শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সন্ন্যাসী-শিষ্য স্বামী মাধবানন্দজীর অকাল প্রয়াণে আমরা মর্মাহত । তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের নিমিত্ত তাঁর জীবনের ঘটনাবলী নিয়ে এখানে স্মৃতিচারণের চেষ্টা চালানো হোচ্ছে I ‘পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা’ পেজে আজকে আমরা তাঁর সন্ন্যাসজীবনের সূচনা পর্বের কথা নিয়ে আলোচনা করবো। এই অংশের ঘটনাগুলি আমাদের আশ্রমের অর্থাৎ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের যাঁরা সিনিয়র সন্ন্যাসী রয়েছেন – তাঁরা বিশদে অবগত রয়েছেন । তাই যদি কেউ (কোনো মহারাজ বা সিনিয়র ভক্তগণ যাঁরা মাধবানন্দ মহারাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন) তাঁর জানা ঘটনা বা তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন – তাহলে পাঠকবর্গ স্বামী মাধবানন্দজী সম্বন্ধে আরো কিছু কথা জানার সুযোগ পাবেন।
দেখুন - ভগবান যখনই অবতীর্ণ হ'ন, তিনি কখনোই একা আসেন না, তাঁর সাথে দলবল থাকে । গুরুমহারাজ বলেছিলেন ঈশ্বরকে অবতাররূপে (মনুষ্যশরীরে) আসা যেন ছদ্মবেশ ধারণ করে রাজার রাজ্য পরিদর্শন ! রাজা ছদ্মবেশ ধারণ করে তাঁর রাজ্যের কোনো স্থানে 'ভিজিটে' যাবেন -- তাহলে সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রী মশাই তাঁর সিকিউরিটির ব্যবস্থা করবেন না, তাঁর সুবিধা-অসুবিধা দেখবেন না - তাই কি কখনো হয় ? ফলে রাজার সাথে সাথে একটা বড়ো মতো টিম সবসময়েই থাকে। তবে তারা তো আর রাজামশাইয়ের একেবারে গায়ে গায়ে লেগে থাকেন না - একটু আশে পাশে থাকেন । প্রয়োজনে রাজার কাছাকাছি হ'ন, কিন্তু তাঁর কাজের সহযোগী হয়ে থাকেন । রাজামশাই যে কাজের নিমিত্ত রাজ্যের বিশেষ অংশে পরিদর্শনে এসেছেন - সেই কাজে তাঁরা সর্বদাই সহযোগিতা করে থাকেন।
আমাদের আশ্রমে (বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে)ও যাঁরা গুরুমহারাজের চরণে তাদের জীবন-যৌবন সঁপে দিয়েছেন, তাঁর কাজের সহযোগী হয়েছেন -- তাঁরা তাঁর পার্ষদ তো বটেন-ই ! গুরুমহারাজ প্রকৃত ত্যাগী-সন্ন্যাসীদের কতো মর্যাদা দিতেন, বলতেন - "এঁরা cream of the society !" আরো বলতেন - "তোদের ভারতবর্ষে ঋষি-মুনি-মহাত্মা-মহাপুরুষকে বাদ দিলে তো গোটা কয়েক ছাগল-ভেড়া পড়ে থাকবে !" তাই এঁনারাই ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ । এঁনারাই পৃথিবীর অন্যান্য স্থান অপেক্ষা ভারতবর্ষকে মহান করে তুলেছেন। এঁনারা ছিলেন বা আজো আছেন বলেই পৃথিবীগ্রহের মাথা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে ভারতবর্ষ !
এই কথাগুলো বলতে হোলো এই জন্য যে, অনেকে এরমধ্যেই আমাকে ফোন করে বলতে শুরু করেছেন যে, ' মাধবানন্দ মহারাজ আর এমন কি ছিলেন যে তুমি ওনাকে গুরুজীর অন্তরঙ্গ বলছো - পার্ষদ বলছো ?' ভগবান পরমানন্দের কাজের যিনিই সহযোগী - তিনিই তাঁর অন্তরঙ্গ, তিনিই তাঁর পার্ষদ - আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিতে তো সেটাই মনে হয় ! তাছাড়া একজন মহারাজ (ত্যাগী সন্ন্যাসী) কেমন, আধ্যাত্মিকভাবে কতোটা উন্নত__তির বিচার 'আমি ক্ষুদ্র ব্যক্তি' হয়ে কি করে করবো? আমার সে ধৃষ্টতা হয় কি করে !
