শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের অন্যতম এক সন্ন্যাসী ভক্ত, তাঁর লীলা সহযোগী স্বামী মাধবানন্দ মহারাজ (বর্ধমান সদগুরু আশ্রমের অধ্যক্ষ)-এর অকাল প্রয়াণে আমরা তাঁর পুণ্য স্মৃতিচারণের নিমিত্ত – তাঁর জীবন ও জীবনীর কিছু কিছু অংশ এখানে সকল পাঠকের কাছে উপস্থাপনা করার চেষ্টা করছি ।

   মাধবানন্দ মহারাজ খুব ছোটো বয়স থেকেই একটু ভিন্নধর্মীর বালক ছিলেন I তিনি স্কুল জীবনের প্রথমদিকে কখনও বিদ্যালয়ে সেকেন্ড হ'ন নি - সবসময়ই ফার্স্ট ! তারপর পড়াশোনার বৃহত্তর জগতে প্রবেশ করেও বাংলায় ভালোমতো মার্কস নিয়ে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেছিলেন । পাশাপাশি সংস্কৃত বিষয়টিকে উনি খুবই ভালোবাসতেন এবং সংস্কৃতেও উনি খুবই পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন ।
 বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের মুখপত্র ত্রৈমাসিক "চরৈবেতি" পত্রিকায় লেখাগুলোর মধ্যে সংস্কৃত কোটেশন্ ব্যবহার থাকলে, তার প্রয়োগ যথার্থ হয়েছে কিনা -- সেইটা চরৈবেতি প্রকাশনা বিভাগের মহারাজরা মাধবানন্দ মহারাজকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতেন । অতি সম্প্রতি বনগ্রাম থেকে প্রকাশিত 'স্তব ও স্ত্রোত্রাবলী' গ্রন্থটির পুন:মুদ্রণের কাজ চলছে। ওখানে বিভিন্ন দেবদেবীর স্তব বা প্রণাম মন্ত্রের কোথাও কোনো ত্রুটি রয়েছে কিনা - তা সম্পাদক স্বরূপানন্দ মহারাজ স্বামী মাধবানন্দ মহারাজের কাছেই জেনে নিতেন I

        চরৈবেতি কার্যালয়ের অন্য এক কর্মী বিশু মহারাজ   (স্বামী বিশ্বনাথানন্দ) বর্তমানে ওই পত্রিকার প্রুফ গুলি দেখে থাকেন । ফলে ওনার যেকোনো স্থানে বোঝার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হোলে  মাধবানন্দ মহারাজের‌ই শরণাপন্ন হোতেন । 'পরমানন্দ বন্দনা'-র ভুলত্রুটির ব্যাপারে কথা বলার সময় স্বামী মাধবানন্দ বিশু মহারাজকে বলেছিলেন - "দ্যাখো, ওই স্তবগাথাটির মধ্যে অনেক স্থানেই গ্রামারিটিক্যাল এবং ছন্দগত ত্রুটি রয়েছে - কিন্তু যেহেতু স্তবটি গুরুমহারাজ থাকতেই রচিত হয়েছিল এবং গুরুমহারাজকে ওই স্তবগাথাটি গেয়ে শুনিয়ে আরতি করা হোতো, তাছাড়া সকাল সন্ধ্যায় প্রার্থনার সময় প্রতিদিন আশ্রমে গাওয়াও হোতো -- তখন গুরুমহারাজ যখন ভুল ধরেননি বা correction করে যাবার কথা বলেননি, তখন আমি (স্বামী মাধবানন্দ) এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করবো না ।"

      যাইহোক, এইসব কথা এখন থাক ! আমরা গত এপিসোডের পরের ঘটনাপ্রবাহের আলোচনায় ফিরে যাই! আমরা আগের দিন দেখেছিলাম যে, গুরুমহারাজ জ্যোতির্ময় মহারাজকে বনগ্রামে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন I সেই কথামতো উনি দুর্গাপুর থেকে বনগ্রাম আশ্রমে চলে এসেছিলেন । বনগ্রাম আশ্রমে এসে উনি খোঁজ নিয়ে জানলেন যে, গুরুমহারাজ তাঁর কুটিয়ায় রয়েছেন । তাই উনি সরাসরি গুরুমহারাজের ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। গুরুমহারাজ ওনাকে দেখেই বলেছিলেন - "ও: তুই ! চলে এসেছিস ! আয় - এখানে বস্ !" এই বলে জ্যোতির্ময় মহারাজকে গুরুমহারাজ ওনাকে নিজের বেদীতেই বসতে বলেছিলেন । মহারাজ প্রথমটায় একটু সংকুচিত থাকলেও পরে সহজভাবে ওনার বেদীতে বসে গুরুমহারাজের সাথে কথাবার্তা বলতে শুরু করেছিলেন। ওই কথাবার্তার মধ্যেই পরবর্তী বুদ্ধ পূর্ণিমায় (১৯৯২ সালে, এপ্রিল-মে) যে আশ্রম থেকে কয়েকজনের নৈষ্ঠিক হবে - সেই কথাটাও গুরুজী ওনাকে বলেন ।

