পরম করুনাময় শ্রীশ্রী ভগবান পরমানন্দের কথা, তাঁর মহিমার কথা, তাঁর ভক্তবৃন্দের কথা, স্বামী পরমানন্দের লিখিত গ্রন্থ সমূহের কথা, তাঁর বন্দনা গীতি প্রভৃতি পরমানন্দকেন্দ্রিক নানান বিষয়ের সমাহার এই “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”! অনেকেই আমাকে বলেন বা বলা ভালো অভিযোগ করেন এই বলে যে, ‘এই লেখাগুলোতে তো পরমানন্দ মিশনের অন্যান্য শাখা বা অন্যান্য শাখার মহারাজদেরকে নিয়েও কথা হয়, মিশনের বিভিন্ন ভক্তদেরকে নিয়েও কথা হয়– তাহলে “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”– নামকরণ কেন? নামটা বদলে দিন!’ কিন্তু সুধী পাঠকবৃন্দ ! আপনারাই বলুন পরমানন্দ মিশনের শাখাগুলি কি “পুরোনো বনগ্রাম” ছাড়া ? পরমানন্দ ভক্তমন্ডলী কি “পুরোনো বনগ্রাম” ছাড়া ? তাই কখনো হয়সেটা হওয়া কি সম্ভব !! সমস্ত শাখা আশ্রমগুলি, যেগুলি গুরু মহারাজ স্থুল শরীরে থাকাকালীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল(বা পরবর্তীর গুলিও)সেগুলির মূলে বা কেন্দ্রে তো স্বামী পরমানন্দই রয়েছেন ! আর তাছাড়া সেই সময় যে কোনো শাখা আশ্রমের জায়গা পাওয়া, সেই জমি রেজিস্ট্রি করা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে বনগ্রামের অর্থাৎ গুরুজী, তৃষাণ মহারাজ এবং মুরারী মহারাজের একেবারেই কোনো ভূমিকা ছিল না _এটা হোতেই পারে না।
সেই সময় অর্থাৎ গুরু মহারাজ স্থূল শরীরে থাকাকালীন সময়ে গুরু মহারাজকে বাদ দিয়ে তৃষাণ মহারাজ অথবা মুরারী মহারাজকে বাদ দিয়ে কিছু করার কথা কারো মাথাতেই আসতো না ! সর্বোপরি সেই সময় কোনো স্থানের ভক্তরা আশ্রম প্রতিষ্ঠা বা জায়গা জমির ব্যাপারে কথা বলতে এলে, গুরুমহারাজই তাদেরকে বলতেন –“এই ব্যাপারে তৃষাণের সাথে কথা বলো” অথবা বলতেন, “মুরারীর সাথে কথা বলে ব্যাপারটা ঠিক করে নাও”। আমরা তো এইগুলির জ্যান্ত সাক্ষী ! এইগুলো আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, তারা অস্বীকার করি কি করে বলুন তো!!
তাই বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের শাখা আশ্রমগুলিও বনগ্রামের দ্বারাই সম্পৃক্ত। আশ্রমের যে কোনো মহারাজ তা তিনি বনগ্রাম থেকে যত দূরেই থাকুন না কেন _ তাঁরা এবং তাঁদের শিষ্য-প্রশিষ্যরাও বনগ্রাম আশ্রমেরই লোক । তাদের সবার নাড়ীর যোগ রয়েছে যে বনগ্রামের সাথে !! তাদের সকলের উৎস যে বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন !!
