শ্রীশ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের “বন্দনা গীতি”(স্বামী তপেশ্বরানন্দ মহারাজ কৃত) নিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম। কিন্তু বেশ কিছুদিন যাবৎ আমরা নতুন লেখা থেকে বিরত ছিলাম। কিছু বাহ্যিক কারণ নিশ্চয়ই ছিল কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আমরা(অর্থাৎ আমি এবং ধাত্রীগ্রামের আনন্দ) পুরোনো লেখাগুলো সংশোধনের কাজ অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি । কিন্তু আজ থেকে আবার নিয়মিত “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”-য় নতুন লেখা শুরু হোলো। আমাদের সাথে সাথেই আমাদের সহকারি লেখক বৃন্দ অর্থাৎ দেবাশীষ কর্মকার, মুকুল বন্দ্যোপাধ্যায়_ এদেরকেও অনুরোধ করা হচ্ছে, যাতে ওরাও পুনরায় নতুন নতুন লেখা শুরু করে দেয়। কামারপুকুরের মৃণাল কান্তি সেন পুনরায় লেখা শুরু করেছে। গুরু মহারাজ সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখার অনুবাদকত্রয় যথাক্রমে অমিতাভ সাহা, সুধীর শর্মা এবং রামপ্রসাদ দাস_ এদেরকেও অনুরোধ করবো —“আবার তোমরা সকলে পুনরায় লেখা শুরু করে দাও! ফুলে-ফলে-সৌরভে-সুবাসে ভরে উঠুক আমাদের সকলের এই প্রিয় পেজ_ “পুরোনো সেই বনোগ্রামের কথা।।”

 এর আগে আমরা পরমানন্দ বন্দনা গীতির _"শুদ্ধং বুদ্ধং মুক্তং শ্রীপরমানন্দম্".... থেকে শুরু করে ..."ঐক্যবদ্ধং কর্ত্তুং বন্দে সগনেশম্" পর্যন্ত আলোচনা করেছিলাম। সেখানে বলার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ যেহেতু এবার বাউল বেশে লীলা করতে মর্ত্যধামে এসেছিলেন _ তাই তিনি এবার জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। স্বামী পরমানন্দের প্রচারিত আদর্শ-- পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষ গ্রহণ করবে, তারই মঙ্গল হবে ! সে-ই উত্তরণের সিঁড়ি বেয়ে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার পথে এগিয়ে আসবে ! তাই গুরু মহারাজ এবার দেশি-বিদেশি সকলকে কাছে টেনে নিয়ে ছিলেন। ভারতবর্ষের সব প্রান্তের মানুষ তাদের ধর্ম, বর্ণ, জাতি ইত্যাদির ভেদ ভুলে তাঁর চরণে এসে হাজির হয়েছিল _

তাঁর অপার্থিব প্রেমের আকর্ষণে ! এটাই ‘বাউল ভাব’ আর এই ভাব’ অবলম্বন বা অনুসরণটাই এই যুগের যুগধর্ম । তাইতো শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এবং গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ সকলেই “বাউল ভাবে” শরীর নিয়ে অবতরণ করেছিলেন।

তবে প্রথমোক্ত দুই শরীরে যেন ভগবান অনেকটা ‘ঢাকা-ঢুকো’, অনেকটা ‘চাপা-চুপো’ কিন্তু এবার অর্থাৎ এই পরমানন্দ শরীরে যেন একেবারে “open to all” ! এবার যেন মেলা ! যেখানে সমস্ত রকমের জিনিস রয়েছে, সমস্ত ধরণের উপকরণ রয়েছে ! সাধুসন্ত-ফকির-মন্দির-মাজার ইত্যাদি যেমন রয়েছে, তেমনি আবার জুয়া এবং মদের ঠেকও রয়েছে। রসগোল্লা-সন্দেশের দোকানও রয়েছে_ আবার চাট-চানাচুর-তেলেভাজার দোকান‌ও রয়েছে ! বাউল-কীর্তন-পুজাপাঠ ইত্যাদি যেমন রয়েছে, তেমনি লোটো-আলকাপের আসর‌ও রয়েছে।

গুরুজীও যেন স্বয়ং একটা মেলা স্বরূপ ! উনি অনায়াস ভঙ্গিমায় বেদ বেদান্ত-পুরাণ-কোরান-বাইবেল-জেন্দাবেস্তা নিয়ে তুমুল আলোচনা করছেন, আবার অন্য সময় উনি আধুনিক জড়বিজ্ঞান-ভূগোল-ইতিহাস-সোসিওলজি-বায়োলজির খুঁটিনাটি আমাদেরকে বোঝাচ্ছেন। আবার ওই একই ব্যক্তি সমবয়সী যুবক ছেলেমেয়েদের নিয়ে রঙ্গ রসিকতাও করছেন ! এ বড়ই রঙ্গের ব্যাপার ! গুরু মহারাজকে যারা দেখলেন না_ তাঁরাও ওনার বিভিন্ন লেখা পড়ে, তাঁর সম্বন্ধে আলোচনা শুনে, তাঁর বিভিন্ন ভক্তদের সাথে কথা বলে _এইটুকু নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, ” বড়ই বিচিত্র চরিত্রের মানুষ(যেহেতু স্থূলশরীর ধারণ করে লীলা করে গেলেন) ছিলেন বাউল ভাবের পূর্ণরূপ স্বামী পরমানন্দ।।