       এই প্রসঙ্গ উঠতেই জ্যোতির্ময় মহারাজ (তখনকার জয়দেব ব্যানার্জি) গুরুজীর কাছে ওনার নামটাও ওই list -এ তোলার জন্য অনুরোধ জানান এবং গুরুজীও রাজি হয়ে যান । উনি বলেছিলেন - তাহলে বাড়ি ফিরে গিয়ে মা-য়ের অনুমতি নিয়ে একবারে ready হয়ে বনগ্রামে চলে আসতে । দেখুন - এইখানে কিন্তু একটা কথা বলার রয়েছে ! মহাদেব এবং জয়দেব এই দুই ভাইয়ের মধ্যে মহাদেব বা মাধবানন্দ মহারাজ ছোটবেলা থেকে অধ্যাত্মপরায়ণ, আত্মসাক্ষাৎকারের জন্য ব্যাকুল ! উনি এইজন্য বহু সাধু-সন্তের সঙ্গ করেছেন, বহু মঠ-মিশনে গেছেন, বহু সদগ্রন্থ পাঠ করে সেখান থেকে জ্ঞান আরোহন করেছেন এবং মহাপুরুষদের জীবনী ও বাণী পাঠ করে_ সেইরকম ত্যাগ-বৈরাগ্যপূর্ণ জীবন যাপনে সচেষ্ট থেকেছেন, দু-চারবার ঘর ছেড়ে বৈরাগী-আশ্রমবাসীও হয়েছেন, এমনকি একবার ঈশ্বর অদর্শনের অভাবজনিত তীব্র ব্যাকুলতায় নিজের জীবন বিসর্জন দেবার কথাও ভেবেছিলেন - সেই মাধবানন্দ মহারাজের নাম কিন্তু তখনও পর্যন্ত গুরুজীর দ্বারা প্রদত্ত নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারীদের list -এ ছিল না!

   এটাই ভগবানের লীলা, এটাই ভগবান পরমানন্দের অদ্ভুত ও অপার্থিব লীলা ! যাঁকে উনি ওনার কাজের জগৎকল্যাণ বা মানব কল্যাণ সহযোগী করে নেবেন, যাঁকে উনি ওনার নিজের কাজ(বর্ধমান কঙ্কালেশ্বরী কালী মন্দিরের ✓রী মায়ের দায়িত্ব মাধবানন্দ মহারাজকে অর্পণ করার সময় গুরুজী বলেছিলেন_ "এই দায়িত্বটা  ✓রী মা আমাকে দিয়েছিলেন । কিন্তু যেহেতু আমার এই শরীরে ওই ধরনের কাজ এবার হবে না, তাই এই কাজের যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে আমি আমার এক প্রিয় সন্তানকে ✓রী মায়ের দায়িত্ব দিলাম এবং দিয়ে নিশ্চিন্ত হোলাম।"

এটা একটা বিশাল ব্যাপার ! বর্ধমান শহরের ওই ধর্মকেন্দ্র (কংকালেশ্বরী মন্দির)-কে কেন্দ্র করে বহু মানুষের মধ্যে ব্যপক ধর্মভাব জাগ্রত হয়েছে, হয়তো আগামী দিনে তা আরো ব্যপকতা লাভ করবে । তাছাড়া ওই স্থানে কয়েক বছর কাটানোর ফলে বর্ধমান শহরের ভক্ত সমাজে মাধবানন্দ মহারাজের একটা বিশাল পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। যেটা পরবর্তীতে "বর্ধমান সদগুরু আশ্রম" প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং তার বিকাশ ঘটাতে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল। "সদগুরু আশ্রম"_প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য‌ও তো সেই মানব কল্যান‌-ই _তাই নয় কি! এখানে মহারাজ প্রত্যহ ধর্মালোচনা করতেন _বহু ভক্তমন্ডলী তা শ্রবণ করে উদ্বুদ্ধ হয়ে তা নিজেদের জীবনে প্রতিফলনের চেষ্টা করতো। এইটাই তো প্রকৃত সাধু জীবনের সার্থকতা !  নিজে সাধু হ‌ওয়াটাই বড়ো ব্যাপার নয়, সাধুর সান্নিধ্যে আসা সাধারণ মানুষকে 'সাধু' বানিয়ে তোলাটাই তো বাহাদুরি!!!