শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা এবং ওনার ভক্ত-পার্ষদদের নিয়ে, ওনার জীবনের বিচিত্র ঘটনাবলী নিয়ে, বিভিন্ন সাধু-মহাত্মা-মহাজনদের সাথে ওনার সাক্ষাতের কথা নিয়ে সাজানো এই পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা ! বিগত শেষ কয়দিনের এপিসোডগুলিতে আমরা গুরুমহারাজের প্রার্থনা সংগীত (স্বামী তপেশ্বরানন্দের রচিত) নিয়ে আলোচনায় ছিলাম । মাঝখানে নানান ব্যস্ততায় (বিশেষতঃ পুত্র শ্রীমান হর্ষ-এর বিবাহ) বেশ কিছুদিন আমরা এই ধারাবাহিক লেখার কাজটি সম্পন্ন করতে পারিনি। এখন থেকে পুনরায় শুরু করা হবে।

    তবে আজকে আর পূর্বের লেখার continuation নয় - আজকে আমাদের হৃদয় বেদনার্ত ! তার কারণ - গুরুজীর অন্যতম এক সন্তান, পার্ষদ, ভক্তপ্রবর, জ্ঞানী-পন্ডিত-প্রেমিক সন্ন্যাসী বর্ধমান সদগুরু আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী মাধবানন্দ মহারাজ অতি সম্প্রতি স্থূল শরীর ছেড়ে পরমানন্দলোকে পাড়ি দিয়েছেন I শরীর ছাড়ার সময় তাঁর পার্থিব শরীরের বয়স ছিল মাত্র ৬৭ বছর। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে আমরা পরমানন্দ ভক্তেরা সকলেই মানসিকভাবে মর্মাহত, বেদনার্ত এবং বিহ্বল হয়ে পড়েছি ! তাই এখন আমাদের শোক প্রকাশের সময়, মহাত্মা মাধবানন্দ মহারাজের স্মৃতিচারণের সময়!!আর আমরা এখন কয়েকদিন ধরে সেই চেষ্টাই করবো। ছোটো ছোটো আকারে তাঁর কথা, তাঁর সাথে গুরুমহারাজের সম্পর্কের কথা, ওনাদের পারস্পরিক কথোপকথনের মাধ্যমে জগৎশিক্ষার কথা__সেইগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এই ব্যাপারে সর্বতোভাবে আমাকে সাহায্য করছেন স্বামী মাধবানন্দের গৃহস্থাশ্রমের সম্পর্কিত ভ্রাতা, সহকারী-সহযোগী এবং তাঁর সকল সময়ের সাথী স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ মহারাজ, আর মাতা প্রব্যাজিকা অমৃতাপ্রাণা।

     স্বামী মাধবানন্দ মহারাজের পূর্বনাম ছিল মহাদেব ব্যানার্জি। ওনাদের তিন ভাই এবং এক বোন সন্ন্যাস আশ্রমে রয়েছেন। এই তিন ভাইবোন যথাক্রমে মহাদেব ব্যানার্জি, জয়দেব ব্যানার্জি, প্রশান্ত ব্যানার্জি এবং রীনা ব্যানার্জি । যাঁদের নৈষ্টিকের পরে নামকরণ হয় যথাক্রমে স্বামী মাধবানন্দ মহারাজ, স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ, স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ ও প্রব্যাজিকা নিবেদিতাপ্রাণা I ওনাদের পিতার নাম ছিল রাধাগোবিন্দ ব্যানার্জি এবং মা ছিলেন শ্রীমতি গীতা ব্যানার্জি । ওনাদের পৈত্রিক নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর নিকটস্থ গলিগ্রামে । পিতার মৃত্যুর পর কর্মসূত্রে মহাদেব এবং জয়দেব ব্যানার্জিরা দুর্গাপুরের বিধাননগরে একটা কোম্পানির কোয়ার্টার ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন এবং পরিবার প্রতিপালনের জন্য প্রাইভেট টিউশনি করতে শুরু করে দেন ।

      কিন্তু মহাদেব এবং জয়দেব দুই ভাইয়েরই ছোটবেলা থেকে সংসার-বৈরাগী হবার নেশা ! বড়ভাই মহাদেব তো গ্র্যাজুয়েশনের পর থেকে বেশ কয়েকবার ঘর-সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করার জন্য বেড়িয়েও পড়েছিলেন - কিন্তু মায়ের কথা, ছোটো ছোটো ভাইবোনগুলির প্রতি দায়িত্বের কথা ভেবে আবার মায়ের আঁচলের তলায় ফিরে এসেছিলেন। তবে দুই ভাইয়েরই মাকে বলা ছিল যে, ওঁরা ঠিকই একদিন সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী হবেন ! ইতিমধ্যে মহাদেব (পরবর্তীর স্বামী মাধবানন্দ) বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন, বরানগরের স্বামী অভেদানন্দ শিষ্য সত্যানন্দ ঠাকুরের কাঁচের মন্দির আশ্রম ইত্যাদি স্থানে যাতায়াত শুরু করে দিয়েছিলেন । আর তাছাড়াও উনি আনন্দমার্গী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা প্রভাত রঞ্জন সরকারের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন ।

     প্রভাতরঞ্জনের অগাধ পাণ্ডিত্য দেখে এবং তাঁর কাছ থেকে সেবাকার্যের inspiration পেয়ে উনি আনন্দমার্গী সংগঠনের ব্রহ্মচারীদের ন্যায়ই জীবনযাপন করতে শুরু করেছিলেন। ফলে এরপর থেকে ওনার মাথা সবসময় ন্যাড়া থাকতো, উনি মাথায় পেঁচিয়ে পাগড়ি পড়তেন, সাদা পোশাক একটু আঁটোসাঁটো করে পড়তেন !  তবে তাঁর এইরূপ ত্যাগ-সংযমে ভরা জীবন যাপন__এগুলো সবই যেন স্বামী পরমানন্দের সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি পর্ব ! ওনাদের সাথে গুরু মহারাজের দেখা হোচ্ছে - ১৯৯১ কি ১৯৯২ সালে দুর্গাপুরে ! কিন্তু তার কতো আগে বনগ্রামে গুরুজী পরমানন্দ মিশনের কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিলেন (বনগ্রাম আশ্রম প্রতিষ্ঠা ১৯৭৮ সালে)! কিন্তু ভগবান পরমানন্দ তাঁর এই দুই পার্ষদদেরকে ডেকে নিচ্ছেন কত পরে ! আসলে ভগবানের লীলা কজনই বা বুঝতে পারে !

     যাই হোক, আজ এই অব্দিই থাক । আগামী এপিসোডে মাধবানন্দ ও জ্যোতির্ময় মহারাজের সাথে গুরুমহারাজের সংযোগের কথা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। তাছাড়া 'সংযোগ' কিভাবে 'সম্পর্ক' এবং শেষে 'সম্বন্ধে' গিয়ে পৌঁছালো সেইসব আলোচনাও হবে।(ক্রমশঃ)

         ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