শ্রী শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের অন্যতম একজন সন্ন্যাসী শিষ্য-ভক্তসাধক মাধবানন্দ মহারাজের অকাল প্রয়াণে তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হচ্ছিলো । গত ১৭/০২/২০২৪ তারিখে তাঁর মহাপ্রয়াণের সাধু-ভান্ডারা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বর্ধমান সদ্গুরু আশ্রমে (ইছালাবাদ, বর্ধমান) । পরমানন্দ মিশনের প্রায় সমস্ত শাখা থেকেই ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী ভক্তেরা ওই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন । বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন থেকে আগত কয়েকজন সন্ন্যাসী গীতাপাঠ ও বৈদিক শান্তিপাঠের মূল দায়িত্বে ছিলেন, ছিলেন রায়না তপোবন আশ্রমের সন্ন্যাসীগণ এবং অন্যান্যরা I

       তপোবন আশ্রমের দায়িত্ব যাঁর উপর ন্যস্ত, প্রাজ্ঞ সন্ন্যাসী স্বামী পূর্ণানন্দ মহারাজের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির শোভা বর্ধন করেছিল। তাছাড়াও বিশিষ্ট জনেদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তপিমা (প্রব্যাজিকা পবিত্রপ্রাণা), যিনি প্রায় সারাক্ষণ গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের সেবা-শুশ্রূষা বা দেখভালের দায়িত্ব সামলাতেন । বনগ্রামের সিনিয়র সন্ন্যাসীদের মধ্যে বনগ্রাম থেকে দীপ্তি মহারাজ (স্বামী ভূমানন্দ), হরি মহারাজ (স্বামী সহজানন্দ), কাটোয়ার বারেন্দা আশ্রম থেকে নানু মহারাজ (স্বামী নির্বেদানন্দ), পুরুলিয়া থেকে অমূল্য মহারাজ (স্বামী অভয়ানন্দ), আজিমগন্জ আশ্রমের কৃষ্ণানন্দ মহারাজ, আদিত্যপুর আশ্রমের নন্দ মহারাজ(স্বামী ভুবনেশ্বরানন্দ), শশাঙ্ক মহারাজ প্রমুখরা উপস্থিত ছিলেন । তাছাড়াও ওই মহাত্মার (স্বামী মাধবানন্দ) প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত ছিলেন বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের মহতানন্দ মহারাজ, বিশ্বনাথানন্দ মহারাজ, রায়না তপোবন আশ্রমের নরেন মহারাজ- চাঁদু মহারাজ- চন্দন মহারাজ- রামবাবা! সিঙ্গুর আশ্রম থেকে তপিমার সাথে এসেছিলেন বাবু এবং সৌরভ ব্রহ্মচারী, এছাড়াও আরো অনেক আশ্রম থেকে মহারাজরা এসেছিলেন। মায়েদের মধ্যে এসেছিলেন - বনগ্রাম থেকে ব্রহ্মচারীণী অনিমা- মিনতিমা- সোহাগী মা, কাটোয়ার বারেন্দা আশ্রমের কানন মা (প্রব্যাজিকা শিবপ্রাণা), পুরুলিয়া আশ্রম থেকে শিবানীমা,মালদহ পরমানন্দ মিশনের রীনা মা এবং আরো অনেকেই I

     এছাড়াও স্থানীয় আশ্রমগুলি থেকে অন্য পরম্পরার সাধুসন্তরাও ওই সাধু ভান্ডারায় যোগ দিয়েছিলেন । সর্বোপরি ঐদিন ওখানে উপস্থিত ছিল মাধবানন্দ মহারাজের গুণমুগ্ধ স্থানীয় মানুষজন এবং পরমানন্দ মিশনের দীক্ষিত ভক্তবৃন্দ । স্বামী পরমানন্দ ভক্তবৃন্দের মধ্যে স্বামী মাধবানন্দের গুনগ্রাহী এবং বর্ধমান সদগুরু আশ্রমের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হাওড়ার আবুদা, সুনীলদা ও ভারতীমা ওই অনুষ্ঠানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। মোটের ওপর এইভাবে সমগ্র অনুষ্ঠানটি সকলের উপস্থিতিতে একেবারে বৈদিক যুগের ঋষি আশ্রমের রূপ পরিগ্রহ করেছিল । একজন সাধুব্যক্তির মরণোত্তর সাধু-ভান্ডারা ঠিক যেমনটি হওয়া প্রয়োজন - উক্ত অনুষ্ঠানে তেমনটাই হয়েছিল । সমগ্র অনুষ্ঠানের পরিচালনায় ছিলেন বর্ধমান সদ্গুরু আশ্রমের বর্তমান প্রধান দুই কর্ণধার স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ মহারাজজী এবং প্রব্যাজিকা অমৃতাপ্রাণা মাতা আর তাঁদের সহযোগী ব্রহ্মচারী মহানির্বাণানন্দ মহারাজ । ওনারা খুবই শ্রদ্ধার সাথে সুচারুভাবে সমস্ত কাজ সম্পন্ন করেছেন। তাঁদের শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং প্রেমপূর্ণ আচরণে উপস্থিতজনেরা খুবই খুশি এবং তাঁদের কথায় আমাদের কাছে তাঁরা তাঁদের সন্তুষ্টির মনোভাব ব্যক্ত‌ও করেছিলেন ।

