গুরু মহারাজ এবং ভাষা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল ৷ কিন্তু এই প্রসঙ্গে বলতেই হয় মানুষের ভাষা বা পশু_পাখীর ভাষা ছাড়াও প্রকৃতির ভাষা এবং মহাপ্রকৃতির ভাষার কথা! মহাজাগতিক ভাষার কথাও একদিন আলোচনা করেছিলেন। প্রকৃতির ভাষা বা বিশ্বপ্রকৃতির ভাষা কেমন তার দু-একটা উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি ৷ একদিন জ্যৈষ্ঠ মাসের মধ্যভাগ বা শেষভাগ – সেদিন প্রচন্ড গুমোট গরম ৷ সিটিং-এ বসে সবারই অস্বস্তি হচ্ছে , কিন্তু গুরু মহারাজ গল্ গল্ করে ঘামছেন। গায়ের গেরুয়া জামাটা প্রায় ভিজেই গেছে বলা যায়। হঠাৎ উনি নগেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন – “হ্যাঁরে , নগেন – মিগের বতর বা বাত কি পড়ে গেছে ?” নগেন সাথে সাথেই বলল “হ্যাঁ বাবা ! এখন তো মিগ চলেছে !” উনি বললেন – “আমার শরীরে এর প্রভাব পড়ছে বলেই বলছি ! এই সময় মৃগশিরা নক্ষত্রের প্রভাব আমাদের পৃথিবীর পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেছে ৷ এই ব্যাপারটিকেই অর্থাৎ পৃথিবীর এই অঞ্চলের উপর মৃগশিরা নক্ষত্রের প্রভাব যতক্ষণ থাকবে – সেই সময়টাকেই চাষীরা ‘মিগের বতর বা বাত’ বলে ৷ এই সময় বৃষ্টিও হয় আবার তীব্র গরমও থাকে ৷ আবহাওয়াবিদরা এটাকে প্রাক্-বর্ষার বৃষ্টিও বলে ৷ এইসময় চাষী লোকেরা বীজ বপন করে থাকে ৷”

যে কোন বিশেষ বিশেষ তিথি নক্ষত্রের প্রভাব পড়ত ওনার শরীরে!
আমরা ক্যালেন্ডার – পাঁজি দেখার কোন প্রয়োজনই বোধ করতাম না – শুধু ওনাকে দেখতাম! বিশেষ বিশেষ তিথি নক্ষত্রে – ওনার শরীর যেন ঝলমল করে উঠত – মুখমন্ডল উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠত! আর উনি সেদিন সিটিং-এ এমন এমন আলোচনা করতেন যার সাথে ঐ তিথির কোন না কোন সম্পর্ক রয়েছে ৷
তবে বিশ্ব প্রকৃতির বিষয় সমূহের ওপর ন’কাকা(বনগ্রামের শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)-র ও খুব ই দখল -একথা গুরুমহারাজের মুখেই কয়েকবার শুনেছি। বিশেষত: আবহাওয়ার খবর, বৃষ্টি হবে অথবা বৃষ্টি বন্ধ করতে হবে -এসব নিয়ে কেউ গুরুমহারাজ কে বললে- অনেক সময় ই উনি ন’কাকার নাম করতেন। বলতেন এব্যাপারে তো ন’কাকা রয়েছে-ও যা করার করবে। ওকেই ধর তোমরা! আমার কাছে এসেছ কেন?”

একবার ফাল্গুন সংক্রান্তির উৎসব। আগের দিনেই গ্রামের মেয়েরা এসে রাশিকৃত তরকারি কাটা সাঙ্গ করে ফেলেছে। এখন যেখানে স্কুল বিল্ডিং(চারতলা) ওখানে গ্রামের স্বপন খুড়ো/বুদি খুড়ো দের জমিতে উনোন তৈরি হয়েছে,মাথায় তালপাতার অস্থায়ী ছাউনি! বিকাল থেকে হালকা হালকা মেঘ সন্ধ্যার সময় এমনি ঘনীভূত হলো যে বোধহয় এখুনি আকাশ ভাঙা বৃষ্টি নামবে। তাহলে কি হবে! সবই তো ভেসে যাবে -পরদিন উৎসব উপলক্ষে ১৫/২০ হাজার (১৯৮৬/৮৭-তে ঐরকম লোক হোত ,এখন তো আশ্রমে প্রায় ৭০/৮০ হাজার বা আরও বেশি লোক হয়) লোকের খাবার কি করে তৈরি হবে? সবাই মিলে গুরুমহারাজের কাছে যাওয়া হলো -উনি এককথায় বলে দিলেন ” এ ব্যাপারে মালিক তো ন’কাকা! ওনাকে ধরো-যা করার উনিই করে দেবেন!” ন’কাকা কে গুরুমহারাজের কথা গুলি নিশ্চয় ই বলা হয়েছিল,বৃষ্টি সামান্য একটু হলেও খুব একটা অসুবিধা হয়নি। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে যখন চতুর্পাশ্বস্থ গ্রামগুলি থেকে মানুষজন আসতে শুরু করলো- তখন তাদের মুখ থেকে শোনা গেলো যে পাশাপাশি স্থানে ভয়ঙ্কর বৃষ্টি হয়েছে।