উপক্রমণিকা থাক্ _ এবার ফিরে যাই স্বামী পরমানন্দ বন্দনা গীতির কথায় । গুরু মহারাজকে এই stanza-য় স্বামী তপেশ্বরানন্দ“সগনেশ” বলেছেন। গুরু মহারাজ বলেছিলেন ‘গণেশ’ অর্থাৎ গণ+ঈশ, সমগ্র জনগণের যিনি প্রভু ! আর তাইতো তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, সকলকে আপন করে নিয়েছেন ! আর এইসব তিনি কেন করেছেন ? করেছেন_ তাঁর শরীর ধারনের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য ! গুরুজী ছিলেন সকল মানুষের মিলন মন্দির স্বরূপ পরমানন্দ মিশন” স্থাপনা করে গেলেন ! এই মিশনের দ্বারা শুধু সমকালীন মানুষেরাই নয় _বহু কাল পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ এই মিশনের সেবা পেয়ে ধন্য হবে । তবে মনে রাখতে হবে যে গুরু মহারাজ বলেছিলেন “শুধু অন্নদান-বস্ত্রদান-শিক্ষাদান-স্বাস্থ্য পরিষেবা ইত্যাদি গুলি শ্রেষ্ঠ দান বা প্রকৃত মানব সেবা নয়। প্রকৃত দান বা প্রকৃত সেবা হোলো মানুষকে অধ্যাত্ম পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শিক্ষা ! আর সেই চূড়ান্ত শিক্ষা দেবার প্রাথমিক সোপান হোলো _অন্ন দান, শিক্ষাদান ইত্যাদি !

বন্দনা গীতির এই ছত্রের শেষে তপেশ্বরজী গুরু মহারাজকে "পরমেশ" বলে বন্দনা করেছেন এবং যথারীতি সদগুরুকে 'হর হর মহাদেব' জ্ঞানে প্রণতি জানিয়েছেন। 

এরপরে একেবারে শেষ stanza-য় যা রয়েছে, তা হোলো __"রোগং শোকং পাপং  তাপত্রয়হরণম্ , ত্বং তাপত্রয়হরণম্ । রক্ষয়িতুং সর্বং রক্ষয়িতুং সর্বং _বন্দে আর্তেশম্।। 

ভীতং ত্রস্তং ক্লীবং সর্বান আশ্বস্তবান, স সর্বান আশ্বস্তবান। পরমানন্দং প্রাপ্তুং সচ্চিদানন্দং প্রাপ্তুং বন্দে জ্যোতিরীশম্ ।।

ওঁ হর হর সদগুরো মহাদেব।।
বন্দনা গীতির উপসংহার অংশে তপেশ্বরানন্দ মহারাজ ভগবান পরমানন্দকে ‘আর্তেশ’ বলে বন্দনা করেছেন। কারণ ভগবান সবসময়ই করুনাময় কৃপাময়। তিনি ভক্তের রোগ-শোক-পাপ-তাপ সবকিছুই হরণ করে নেন এবং আর্ত ভক্তদের( ভক্তিশাশ্ত্রে পাঁচ রকম ভক্তের কথা বলা হয়েছে। এরা হোলো যথাক্রমে _আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু, জ্ঞানী ও প্রেমিক।) এই সমস্ত ক্লেশ থেকে মুক্ত করে দেন যাতে তারা নিশ্চিন্ত হয়ে ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন করতে পারে। গুরু মহারাজ বলেছিলেন _’শরীরে বল থাকতে থাকতে অর্থাৎ কৈশোর ও যৌবনকালে ‘সাধন’, আর শরীরের বল কমে গেলে ‘ভজন’! জপ-ধ্যানের ক্ষেত্রেও তাই, জপের চেয়ে ধ্যান শ্রেষ্ঠ কিন্তু শরীরের অপারগতার কারণে দীর্ঘক্ষণ ধ্যান করা সম্ভব না হোলে দীর্ঘসময় ধরে অথবা সবসময় শ্বাসে প্রশ্বাসে জপ করতে হয়।

করুনাময় ভগবান স্বামী পরমানন্দ ভীত-ত্রস্ত-ক্লীব সব ধরণের ভক্তদেরকেই তাঁর অপার্থিব প্রেম দিয়ে আশ্বস্ত করেছেন। এরপর তপেশ্বরানন্দ মহারাজ বড় গুরুজীকে ‘সচ্চিদানন্দ প্রাপ্ত’ -রূপ বা ‘পরমানন্দ প্রাপ্ত’ স্বরূপ বলেছেন এবং ওনাকে “জ্যোতিরীশ” বলে সম্বোধন করেছেন এবং সদগুরুকে ‘হর হর মহাদেব’ জ্ঞানে প্রণতি জানিয়ে বন্দনা গীতি শেষ করেছেন।।
(ক্রমশঃ)