দেখুন __যেখানে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ যৌবনের জোয়ারে ভেসে যায়, ভোগ-ঐশ্বর্য-প্রাচুর্য-বিলাসব্যসন ইত্যাদিকেই জীবনের ধ্রুবতারা বলে মনে করে থাকে - সেখানে যে কয়েকজন কতিপয় মানুষ (নর এবং নারী) যৌবনের প্রারম্ভেই গুরুদেবের চরণপ্রান্তে এসে সংকল্প করছে যে, সে যৌবনের ভোগ-লালসায় মত্ত হবে না, ঐশ্বর্য-প্রাচুর্য-বিলাসব্যসনের দিকে ছুটবে না বরং সে তীব্র বৈরাগ্যবান হয়ে ঐ সবকিছুকে তুচ্ছ করে সংযমের জীবন - ত্যাগের জীবনকে বেছে নিয়েছে, সুকঠোর সাধনার দ্বারা আত্মতত্ত্ব লাভে ব্রতী হোচ্ছে -- সেই ব্যক্তি তো অবশ্যই ঈশ্বরের প্রিয়জন ! তাঁকে রক্ষা করার জন্য, তাঁর অসুবিধা দূর করার জন্য স্বয়ং ঈশ্বর সর্বদা উন্মুখ ! প্রয়োজনে সেই পরাতত্ত্ব মানুষের রূপ পরিগ্রহ করে তাঁর আশেপাশেই থেকে স্বয়ং তার কাজের সহযোগী হ'ন -- ভক্তিশাশ্ত্রাদিতে এমনও বহু নিদর্শন রয়েছে ! অবশ্য সেগুলি লীলার জগতের কথা - জ্ঞানমার্গীদের জন্য নয় !!
এসব কথা এখন থাক্, আমরা আবার স্বামী মাধবানন্দের কথায় ফিরে আসি । নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য দেবার পরেই গুরুমহারাজ ওনাদের পাঁচজনকেই (জ্যোতির্ময়ানন্দ, মাধবানন্দ, নির্বেদানন্দ, অসঙ্গানন্দ, বাসুদেবানন্দ) প্রয়োজনে গেরুয়া পড়ার অনুমতি দিয়ে দিয়েছিলেন । তবে আমরা দেখেছিলাম যে, ওনাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন পর্যন্ত সাদা কাপড় পড়তেন । পরে অবশ্য প্রত্যেকেই গুরুমহারাজের আদেশ পালন করেছিলেন অর্থাৎ গেরুয়া কাপড় পড়তে শুরু করেছিলেন। মাধবানন্দ মহারাজ বনগ্রাম আশ্রমে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করার ঠিক আগেই বর্ধমানের ভক্তেরা গুরুমহারাজকে কঙ্কালেশ্বরী কালীবাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন এবং খুব সম্ভবতঃ ওখানে গুরুমহারাজের একটা program -ও হয়েছিল । ওখানকার জনগণ বা কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরের কমিটি মেম্বাররা গুরুমহারাজকে মন্দিরটির দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন কিনা__ সেইটা আমার ঠিক জানা নাই কিন্তু ঐ মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রীদেবী (মা কঙ্কালেশ্বরী) গুরুজীকে অনুরোধ করেছিলেন - যেন উনি ঐ মন্দিরের সমস্ত দায়িত্ব নেন!
এই সমস্ত কথা গুরুমহারাজ স্বামী মাধবানন্দকে পরবর্তীতে বলেছিলেন - যখন গুরুজী মাধবানন্দ মহারাজকে কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরের ভার নেবার জন্য বর্ধমানে পাঠিয়েছিলেন। সন্ধ্যার দিকে একদিন গুরুজী তাঁর ঘরে মাধবানন্দকে ডেকে বলেছিলেন - " বর্ধমানের কঙ্কালেশ্বরী মা তাঁর মন্দিরের ভার আমাকে নিতে বলেছিলেন । কিন্তু এই লীলায় ঐ ধরনের কাজ এই শরীরে হবে না, তাই আমি মা-কে কথা দিয়েছিলাম - 'এই কাজের জন্য উপযুক্ত কোনো ছেলেকে আমি যথাসময়ে পাঠাবো।' আমার একান্ত ইচ্ছা তুমি ঐ মন্দিরের ভার নাও । আগে তুমি একবার ওখানে যাও, গিয়ে যদি ওখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি তোমার ভালো লাগে __তাহলে আমি ওখানকার কমিটির কাছে তোমার নাম প্রস্তাব করবো।"
গুরু আজ্ঞা পালন করতেই স্বামী মাধবানন্দের প্রথম কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরে গমন -- এবং মা কঙ্কালেশ্বরী মন্দিরের দায়িত্ব গ্রহণ।
আর ঐখান থেকেই স্বামী মাধবানন্দ তাঁর সহজ-সরল জীবন যাপন এবং প্রেমপূর্ণ ব্যবহারের দ্বারা বর্ধমান শহরের বহু মানুষের কাছে ধীরে ধীরে পরিচিত হোতে শুরু করলেন। আরো পরে তিনি গুরু কৃপায় তাদের সকলের ব্যাথার ব্যাথী, তাদের সুখ-দুঃখের সাথী, হয়ে উঠেছিলেন । “গুরুবৎ গুরুপুত্রেষু”–অনেক ভক্তেরা তাঁকে গুরুর মতোই ভক্তি করতেন।।