(জয়দেব মেলায় আমরা গুরুজীর সাথে ঘুরছিলাম)।
গুরু মহারাজকে সেই রাত্রে (জয়দেব মেলায় ঘোরাকালীন) বেশ কিছু কথা জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পেয়েছিলাম ৷ তারমধ্যে কিছু কিছু আগেই আলোচনা করা হয়েছে ৷ আরও যেগুলি বাকী আছে সেগুলির আলোচনা হয়ে যাক । সেই রাত্রে বাউল ও বাউলগানের ইতিহাস এইসব নিয়ে জিজ্ঞাসা করায় উনি ওনার ছোটবেলাকার কথা বলেছিলেন । উনি বললেন – “আমি অনেক ছোট বয়স থেকে এই ধরণের বাউলের আখড়ায় আখড়ায় খুব ঘুরেছি । পরে যে সময়টা হিমালয়ে কেটেছে — তখন এদের সাথে যোগাযোগ ছিল না ৷ কিন্তু যখন আবার বাংলায় ফিরে এলাম , রুরাল ইলেকট্রিফিকেশনের কাজ শুরু করলাম , তখন আবার বিভিন্ন বাউলের আখড়ায় যাওয়া শুরু করে দিয়েছিলাম ।”
আমি গুরুমহারাজের নিজের কন্ঠে প্রথম যে গান শুনেছিলাম _সেটা বাউলগানই ছিল। তাই জিজ্ঞাসা করলাম – “ওখানে অর্থাৎ ঐসব আখড়ায় গিয়ে অাপনি কি শুধুই বাউল গান শুনতে যেতেন অথবা গান শেখার জন্য যেতেন ?” উনি উত্তর দিয়েছিলেন – “না , বাউলদের যে মূল তত্ত্ব অর্থাৎ ‘দেহতত্ত্ব ‘ , ‘ ভান্ডে ব্রহ্মান্ড তত্ত্ব ‘ ইত্যাদির খোঁজ করতাম ৷ আমি ছোটবেলা থেকেই এই তত্ত্বগুলি জানতাম কিন্তু বিভিন্ন বাউল পরম্পরায় এগুলি কতটা আজও কার্য্যকরী রয়েছে – তার খোঁজ নিতাম ৷ অনেক সাধক পরম্পরায় বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনাও করতাম ৷”
আমার জিজ্ঞাসা – “আপনার তখন তো খুব ছোট বয়স_তাহলেও বয়স্ক বাউলরা আপনাকে বা আপনার কথা Accept কোরতো ?” উনি বললেন – ” খুব ছোট বয়স থেকেই আমি কালনার ভবা পাগলার ওখানে যেতাম (কালনা আর গুরু মহারাজের জন্মস্থান বাঘনাপাড়া খুবই কাছাকাছি) , ভবা পাগলার আমার মধ্যে কিছু একটা দর্শন হয়েছিল ! ভবা পাগলা সাধারণ মানুষ ছিল না, প্লাস ওয়ার্ল্ডের মানুষ ছিল ৷ ওর লেখা গানগুলো শুনলেই বুঝতে পারবি কি উপলব্ধিবান পুরুষ ছিলেন! আমি জিজ্ঞাসা করলাম – “প্লাস ওয়ার্ল্ড – মানে ?” উনি বললেন – “এই যে কামনা-বাসনার জগৎ দেখছিস , যেখানে সাধারণ নর-নারী মহামায়ার মায়ায় একদম ফেঁসে গেছে – এটা ‘মাইনাস ওয়ার্ল্ড ‘ । আর কামনা-বাসনা মুক্ত, যোগমায়ার অধীনস্থ যে জগৎ তাই ‘প্লাস ওয়ার্ল্ড’ । সেখান থেকে যারা এই পৃথিবীতে শরীর নেয় — তারা ঈশ্বরের ইচ্ছায় আসে, আর তাদের দ্বারাই প্রকৃতপক্ষে জগতের কিছু না কিছু কল্যাণমূলক কাজ হয়ে থাকে ৷ যাইহোক , ভবা পাগলা যতদিন শরীরে ছিলেন — তত দিন ওখানে বিভিন্ন বাউল সাধকরা আসা-যাওয়া কোরতো । ওরা আমাকেও চিনত – ভবা-ই ওদের কাছে আমার পরিচিতি করিয়ে দিতো ।”
আমার জিজ্ঞাসা – ” বাউলের মর্মকথা বইতে যে নারী-বর্জিত সাধনকারী বাউলদের কথা বলা হয়েছে — ওরা কারা ?” উনি বললেন – “যে কোন পরম্পরার সাধারণ সন্ন্যাসীরাই এই দলে পড়ে যাবে ৷ ‘বাউল’ মানে কি একতারা অথবা আনন্দলহরী বাজিয়ে গান করতেই হবে – এমন ভাবছিস নাকি ? ‘বাউল’ অর্থে ‘বাতুল’ — অর্থাৎ যিনি ঈশ্বরের জন্য পাগল ,আত্নতত্ত্বের জন্য আত্মহারা! যার মুখে ঈশ্বরীয় কথা ভিন্ন আর কোন কথা নাই ! যার দেহতত্ত্বের বোধ হয়েছে – যিনি আত্মতত্ত্বের বোধ করেছেন – তিনিই বিশুদ্ধ বাউল ৷”
সেই রাত্রে আমার খুব সাহস বেড়ে গেছিল , কারণ যে কোন জিজ্ঞাসারই উনি উত্তর দিচ্ছিলেন – একটুও বিরক্ত বোধ করছিলেন না ।তাই আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম _” চৈতন্য চরিতামৃতে মহাপ্রভূকেও ‘বাউল,’ মহাবাউল’_এইসব বলা হয়েছে। তাহলে’ বাউল’কথাটা বহুকাল আগে থেকেই বাংলায় চালু ছিল?”
