-আসার পথে অন্ততঃ কিছুক্ষণের জন্য হোলেও পরমানন্দ মিশন বারেন্দা শাখায় পদার্পণ করেন ৷
সেইমতো বনগ্রামে গিয়ে ওনার ঘরে ঢুকে কাতর প্রার্থনা করা হয়েছিল, যথারীতি উনি তৃষাণ মহারাজ (বর্তমান স্বামী পরমেশ্বরানন্দ)-এর উপর ভার দিয়েছিলেন ৷ এরপর তৃষাণ মহারাজের সাথে পরামর্শ করে গুরুমহারাজের ‘বারেন্দা আশ্রমে’ প্রথমবারের মতো আসার দিন স্থির হয়েছিল এবং তারপর থেকে উনি তিনবার ওই আশ্রমে এসেছিলেন । আর এর মাধ্যমে তিনি এতদ অঞ্চলের বহু ভক্তকে সঙ্গসুধা দানে এবং ঋতম্ভরা প্রবচনের মাধ্যমে ধন্য করেছিলেন ৷
যাইহোক, এইবার আসি আসল কথায় ৷ বারেন্দা আশ্রমে গুরুমহারাজ থাকাকালীন বা ওনার আসার আগে প্রস্তুতিপর্ব হিসাবে আমাদের (তৎকালীন সময়ে যারা বারেন্দা আশ্রমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল, যেমন চরখীর সুব্রত, ধানডুগির জহর দা, যতীনপুরের ম্যাকমিলন, বারেন্দা গ্রামের লক্ষী মাস্টার-সমরদা- ব্রজগোপাল-ধর্মদা প্রমুখরা, রশুইগ্রামের ধীরুভাই-মনিকা-কানন প্রমুখরা) কাজের অন্ত ছিল না ! ভীষণ ব্যস্ততা – প্রচন্ড ছুটোছুটি – জনসংযোগ – গুরুমহারাজের ঘরকে ready করা – বারবার মিটিং করে সবকিছু যাতে সুশৃংখলভাবে হয় তার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দুদিন কাটিয়ে গুরুমহারাজ যেইমাত্র আশ্রম থেকে চলে যেতেন – অমনি আমরা সকলে isolated ভাবে এ এখানে – ও ওখানে বসে যেতাম! আমাদের (অন্ততঃ আমার) মনে হোতো আমাদের শরীরে কোনো বল নাই, আমাদের আর কোনো কাজ নাই, আমাদের যেন সব শেষ হয়ে গেছে !
পরবর্তীতে এই ব্যাপারটা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করায় গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “এটা হওয়ার কারণ – ‘Gravity’ ! আমি যখন যেখানে থাকি তখন সেখানে একটা বিশাল gravity কাজ করে ৷” আমরা বুঝেছিলাম যে, সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভর বা শক্তি ওই ক্ষুদ্র শরীরটাকে কেন্দ্র করেই ক্রিয়াশীল – তাই এমনটা হয়, আর তা তো হবেই ! উনি যেখানে থাকেন সেই স্থান পূর্ণ, আর উনি না থাকলেই স্থানটি vacuum বা শুণ্য !!
