শ্রী শ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের কথা এবং তাঁর সাথে সম্পর্কিত নানা কথা, নানান ঘটনা বা তাঁর করা আলোচনা, তাঁর স্বহস্তে লিখিত গ্রন্থাদির বিষয়বস্তু ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা করা হচ্ছিলো এই পেজে। গুরু মহারাজের কাছে সবসময়ই নানা ধরনের মানুষ আসতো। এদের মধ্যে বেশিরভাগ ভক্তেরা গুরু মহারাজের কাছে আসতো তাদের নিজেদের বা তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কারো শরীর খারাপের সমস্যা নিয়ে। সেই সময় প্রতিটি মানুষেরই (এমনকি আমাদেরও ছিল)এই বিশ্বাস প্রকট ভাবে ছিল যে, যেমন তেমন করে গুরু মহারাজের কাছে একবার পৌঁছে যেতে পারলেই _শুধু শারীরিক সমস্যা কেন, যে কোনো সমস্যাই নিমেষের মধ্যে একেবারে দূরীভূত হয়ে যাবে।

কিন্তু এমন অনেক মানুষও আসতো যারা শুধুমাত্র গুরুজীর নামটাই কেবল হয়তো একবারের জন্য কারো কাছে শুনেছিল-- কিন্তু তখনও ওনাকে চাক্ষুষও করেনি_ সেই ব্যক্তি তার নিজের অথবা তার প্রিয়জনের কোনো কঠিন ব্যাধি হয়েছে_ যা স্থানীয় ডাক্তারেরা সারাতে পারছে না, তারাও ওই রোগী বা রোগীনীকে নিয়ে গুরু মহারাজের কাছে এসে হাজির হোতো। আর করুণাময় গুরুদেব বেশিরভাগ সময়েই তাদের আন্তরিক আকুতিতে সাড়া দিতেন এবং অত্যাশ্চর্যজনকভাবে তাদের সকলেরই কঠিন কঠিন ব্যাধি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো । তবে অনেক সময় গুরু মহারাজ এইরকম আর্ত-রোগগ্রস্থ ব্যক্তিদেরকে বা তাদের বাড়ির লোকজনদেরকে_রোগীটিকে একজন ভালো ডাক্তার দেখানোর পরামর্শ দিতেন। 

তাদেরকে গুরু মহারাজ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের দাতব্য চিকিৎসালয়ের ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার ডঃ বড়ুয়া অথবা দীপ্তি মহারাজ(স্বামী ভূমানন্দ)-এর কাছে ওষুধ খেতে বলতেন বা আকুপাংচার করাতে বলতেন। অনেক সময় বাঁকুড়ার ধরমপুর আশ্রমের মানিক মহারাজ ও অমূল্য মহারাজ অর্থাৎ যথাক্রমে স্বামী অখন্ডানন্দ ও স্বামী অভয়ানন্দ মহারাজদ্বয়ের কাছ থেকে আয়ুর্বেদিক ওষুধ খেতে বলতেন বা অনেককে সেখানে পাঠিয়ে দিতেন। তখন মানিক মহারাজ এবং অমূল্য মহারাজ একসাথেই বাঁকুড়ার ধরমপুর আশ্রমে থাকতেন । এখন অবশ্য অমূল্য মহারাজ পুরুলিয়ায় অন্য একটি আশ্রমে থেকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করে থাকেন।

কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে গুরু মহারাজের বিধান ছিল — মুরারী মহারাজ(স্বামী নিষ্কামানন্দ)-এর কাছে পাঠিয়ে কিছু যোগাভ্যাস ও প্রাণায়ামের ক্রিয়ার শিক্ষা ! সে যাই হোক, গুরু মহারাজের কাছে আসা ব্যক্তিদের কতো কতো অলৌকিকভাবে রোগ ব্যাধি সারার ঘটনা যে আমরা দেখেছি_ তা হয়তো সব বলাই হয়ে উঠবেনা । তবে “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা”– যাঁরা প্রথম থেকে ধারাবাহিকভাবে follow করে আসছেন_ তাঁদের অনেকেই বহু ঘটনার কথা জেনেই গেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পাগলদের রোগ সারার কথা, সাপের বিষে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেরে ওঠার কথা, জামাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির নারী হওয়া রোধ করার কথা, একটি অল্পবয়সী মেয়ের মাতৃগ্রন্থি দুটি লাউয়ের মত বিশাল হয়ে গিয়েছিল_ বেচারা রোগা শরীরের মেয়েটি ওইরকম বিশালকায় গ্রন্থিদুটির ভারে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতো না ! সব সময় শুয়ে বসে থাকতে বাধ্য হোতো! কোনোরকম জামা পড়তে পারতো না, শুধু একটা কাপড় বা গামছা গায়ে জড়িয়ে রাখতো ! মেয়েটির বাড়ির লোক বহু চিকিৎসা করেও কোনো ফল পায়নি_ সেই হেন মেয়েটির রোগ মুক্তির ঘটনাও ঘটেছিল !!

গুরু মহারাজের কাছে আসার পর দূরারোগ্য চর্মরোগ _যা বহু চিকিৎসা করা সত্ত্বেও সারেনি ! শুধুমাত্র একদিন আশ্রমের প্রসাদ খেয়ে সেই দুরারোগ্য ব্যাধি সেরে গিয়েছিল। যদিও ওই ভদ্রলোকের সেইদিনই প্রথম আশ্রমে আসা এবং সেই দিন‌ই সিটিং এ বসে লোকটি শুনেছিল যে, আশ্রমের অন্ন হোলো ভগবানের প্রসাদ ! এই অন্ন প্রসাদ জ্ঞানে গ্রহণ করলে সর্বব্যাধি বিনাশ হয় ! ব্যস্ — এই বিশ্বাসে সেই দিন‌ই ওই ভদ্রলোক আশ্রমের রান্নাঘরে গিয়ে প্রসাদ জ্ঞানে দুপুরের অন্ন খেয়েছিল । আর তাতেই সে তার বহু দিনের দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ করেছিল ।

রোগ মুক্তির পর ওই লোকটি স্বয়ং একদিন এসে গুরু মহারাজের কাছে এসে তার রোগমুক্তির ঐ সহজ এবং একমাত্র কারণটি বর্ণনাও করে গিয়েছিল।

এই সব উল্লেখযোগ্য ঘটনা উল্লেখ করা ছাড়াও টুকরো টুকরো ভাবে মাকড়ার মাস্টারমশাই-এর কিডনিজনিত রোগ মুক্তির কথা, গঙ্গা বাবুর হার্টের সমস্যা থেকে মুক্তির কথা, আমার শিশু পুত্র হর্ষ-এর মারাত্মক রোগ থেকে মুক্তির কথা _এইরকম আরো অনেক কথা আপনাদের সাথে আগেই শেয়ার করে করা হয়েছে এই পেজে ! কিন্তু এইরকম আরও কতো কথা যে এখনো বলা হয়ে ওঠেনি এবং কতো কথা যে আমাদের অজ্ঞাতই থেকে গেছে _তার হিসাব কি করে পাওয়া যায় বলুন তো!!

আপনারা যদি বনগ্রামের পুরোনো ভক্তদেরকে জনে জনে ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করেন __তাহলে প্রায় প্রত্যেকের কাছ থেকেই আপনারা এই ধরনের কথা অর্থাৎ বাবা ঠাকুরের করুনায় অলৌকিকভাবে রোগ মুক্তির গল্প শুনতে পাবেন।

তবে এমন ঘটনাও প্রচুর রয়েছে যেখানে গুরু মহারাজ অসুস্থ ব্যক্তিটিকে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করার বা হাসপাতালে ভর্তি করার বিধান দিয়েছেন ! ঐ রোগীকে হাসপাতালে বা নার্সিংহোমে ভর্তি করার পরেও রোগীটির সংকটাপন্ন অবস্থা হয়েছে ! সেই সময় গুরু মহারাজের কাছে যাওয়া রোগীদের বেশিরভাগেরই চিকিৎসার ও দেখভালের দায়িত্ব তৃষাণ মহারাজ নিজের কাঁধে নিয়ে নিতেন । অসুস্থ ব্যক্তিটির বাড়ির লোকজন বর্ধমানে বা কলকাতার কোনো হাসপাতাল অথবা নার্সিংহোমে সেই রোগীকে ভর্তি করলেও সঠিক সময়ে তৃষাণ মহারাজ সেখানে হাজির হয়ে যেতেন এবং নানারকমভাবে চেষ্টা-চরিত্র করে রোগীটির ভালো পরিসেবা দেবার ব্যবস্থা করে দিতেন।