উনি বললেন _” বৌদ্ধ সহজিয়া পরম্পরা, সহজিয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায় এইগুলি মিলেমিশে বাংলায় ‘বাউল’ পরম্পরার সৃষ্টি করেছিল। পরে সুফি সাধকদের সাধনাও এদের সাথে যুক্ত হয়েছিল। বাউলদের সাধনা অত্যন্ত গুপ্ত! একেবারে অন্তরঙ্গ না হলে এরা কখনোই কারো কাছে সাধন তত্ত্ব disclose করে না ।আর যেটুকু করে _তা ঐ সঙ্গীতের মাধ্যমে!
এই সব কথা বলতে বলতেই _শুনতে পেলাম একটা গান–“চেয়ে দ্যাখো অজয় নদী! বর্ষাকালে তুফান অতি, মতিগতি বোঝা বড় দায়!
পৌষের শেষে দীনহীন বেশে, পড়ে থাকে একপাশে __
হাঁটুজলে কাপড় ভেজে না, ভেজে না।
ধন যৌবনের গৈরব (গৌরব) কইরো না গো__ধন যৈবনের গৈরব কইরো না।”
বলা বাহুল্য, জয়দেব মেলা অজয় নদের তীরেই অবস্থিত। আর ওখানকার বাউলরা চোখের সামনে যা দেখছে তাই নিয়েই জীবনদর্শনের গান রচনা করে যাচ্ছে! বাংলার এই প্রাচীন সাধক পরম্পরাকে আভূমিলুন্ঠিত প্রনাম!!
রাত্রি ১২-৩০ /১-টার সময় তপিমা ক্লান্ত হয়ে পড়ায় গুরুমহারাজ তপিমাকে বিশ্রাম করাতে নিয়ে চলে গেলেন। সেই যে ছেলেটি (আশ্রমের ভক্ত) গুরুমহারাজের সাথে দেখা হতেই মেলার মধ্যে ওর দিদির(!) বাড়িতে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল _সেই ঘরে ওনারা চলে গেলেন। শুধু বলে দিলেন _”ঠিক ভোর 4-30 টেয় চলে আসবি। আমরা বেড়িয়ে যাব।
গুরুমহারাজ চলে যেতেই আমরা কেমন যেন free হয়ে গেলাম। তখন আমাদের টিম leader হয়ে গেল মিহির মহারাজ!
