শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সন্ন্যাসী শিষ্য, পরমভক্ত, অন্তরঙ্গজন এবং পরমানন্দ ভক্তজনের একান্ত শ্রদ্ধার মহারাজ স্বামী মাধবানন্দের অকাল প্রয়াণে আমরা শোকবিহ্বল । এই পেজে তাঁর স্মৃতিচারণা করে আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলাম । আমরা আগের দিন দেখেছি স্বামী মাধবানন্দ (তখনকার মহাদেব ব্যানার্জ্জী)-এর সাথে গুরুমহারাজের তাঁর কুঠিয়ায় যখন প্রথমবার জ্যোতির্ময়ানন্দের প্রথমবার নৈষ্টিক-এর ব্যাপারে কথা হয়েছিল – তখন সব কথার শেষে গুরুমহারাজ ওনাকে ঐ একই দিনে অর্থাৎ বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে নৈষ্ঠিক নেবার জন্য বলেছিলেন । এটা শুনে মাধবানন্দ মহারাজ তো এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন!!
মহানন্দে উনি ফিরে গিয়েছিলেন দুর্গাপুরে । ধন্য মহীয়সী মাতা - যিনি এই কথা শুনে যৎপরোনাস্তি আনন্দিত হয়েছিলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে মা জননী সন্তানদ্বয়কে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে বনগ্রাম আশ্রমে পৌঁছে গেছিলেন । বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে ঐ নৈষ্ঠিক ক্রিয়া হয়েছিল। সন্ন্যাস নামকরণের সময় উপস্থিত হোলে গুরুমহারাজ প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন - ' তার নিজের পছন্দের কোনো নাম রয়েছে কিনা !' জ্যোতির্ময় (তৎকালীন জয়দেব) কোনো উত্তর দেননি - গুরুমহারাজ তখন নিজে থেকেই নাম দেন 'স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ' । আর মাধবানন্দ (মহাদেব)-কে যখন গুরুজী জিজ্ঞাসা করেছিলেন - " নামের ব্যাপারে তোর কি কোনো নিজস্ব পছন্দ রয়েছে ?" তখন উনি উত্তর দিয়েছিলেন - "আমার নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে কোনো নাম হোলে ভালো হয় ।" তখন গুরুমহারাজ বলেছিলেন - " ঠিক আছে ! তোর নাম হোক্ 'স্বামী মাধবানন্দ' ।"
সেই থেকেই মহাদেব ব্যানার্জি "মাধবানন্দ মহারাজ" নামে পরিচিত হোলেন । নৈষ্ঠিক নেবার পরেই নানু মহারাজ (স্বামী নির্বেদানন্দ) এবং ইন্দ্রজিৎ মহারাজ (স্বামী অসংগানন্দ) ও বাসুদেবানন্দ বনগ্রাম আশ্রমেই পাকাপাকি থেকে গেছিলেন । কিন্তু জ্যোতির্ময় এবং মাধবানন্দ মহারাজকে গুরুজী বলেছিলেন - " তোরা একবারের জন্য দুর্গাপুরে ফিরে যা । ওখানে ফিরে গিয়ে তোদের উপরে যে সমস্ত দায়-দায়িত্ব ছিল সেইগুলোর ব্যবস্থা কর এবং মা ও ভাইবোনের পরিপোষণের যদি অসুবিধা থাকে, তাহলে এখানে এই বনগ্রাম আশ্রমে সকলকে নিয়ে চলে আয় । আমি মুরারী-তৃষাণ এদেরকে বলে রাখবো --- এখানে সকলের থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধা হবে না।
ফলে ওনারা দুইজনেই দুর্গাপুরে ফিরে গেছিলেন এবং সেখানকার যাবতীয় কাজকর্ম সেরে ওনারা সকলকে (মা, ছোট বোন এবং ছোট ভাই) নিয়ে এক বা দেড়মাসের মধ্যেই বনগ্রাম আশ্রমে ফিরে এসেছিলেন ।