আমরা জানা কিছু ঘটনা এমন ঘটেছিল যে, যেখানে রোগীটির হয়তো মরণ বাঁচন অবস্থা ! ডাক্তারেরাও কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি! তখন তৃষাণ মহারাজ, গুরু মহারাজকে ফোন করে সমস্ত ঘটনা জানিয়েছেন এবং গুরু মহারাজ দূর থেকেই তৃষাণ মহারাজকে আশ্বস্ত করে বলেছেন _"এই ব্যাপারে তুমি অতো চিন্তা কোরো না ! কিছুদিনের মধ্যেই ও (অসুস্থ ব্যক্তিটি) ঠিক হয়ে যাবে ! 'মরণ বাঁচনের সীমানা পেরিয়ে'-- কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে ওই রোগীটি সুস্থ হয়ে উঠেছিল __এমন বহু নিদর্শন রয়েছে।

 আমাদের পুরোনো গুরু ভাই-বোনেদের সঙ্গে নিভৃত আলোচনা করলে, এখনো এসব অনেক কথাই আপনারা শুনতে বা জানতে পারবেন।।

ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে যে ৫ ধরনের ভক্তের উল্লেখ রয়েছে, তারা হোলো আর্ত, অর্থার্থী, জিজ্ঞাসু, জ্ঞানী ও প্রেমিক । এদের মধ্যে এতক্ষণ আমরা যে শ্রেণীর কথা বলছিলাম _এরা হোলো আর্ত ভক্ত । এরা শারীরিক বা মানসিক পীড়া নিয়ে প্রথমে মহাপুরুষদের চরণে বা গুরুর সান্নিধ্যে অথবা ঈশ্বরের দরবারে আসে । তারপর ধীরে ধীরে তাদের সমস্যার সমাধান যত হোতে থাকে, ততই এরা ভগবানের ভক্ত হয়ে উঠতে থাকে । এমন বহু মহাত্মা, যোগী, মহাপুরুষের কথা জানা যায়– যারা আর্ত হিসাবেই প্রথমেই গুরুর কাছে এসেছিলেন, পরে সাধন জীবনে প্রবেশ করেন এবং পরম পুরুষার্থ লাভে সামর্থ্য হ’ন।।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন _’যো সো করে সচ্চিদানন্দ সাগরে একবার পড়তে পারলেই হোলো’ ! সুতরাং আর্ত হয়েই না হয় ভগবানের চরণে আশা হোলো ! কিন্তু আমাদের লক্ষ্য যদিড়, ঠিক থাকে– তাহলে সেখান থেকেও জীবনে পূর্ণতা আসতে পারে ! লালন রোগগ্রস্থ অবস্থায় গুরুর চরণে পৌঁছেছিল কিন্তু গুরুর সান্নিধ্যে থেকে সাধন-ভজন করে ঐ অবস্থা থেকে পরবর্তীকালে ‘লালন সাঁই’ হয়েছিলেন এবং ফকিরি পরম্পরার একজন অন্যতম পথিকৃৎ হয়ে আজও মানুষের মনোজগতে অম্লান হয়ে রয়েছেন। নিগমানন্দ সরস্বতী প্রথম যৌবনে স্ত্রী বিয়োগের পর নিদারুণ বিয়োগব্যথা থেকেই তাঁর অধ্যাত্ম জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং লক্ষ্যে অবিচল থেকে অধ্যাত্মজগতের একেবারে চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছেছিলেন।।

সুতরাং যে কোনোভাবেই আমরা আমাদের সাধন জীবনের শুরুটা করি না কেন_ যদি সাধনার continuation থেকে আমরা সরে না আসি, তাহলে ঠিকই আমরা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবোই ! আর এ ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই ‌।।