"বনগ্রাম" এই নামটা শুনলেই যে আমাদের রক্তে নাচন লাগে, হৃদয়ে পুলক জাগে, স্মৃতিতে জাগরুক হয়ে ওঠে_ একটাই নাম, একটাই রূপ _"স্বামী পরমানন্দ"।। সেই জন্য গুরুমহারাজকেন্দ্রিক যেকোনো কথা, যে কোনো আলোচনাই _"পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা"! কোনো কোনো সমালোচকদের হয়তো নামকরণ নিয়ে আপত্তি রয়েছে কিন্তু পরমপ্রিয় গুরুজী স্বামী পরমানন্দের প্রতি আমাদের হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে নিঃসৃত ভক্তি-শ্রদ্ধা- ভালবাসা জানানোর একমাত্র জায়গা এই "পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা।"
"পুরোনো সেই গ্রামের কথা" আমাদের ধ্যান-জ্ঞান, আমাদের ভক্তি-ভালবাসা প্রকাশের স্থান, আমাদের প্রাণের আরাম-মনের শান্তি ! আমরা সেই মহান মানুষটির অর্থাৎ স্বামী পরমানন্দের জন্য কি-ই বা করতে পারি বলুন তো _শুধুমাত্র তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি নিবেদন করা ছাড়া ? তাঁকে একটু ভালোবাসার চেষ্টা করা ছাড়া ? তাঁর করুনার কথা স্মরণ করে চোখের জল ফেলা ছাড়া ? তাকে দেওয়ার মত আমাদের কাছে আর এমন কি সম্পদ আছে বলুন তো !! সুতরাং আমরা আর অন্য কোনো পথে হাঁটবো না, আমরা স্বামী পরমানন্দকে নিয়ে পরমানন্দে ফিরে যাবো _"পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা"-য়।
গুরু মহারাজকে প্রথম যখন আমি বনগ্রামে দেখেছিলাম অর্থাৎ ১৯৮৩ সালের ২৫শে ডিসেম্বর, সেই দিন উৎসব ছিল বলে বেশ কিছু মানুষ বনগ্রামে এসে হাজির হয়েছিল কিন্তু এরপরে উৎসব অনুষ্ঠান ছাড়া যখন যেতাম, তখন দেখতাম শনি-রবি বা ছুটির দিনগুলোতে বহিরাগত ভক্ত কিছু আসতো এবং তাদের বেশিরভাগই সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে যেতো। আর week days-গুলোতে দু চারজন বাইরের লোক এবং বনগ্রাম সহ স্থানীয় গ্রামগুলি থেকে আসা আরো দু চারজন লোক সিটিং এ বসে থাকতো । বিকালের দিকে গ্রামের বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা এসে গুরুজীর সামনের জায়গাটা কিছুটা দখল করে রাখতো । এইরকমই ছিল তখনকার গুরুজীর সিটিং-এর চিত্র ! এমনও দেখেছি কোনো কোনো দিন গুরুজী সকালের দিকে একাই সিটিংয়ে বসে রয়েছেন। বাইরের লোক তখনও কেউ এসে পৌঁছায়নি। আর আশ্রমের লোকেরা সচরাচর তখন সকালের দিকে কেউই গুরুজীর সিটিং এ বসতো না।
কিন্তু পরের দিকে যখন ধীরে ধীরে বনগ্রাম আশ্রমের বাহ্যিক রূপের বিকাশ ঘটতে থাকলো, গুরুজীর মহিমার কথা দুরান্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে লাগলো_ ততই দেশি-বিদেশি, স্থানীয় দূর-স্থানীয় মানুষের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।
গুরু মহারাজের দ্বিতীয় কুঠিয়াটি তৈরি হবার পর থেকেই ওখানে ঢোকার ছোটো রাস্তাটার এবং সমগ্র জায়গাটার রূপ প্রদান করতে শুরু করে দিয়েছিলেন স্বামী তপেশ্বরানন্দ মহারাজ। উনি শিল্পী গোছের মানুষ(সন্ন্যাসী )ছিলেন। ওনার রুচিবোধ, শৈল্পিকবোধ খুবই উন্নত ছিল। গুরু মহারাজের ঘরে যাবার ৪/৫ ফুট চওড়া রাস্তাকে দুধারে ডায়াগোনিক্যালি ইঁট সাজিয়ে সাজিয়ে এবং রাস্তা বরাবর ইটের ঘ্যাস্ ,মোরাম ইত্যাদি দিয়ে _ওটার একটা সৌন্দর্য এনেছিলেন উনি। এইটা উনি করেছিলেন যাতে গুরু মহারাজের যাবার পথটা সুগম হয়, ওনার পায়ে কাদা ইত্যাদি না লাগে ! তারপর ওই রাস্তার দুই পাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে উনি সেখানে লাইন করে নানারকম ফুলের গাছ, পাতাবাহার গাছ ইত্যাদি লাগিয়ে দিয়েছিলেন এবং সারাদিনভর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ওই স্থানটির সৌন্দর্যায়নের দিকে সদা সর্বদা লক্ষ্য রাখতেন। আজকে যাঁরা বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে যান, তাঁরা গুরু মহারাজের ঘরের সামনের দিকটা যতোটা সৌন্দর্যপূর্ণ দেখেন, তার প্রাথমিক রূপকার ছিলেন স্বামী তপেশ্বরানন্দ মহারাজ।।
কিন্তু দেখুন আমরা তো মানুষ ! অতি সাধারণ মানুষ ! অজ্ঞান অন্ধকারে ডুবে থাকা মহামূর্খ মানুষ ! তথাকথিত শিক্ষার বড়াই করা হামবড়া মানুষ ! আমাদের ভুলেরও শেষ নেই আর গুরুজীর কাছে শেখারও শেষ নেই। যাইহোক, যে প্রসঙ্গে এতো কথা বলা–সেইটা শেষ করি ! গুরু মহারাজের মহিমা যেমনি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো, তেমনি বনগ্রামে মানুষের ভিড়ও বাড়তে লাগলো । প্রথম যে অনাথ বালক ভবনের কাজ হচ্ছিলো তা দেখার জন্য বা সেই ব্যাপারে কথা বলার জন্য একদিন গুরুজী সকাল সকাল ঘর থেকে বেরিয়ে বটতলার দিকে গেছিলেন। ওখানে তৃষাণ মহারাজ, মুরারী মহারাজ, মদন মহারাজ এবং মিস্ত্রীরা সহ আরো দু একজনের সাথে অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা শেষ করে উনি ওনার ঘরের দিকে(অর্থাৎ সিটিং এ বসার জন্য)ফিরছিলেন । ইতিমধ্যে ততক্ষণে বেশ কিছু সংখ্যায় তথাকথিত সভ্য, শিক্ষিত, ধার্মিক মানুষ (অর্থাৎ আমরা) ওনার শ্রীমুখ থেকে আধ্যাত্মিক কথা শুনবো বলে সিটিং-এ বসে গিয়েছে । কিন্তু গুরু মহারাজ রাস্তা বরাবর সোজা এসে ওনার কুঠিয়ার সামনে আসতেই গেটের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন ! তারপরেই জোরে হাঁক দিলেন “মুরারী-ই-ই-ই !!” মুরারী মহারাজ বটতলা থেকে ওনার সাথে সাথেই আসছিলেন । গুরুজী ডান দিকে ওনার ঘরের দিকে বাঁক নিয়েছেন দেখে মুরারী মহারাজ সোজা অফিস ঘরের দিকে এগিয়েছিলেন। বেশিদূর যান নি, ফলে তৎক্ষণাৎই মুরারী মহারাজ গুরু মহারাজের ডাকে ওইখানে এসে হাজির হোলেন । গুরুজী ওনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন “এই জুতোগুলো রাস্তার সামনেটা থেকে সরিয়ে দে তো ! বাঁপাশে বা ডানপাশে সরিয়ে দে ! মানুষের কান্ডজ্ঞান দ্যাখ্ দেখি, কেমন করে ঢোকার রাস্তা জুড়ে জুতো দিয়ে ব্লক করে দিয়েছে ! এবার আমার ঘরের দিকে যেতে হোলে, যে কোনো মানুষকে এই এতো জুতো মাড়িয়ে মাড়িয়ে যেতে হবে ! মানুষজনের এখনো কাণ্ডজ্ঞানই হয়নি — ব্রহ্মজ্ঞান নিতে চলে এসেছে!”[জুতোগুলো অবশ্য মুরারী মহারাজকে সড়াতে হয় নি, তখন ঐখানেই সম্ভবতঃ স্বপন(বর্তমান স্বপন ব্রহ্মচারী), মুকুল (বর্তমান মুকুল মহারাজ), নগেন এই ধরণের কয়েকজন ছেলে ছোকড়া ওখানে ছিল তারাই পায়ে করে করে জুতোগুলো সরিয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে প্রায়ই দেখতাম ঐ ছেলেগুলোর কেউ না কেউ গুরুজীর ঘরের সামনে রাখা জুতো পায়ে করে করে সরাচ্ছে!]
সেই থেকে আমরা শিখেছিলাম যে, কোনো মন্দিরের সামনে, কোনো ঠাকুর ঘরের সামনে বা যে কোনো মানুষের বাড়ি বা ঘরের অথবা গেটের সামনে জুতো রাখাটা অন্যায়ই শুধু নয় __অপরাধ !! কোনো স্থানে ঢোকার মুখে জুতো খুলে গেটের বাম পাশে বা ডান পাশে রেখে দিতে হয়, তারপর ভিতরে ঢুকতে হয়।।