তখন বনগ্রাম আশ্রম সবে একটু একটু করে বিকশিত হয়ে উঠছে । স্বয়ং ভগবান পুনরায় নবশরীরে নরশরীরে বনগ্রামে লীলা করছেন - এই খবর ধীরে ধীরে প্রচারিত হোতেই মধুলোভী মৌমাছির ন্যায় আধ্যাত্মপিপাসু ভক্তবৃন্দের দল ঝাঁকে ঝাঁকে বনগ্রামে আসতে শুরু করেছিল । সেই সাথে সংসারের ভোগ-ঐশ্বর্যের মায়ামোহ ত্যাগ করে বেশ কিছু তরুণ-তরুণীরাও একে একে এসে গুরুমহারাজের আরব্ধ সেবাকার্যে নিজেদেরকে যুক্ত করেছিল ।
সেই সময়টা ছিল বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের তিলে তিলে গড়ে ওঠার সময় I দলে দলে ভক্তরা আসছে, ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণী, সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীরা নিষ্ঠাবান তপস্বীর ন্যায় গুরুজীর দেওয়া কর্মে নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছে ! অথচ থাকার তখন ভালো ঘরবাড়ি নাই, শোয়ার তেমন বিছানা-বালিশ নাই খাবার বলতে Rice to Rice অর্থাৎ দুপুরে এবং রাত্রে ভাত-ডাল-একটা তরকারি ! তাও বেশিরভাগ সময়েই অল্প দাম বলে - কুমড়োর তরকারি আর রাতে সয়াবিন I
কিন্তু সকলের কাজের প্রতি কি ভীষণ নিষ্ঠা I প্রত্যেকে যেন হিমালয়ের গহীনে থাকা একনিষ্ঠ তপস্বী বা তপস্বিনী l বনগ্রামে আসার কিছুদিনের মধ্যেই ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণীদের মুখমণ্ডল থেকে উজ্জ্বল জ্যোতিঃ বের হোতো ! আমরা তখন মাঝে মাঝে আশ্রমে যাওয়া-আসা করতাম, ফলে কে কখন নতুন ছেলে-মেয়ে আশ্রমে সেবাব্রত গ্রহণ করে পাকাপাকিভাবে থাকতে আসছে - তাদের সকলকে চিনতাম না ! কিন্তু জাবুইডাঙ্গা বা বর্ধমান-কালনাগামী বাসের মধ্যে দেখলেই বুঝতে পারতাম -- ইনি পরমানন্দ মিশনের ব্রহ্মচারী বা ব্রহ্মচারিণী ! তাদের মুখমন্ডলের মধ্যে এমনই একটা divine ভাব ফুটে উঠতো যে, একবার দেখলেই সেটা বোঝা যেতো ।
যাক্ সেসব কথা ! আমরা মাধবানন্দজীর কথায় ফিরে আসি । ওনারা দুর্গাপুর থেকে ফিরে আসার পর গুরুমহারাজ জ্যোতির্ময়ানন্দ মহারাজকে প্রাইমারি স্কুলের দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন । দুর্গাপুরে যেহেতু মহারাজদ্বয় ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতেন - তাই তখন ছাত্রদের দায়িত্ব নেওয়া মহারাজের কোনো অসুবিধা হয়নি । সেইসময় মহারাজকে সাহায্য করতেন - নানু মহারাজ (স্বামী নির্বেদানন্দ), নচিকেতা (সিঙ্গুর), রেবা-মা (প্রব্যাজিকা .....প্রাণা) প্রমুখরা এবং ছেলেমেয়েদের মূল দায়িত্বে ছিলেন মদন মহারাজ (স্বামী চিৎবিলাসানন্দ) I আর মাধবানন্দ মহারাজকে গুরুজী চরৈবেতি কার্যালয়ের সম্পাদক স্বামী স্বরূপানন্দকে সাহায্য করার কথা বলেন ।
যেহেতু মহারাজের বাংলায় অনার্স ছিল এবং সংস্কৃত ওনার একটা অন্যতম subject ছিল - তাই ওনাকে সহকারী হিসাবে পেয়ে স্বরূপানন্দ মহারাজের খুবই সুবিধা হয়েছিল । সহজ-সরল প্রেমপূর্ণ ব্যবহার, মিষ্টভাষী ও মিতভাষী মানুষটাকে বনগ্রাম আশ্রমের সকলেই তখন ভালবেসে ফেলেছিল ।।