শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের অন্যতম সন্ন্যাসী শিষ্য, অন্তরঙ্গ পার্ষদ স্বামী মাধবানন্দের অকাল প্রয়াণে “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা” page-এ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন কল্পে স্বামী মাধবানন্দের স্মৃতিচারণ করা হচ্ছিলো । প্রিয় পাঠকেরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে, গুরুমহারাজের গলায় একরাশ রজনীগন্ধার মালা পড়ানো অবস্থায় একটা ছবি লেখার সাথে এই কয়েকদিন দেওয়া হোচ্ছে ! এর একটা বড় কারণ হোলো এই যে, এই ছবিটা স্বামী মাধবানন্দের ব্যবস্থাপনায় বর্ধমানে কঙ্কালেশ্বরী মায়ের মন্দিরে তোলা হয়েছিল । এখানে একটা ব্যাপার খুবই লক্ষণীয় যে, গুরুমহারাজ রজনীগন্ধার মালা একদমই পছন্দ করতেন না – কিন্তু স্বামী মাধবানন্দ মহারাজকে গুরুমহারাজ এতটাই স্নেহ করতেন যে, তিনি শুধুমাত্র ওই মালাগুলি কন্ঠে ধারণ করেছিলেন তাই নয় – বেশ হাসি হাসি মুখে সুন্দরভাবে ‘পোজ’ দিয়ে ফটোটা তুলেছিলেন এবং ওই ফটোটা এতোই প্রাণবন্ত হয়েছিল যে, আজ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের বহু শাখায় এবং সহস্র ভক্তের গৃহে ফটোটি পূজার বেদীতে স্থান করে নিয়েছে।
আজকে আর একটি ছবি পোস্ট করা হবে যেটা পরমানন্দ ভক্তদের মধ্যে অনেকের কাছেই একেবারে নতুন ! কারণ জ্যোতির্ময়ানন্দ মহারাজ এই ছবিটি বাইরের বিশেষ কাউকে এতোদিন দেননি ! গুরুমহারাজের সাথে বিধাননগরে দেখা হবার পর গুরুজী ওনাকে আসতে বলেছিলেন । কিন্তু কোথায়, কোন্ ভক্তের বাড়িতে উনি উঠেছেন তা বলেন নি । জ্যোতির্ময় মহারাজ ঠিক-ই খুঁজে বের করে ফেলেছিলেন - উনি ওই পাড়ায় কোন বাড়িতে রয়েছেন । সেখানে গুরুমহারাজের করা কিছু ধর্মালোচনাও উনি সেদিন শুনেছিলেন । তারপর বাড়ির মালিক যখন গুরুজীর ফটো তুলছিলেন - তখন জ্যোতির্ময় মহারাজ গুরুজীকে অনুরোধ করেন (প্রথম দর্শনেই) যাতে গুরুজীর সাথে ওনার একটা ছবি তোলা হয় । এই অনুরোধের উত্তরে গুরুজী বলেন - " দ্যাখ্, ফটোগ্রাফারের 'রিলে' আর জায়গা রয়েছে কিনা !"(গুরু মহারাজ প্রথম পরিচয়ে মহারাজকে 'তুমি' সম্বোধন করলেও একটু পর থেকেই পূর্ব পরিচিতের ন্যায় 'তুই' বলতে শুরু করেছিলেন। আসলে তখনকার দিনে ডিজিটাল ক্যামেরা সাধারণের কাছে ছিল না । তখন ক্যামেরায় 'রিল' ভরে ছবি তুলতে হোতো এবং এক একটা 'রিলে' ক্যামেরার কোয়ালিটি অনুযায়ী বারোটা, ষোলোটা, চব্বিশটা, বত্রিশটা - এইরকম সংখ্যার ছবি তোলা যেতো।
সৌভাগ্যক্রমে ক্যামেরাম্যানের 'রিলে' স্থান ছিল, ফলে গুরুজীর সাথে জ্যোতির্ময় মহারাজ একটা ফটো (সেই প্রথম সাক্ষাতেই) তুলেছিলেন । আজ সেই ছবিটি আপনাদের সবার কাছে আনা হবে।
জ্যোতির্ময়ানন্দ নামটি গুরুজী-ই দিয়েছিলেন ওনাদের নৈষ্টিক ব্রহ্মচর্যের সময় । সত্যি সত্যিই জ্যোতির্ময়ানন্দ মহারাজ (তখনকার জয়দেব) খুবই সুদর্শন ব্যক্তি, গুরুজীর সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় আরো কমবয়স ছিল, ফলে তখন উনি আরো সুদর্শন ছিলেন _তবে সুদর্শন নং -২ !! আপনাদের মনে হোতেই পারে দুই নম্বর কেন ? কারণ গুরুমহারাজ সবসময়েই এবং সব ব্যাপারেই No-1 ! তাঁর ওই স্থান তো আর অন্য কারোর স্পর্শ করার কথা নয় - তাই মহারাজকে Outlook-এর point of view থেকে ২ নম্বরে রাখা হয়েছে I