রাত্রি 1টা থেকে 4-30 পর্যন্ত এই সাড়ে তিন ঘন্টা রাত্রিই__ রাত্রি জাগরণের ক্ষেত্রে সবচাইতে কঠিন period! ক্লান্তি, নিদ্রা, অলসতা সবকিছু যেন শরীরকে গ্রাস করতে চায়! কিন্তু সেদিন আমরা ছিলাম অদম্য! বাকী রাতটুকু এই আসরে – সেই আসরে ঘুরে বেড়িয়ে এবং আরো কয়েক কাপ চা খেয়েই কাটিয়ে দিলাম।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক 4-30 – র সময় আমরা গুরুজীর কাছে পৌঁছে গেলাম। উনি এবং তপিমা প্রায় ready-ই ছিলেন। আমরা সবাই মিলে হৈচৈ করছিলাম বলেই বোধহয় পাশের ঘরের লোকটি উঠে এল। লোকটি ছিল পূর্ণদাস বাউল। ও গুরুমহারাজের সাথে আলাপ করার চেষ্টা করলে _দেখলাম গুরুমহারাজ ওকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না (হয়তো বেড়িয়ে যাবার তাড়া থাকার জন্য)।
ব্যাগপত্তর গুছিয়ে সবাই মিলে রওনা দেওয়া গেল বাসস্ট্যান্ডের দিকে।4-30 বাজলেও বাইরে যথেষ্ট অন্ধকার! বিভিন্ন আখড়ায় তখনও কিন্তু বাউল এবং কীর্তন গানের সূর ভেসে আসছিল। অবশ্যই শিল্পীর স্বর এবং সূর কেমন যেন ক্লান্ত _অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছিল।
বাসস্ট্যান্ডে সার সার বাস। গুরুমহারাজ তাঁর সাথীদের(তপিমা, মিহির মহারাজ, কাজল ডাক্তার) নিয়ে যাবেন বক্রেশ্বর। তাই বক্রেশ্বরগামী বাসের কাছে যাওয়া হোল। ফার্স্ট বাস তখনই ছাড়বে_শুনেই গুরুমহারাজ পিছনের সিঁড়ি বেয়ে টপাটপ বাসের ছাদে উঠে পড়লেন, তপিমাকে একটু help করতেই উনিও উঠে গেলেন। পিছন পিছন উঠে গেল মিহির মহারাজ এবং কাজল ডাক্তার।
একটা কথা বলাই হয় নি _গুরুমহারাজ যে ঘরে ছিলেন সেই ঘর থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত গুরুমহারাজের বড় ব্যাগটা (একটা হলুদ মাঝারি ব্যাগ সবসময় গুরুমহারাজের কাঁধেই ছিল-আর এই ব্যাগটি ঘরে রাখা ছিল।) _আমি ঘাড়ে নিয়েছিলাম। তখনই বুঝেছিলাম “গুরুভার” _কি জিনিস!! একটা কাপড় জামা ভর্তি ব্যাগ যে অত ভারী হতে পারে _তা ভাবাই যায় না! ধরে নিন অন্তত ২৫/৩০-কেজি!!
সুন্দর হলুদ- কালো রঙের ব্যাগটা! বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানো পর্যন্ত _তাও ঠিক ছিল, কিন্তু গুরুমহারাজ যখন বাসের মাথায় উঠে গেলেন _তখন ঐ ব্যাগ আমি আর উঁচুতে তুলতেই পারছিলাম না! ধীরুভাই এবং মুকুল সাহায্য করায় আমরা উঁচু করে তুলে ধরলাম আর মিহির মহারাজ এবং কাজল ডাক্তার উপর থেকে টেনে নিল_তবে ঐ গুরুভার ব্যাগ উপরে উঠল!
কিছুক্ষনের মধ্যেই ওনাদের বাস ছেড়ে বেড়িয়ে গেল। আমাদের প্রানপ্রিয় মানুষটি, আমাদের ইষ্ট, পরমধন-পরমাশ্রয় __ঐ কনকনানি ঠান্ডার মধ্যে বাসের মাথায় হু হু হাওয়ায় চলে গেলেন বক্রেশ্বর!
আর আমরা? আমাদের তখন আর জয়দেব মেলা ভালো লাগছিল না _অজয়ের জল মাথায় নিয়ে আমরাও বোলপুরগামী বাস ধরলাম(মকর সংক্রান্তিতে স্নানটা বোধহয় আমরা পরের বছর করেছিলাম _ঐ বছর নয়)গুরুমহারাজের দেখাদেখি আমরাও বাসের ছাদে উঠেছিলাম। বাপরে! কি কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ! কোনক্রমে বোলপুর পৌঁছে কাটোয়াগামী বাস ধরে বাড়ির পথে!
এবার কিন্তু বাসের মধ্যেকার সিটে বসেছিলাম_তাও জানালা বন্ধ করে!
এই ছিল আমাদের প্রথমবার জয়দেব মেলা সফর_যা সুখস্মৃতি হয়ে মনের মনিকোঠায় থেকে গেছিল, আজ আপনাদের সকলের সাথে শেয়ার করলাম।
জয় গুরু পরমানন্দ! জয় গুরু পরমানন্দ! পরমানন্দ জয় জয় ।।(ক্রমশঃ) ।[ পরবর্তী লেখা কোজাগরী পূর্ণিমার পর।]