   এইভাবেই একটা অধ্যায়ের সমাপ্ত হোলো । একটা জীবন কিভাবে মহাজীবনে রূপান্তরিত হোতে পারে - সেটা স্বামী মাধবানন্দ মহারাজ তাঁর জীবন দিয়ে আমাদেরকে তথা সমগ্র মানবসমাজকে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন । গুরুমহারাজ ভগবান স্বামী পরমানন্দ তাঁকে তাঁর কাছে টেনে নিলেন - আবার নতুন কোনো কাজের জন্য তাঁকে পাঠাবেন, হয়তো এখন তারই প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছে ।    গুরুমহারাজের কাছে আমরা শুনেছিলাম - মহাজীবনের তথাকথিত ভাবে মুক্তি ঘটে না, যুগপ্রয়োজনে যখনই যেখানে প্রয়োজন হয় সেখানেই তাঁদেরকে নতুন শরীরে পাঠানো হয় নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য। মানবকল্যাণ তথা জীবকল্যাণে উৎসর্গীকৃত জীবন - পুনরায় কোনো না কোনো স্থানে কল্যাণব্রত সাধন করার জন্য আসবেন ই আসবেন - এটা তো সুনিশ্চিত ! আমরা পরমানন্দ ভক্তেরা তাঁর পুনরাগমনের প্রত্যাশায় রইলাম ।। 

        পরিশেষে মাধবানন্দ মহারাজের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনার উল্লেখ করি ! মাধবানন্দ মহারাজ তখন বনগ্রামেই থাকতেন । গুরুমহারাজ ২-৩ মাসের জন্য আশ্রমের বাইরে যাচ্ছেন, সকাল থেকেই সমস্ত ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসীরা ready হয়ে রয়েছে গুরুমহারাজকে একবার প্রণাম করে তাঁকে বিদায় জানাবেন বা শুভ ভ্রমণের শুভেচ্ছা জানাবেন ! মাধবানন্দ মহারাজ তাঁর ঘরে (সাধুভবনের একটা ঘরে থাকতেন, আর ধ্যানজপ করাটা তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস ছিল)স্নান-টান সেরে ধ্যানে বসেছিলেন । আর হয়তো সেদিন ধ্যান খুব জমে গিয়েছিল - তাই ওনার গুরুমহারাজের ২/৩ মাসের জন্য চলে যাওয়ার ব্যাপারটার হুঁশ‌ই ছিল না । যখন উনি ঘর থেকে নিচে নেমেছেন - তখন গুরুমহারাজকে নিয়ে গাড়ি আশ্রম থেকে বেরিয়ে গেছে । ওনাকে দেখেই চরৈবেতি কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী মহারাজেরা হৈ হৈ করে উঠলো - "এতক্ষণ তুমি ছিলে কোথায় ? গুরুজী এই মাত্র চলে গেল ! যদি ওনার সাথে দেখা করতে চাও তো তুমি শিগগির ছুটতে ছুটতে যাও - গ্রামের মুখার্জি বাড়িতে দেখা না করে, মা করুণাময়ীকে প্রণাম না করে উনি কোথাও যান না । যাও - তাড়াতাড়ি গেলে দেখা হয়ে যাবে ।"

       কথাগুলো শুনেই পাগলের মত দৌড়াতে লাগলেন মাধবানন্দ মহারাজ ! মুখার্জি বাড়ীর কালীমন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখলেন ওখান থেকে গাড়িটা সবে স্টার্ট দিয়েছে - কিন্তু দূরে রাস্তার মোড়ে অনেক ভক্তের ভিড় ! গ্রামের মানুষও খবরটা জানে যে, গুরুমহারাজ দীর্ঘদিনের জন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন - তাই তারাও রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করে রয়েছে গুরুজীকে প্রণাম করবে বা কিছু কথা বলবে - এই জন্য ! মাধবানন্দের আবার ছুট্ - এবার successful ! কারণ গুরুমহারাজ সকলকে দেখা দেওয়ার জন্য এবং প্রণাম গ্রহণের জন্য গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন । সুযোগ ঘটলো মাধবানন্দেরও - উনি প্রণাম করে উঠতেই গুরুমহারাজের চোখ পড়েছিল মাধবানন্দের পায়ের দিকে । উনি বললেন - " মাধবানন্দ ! তোমার পায়ের নখ কেটে তো রক্ত পড়ছে - তুমি খেয়াল করো নি ?" মাধবানন্দ সত্যিই খেয়াল করেননি - এতক্ষণ কোনো যন্ত্রণাও অনুভব করেননি ! একমনে, একধ্যানে শুধুমাত্র কিভাবে গুরুমহারাজের সাথে একবার দেখা হবে - তার জন্যে পাগলের মতো ছুটছিলেন ! কখন ইঁটে বা পাথরে হোঁচট লেগে পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের নখটাই উড়ে গেছে - তার খেয়াল নাই ! এই তো সাধকের লক্ষণ  ! এইতো সাধনার ক্রম ! এইতো গুরুপ্রেম ! ভক্তিলাভ - গুরুর কৃপালাভ তো এইরূপ সাধনাতেই হয়--যেটা মাধবানন্দ মহারাজের হয়েছিল।।