এইবার আবার আসি মাধবানন্দ মহারাজের কথায় । ভাইয়ের কাছ থেকে এবং ওনার এক ছাত্রের gurdian ব্যানার্জি বাবুর মুখে গুরুমহারাজের কথা শুনে মাধবানন্দ মহারাজ (তৎকালীন মহাদেব ব্যানার্জি) ছুটে গিয়েছিলেন সেজকাকার কোয়ার্টারে ('সেজকাকা' অর্থাৎ বনগ্রামের ন'কাকার সেজদাদা উমাপ্রসাদ মুখার্জী।)। গুরুজী দুর্গাপুরে গেলে সাধারণতঃ সেজকাকার বাড়িতেই উঠতেন । ফলে ওখানেই গুরু-শিষ্যের প্রথম সাক্ষাৎ হয় - স্বামী পরমানন্দ এবং ভবিষ্যতের স্বামী মাধবানন্দের । এইবার ওখানে গুরুজীর মুখনিঃসৃত বাণী শুনে মাধবানন্দ মহারাজ একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন । ফলে উনি আন্তরিকভাবে গুরুজীর কাছে আবেদন রাখেন যাতে গুরুজী ওনাদের বাসা বাড়িতে একবার অন্ততঃ যান । গুরুজী সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে পরের দিন গিয়েছিলেন, সঙ্গে ছিলেন তপিমা অর্থাৎ প্রব্যাজিকা পবিত্রপ্রাণা I
আগেই বলা হয়েছে যে, তখন দুর্গাপুর অঞ্চলে মাধবানন্দ মহারাজের ideal teacher হিসাবে খুবই নামডাক । বিভিন্ন নামীদামী বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ওনার কাছে পড়তে আসতো । তাদের guardian-রাও মহারাজের খুবই অনুরাগী ছিল । তাই ওনাদের বাড়িতে গুরুজীর সিটিং-এ সেদিন ভীষণ ভিড় হয়েছিল। অনেক ছাত্রছাত্রীরাও এসেছিল - তার মধ্যে St. Xaviers স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক এবং তাদের অভিভাবকরাও ছিল । কিন্তু এতো ভিড় আর সেই তুলনায় ঘর ছোটো, তাহলে সবার ব্যবস্থা কি করে হয় ? সব মুশকিল আসান করে দিয়েছিলেন বিপদভঞ্জন-সংকটমোচন হরিরূপী স্বয়ং গুরুমহারাজ! উনি সকলকে 'গ্রুপ'-- 'গ্রুপ' করে ভেতরে আসার জন্য ব্যবস্থা করে দিতে বলেন । ফলে ছাত্ররা বা অন্যান্য ভক্তবৃন্দরা প্রত্যেকেই ভিতরে ঢুকে কিছুক্ষণ করে থাকার সুযোগ পাচ্ছিলো এবং তারা সকলেই তাদের নিজ নিজ জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পাচ্ছিলো। সমস্ত উত্তর পাবার পর তারা সন্তুষ্ট চিত্তে বাইরে বেরিয়ে পরের গ্রুপকে ঢোকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলো I এইরূপে খুব সুশৃঙ্খলভাবে সেদিন গুরুজীর সিটিং চলছিল।
সত্যি সত্যিই সেইদিন গুরুজীর আলোচনা খুব জমে গিয়েছিল । অল্পবয়স্ক অথচ brilliant ছাত্র-ছাত্রীদের সান্নিধ্যে গুরুমহারাজও খুব আনন্দ করছিলেন । এমন মনে হচ্ছিলো যে গুরুজী হয়তো রাত্রে ওখানে থেকেই যাবেন ! কিন্তু হঠাৎ করে তপিমার একটু শারীরিক কোনো সমস্যা দেখা দেওয়ায় গুরু মহারাজ পুনরায় সেজকাকার ঘরে ফিরে গিয়েছিলেন । কিন্তু যাবার আগে জ্যোতির্ময় মহারাজকে বলেছিলেন - " তুই সময় পেলে বনগ্রাম আশ্রমে যাবি ।" (ক্রমশঃ)