যাই হোক এবার প্রচলিত ছাড়াও গুরুমহারাজের অন্যান্য ভাবে communication করার দু একটা ঘটনা বলা যাক। প্রথম দিকে যখন উনি কুঁড়ে ঘরটিতে থাকতেন সেইসময় একদিন রাত্রে তিনটি আলোর বলয় ওনার ঘরের সামনে নেমে আসে এবং মানুষের রূপ নিয়ে ওনার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে আবার চলে যান। চলে যাবার সময় তৎকালীন ব্রহ্মচারীদের দু-একজন সেই মহাপুরুষদের শরীর দেখতে না পেলেও ঐ আলোকবলয়গুলি দেখতেও পেয়েছিলো। গুরুমহারাজ পরে বলেছিলেন “ওরা এই পৃথিবীর ভালোমন্দের ভারপ্রাপ্ত মহাপুরুষ! ওরা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করেন। বিশেষ প্রয়োজনে একস্থানে মিলিত হতে যাচ্ছিলেন- যাত্রা পথে আমার সাথে দেখা করে ওঁদের বক্তব্য বলে গেলেন।”

আর একবার উনি বললেন -মহাজাগতিক বিভিন্ন নক্ষত্রমণ্ডল থেকে অনেকসময় তরঙ্গের আকারে নানান বার্ত্তা আসে। এখন এই মুহূর্তে (১৯৮৬/৮৭) একটা বার্ত্তা আসছে-” মহাকাশ থেকে একটা উল্কা পৃথিবী গ্রহের দিকে ধেয়ে আসছে-হে পৃথিবীবাসী! তোমরা সতর্ক হও!” পৃথিবী গ্রহের বিজ্ঞান এখনও এতো উন্নত হয়নি যে, এইসব মহাজাগতিক বার্তা ধরতে পারে। তবে নাসা বা এইধরনের উন্নত মহাকাশ কেন্দ্রে বিভিন্ন অদ্ভুত তরঙ্গ -বার্ত্তা ভেসে আসে যেগুলোর অবশ্য মর্মোদ্ধার করা যায়নি।
আর একবার রাত্রে ন’কাকার বাড়িতে উনি এমন ভগবৎভাব নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করলেন যে একটা অপার্থিব পরিবেশ তৈরী হলো! সেই সময় গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর নিয়ে বলে উঠলেন – ” এই মুহূর্তে আমি যে কথা গুলি বলছি সেগুলি অন্যান্য নক্ষত্র -লোকের গুরুরা তাদের নিজেদের ভাষায় তাদের শিষ্যদের অনুবাদ করে শোনাচ্ছে!” আবার কিছুক্ষণ পরে বললেন -“এই একই সময়ে আমার বিভিন্ন শরীরের লীলা চলছে নক্ষত্রলোকের বিভিন্ন গ্রহাদিতে! এক এক স্থানে এক এক ভাবের লীলা! মধুর ভাবের লীলা ও চলছে কোন স্থানে!”এই রকম কত ভাব এবং কত ভাষার যে লীলা চলত__তা আর কত বলি বলুন দেখি!!! এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি__।

“আপনাকে লোকের কাছে কি বলে তুলে ধরব ? মহাপুরুষ ? মহামানব ? না অবতার ?” – এইরকম একটা জিজ্ঞাসার উত্তরে উনি বলেছিলেন – “তোরা মানুষের কাছে আমার সম্বন্ধে বলার সময় বলবি – ‘ উনি একজন মানুষ , একজন সম্পূর্ণ মানুষ ‘৷” এই যে বললেন “সম্পূর্ণ মানুষ” – এইখানেই সব কিছু হয়ে গেলো ? সম্পূর্ণ মানুষ হতে গেলে যে – সবদিকে , সবব্যাপারে , সববিষয়ে – সম্পূর্ণ হতে হয়, সেইটা আমাদের জানা ছিল না ৷ জানতে পারলাম শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরি মহারাজকে দেখে ! যখন যেটা করছেন সেটাই perfect ! বন্ধু হিসাবে মিশছেন তো দু-একটা খিস্তি ব্যবহার করে কথা বলছেন , হাসি-মজা-গাল-গল্প-গান-বাজনা-নাচ ইত্যাদি করে কাটিয়ে দিচ্ছেন কয়েক ঘন্টা ! বাবা বা মা হিসাবে শাসন করছেন , কিসে সন্তানদের মঙ্গল হবে তার জন্যে সচেষ্ট হচ্ছেন ! যখন তিনি কারও ছেলে অর্থাৎ কোন মহিলাকে “মা” বা “জননী” বলছেন অথবা কোন ব্যক্তিকে “বাবা” বলছেন –তখন তাদের খেয়াল রাখছেন, তীর্থদর্শন করাচ্ছেন (পিতামাতাকে তীর্থদর্শন করানো পুত্রের কর্তব্য ৷), প্রাণসংকটকালে মৃত্যুশয্যায় পাশে অবস্থান করছেন , আবার পরপারের কাণ্ডারী হিসাবে তাকে হাত ধরে পার করে দিচ্ছেন ! গুরু হিসাবে যখন প্রকটিত হচ্ছেন তখন শিষ্যদের শেখাচ্ছেন, শাসন করছেন — তীব্র নিয়ম-নিষ্ঠা-সংযম পালনের বিধান দিচ্ছেন , আবার বলছেন – “করবিই বা কি , রাজধানী এক্সপ্রেসে উঠে পড়েছিস”! অথবা বলছেন – “জাত সাপে যখন কামড়েছে তখন তিন ডাক্”। করুণাময় ভগবান বলে দিচ্ছেন “ত্রিসন্ধ্যা ধ্যান-জপ-আহ্নিক করবি ! তবে তো অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে ! আর নাহলে শম্বুকগতি – আমার ভালোলাগে না !” মন খারাপ হলো ? এরপর কি বলছেন শুনুন — “আচ্ছা ঠিক আছে বেশীক্ষণ না পারিস্ মাত্র ২১মিনিট আজ্ঞাচক্রে অথবা সহস্রারে (যাকে যেখানে মন:সংযোগ করতে উনি বলেছেন) মন:সংযোগ কর তো — দ্যাখ তারপর কি হয় ? কিছু না হলে তারজন্য পরমানন্দ দায়ী থাকবে !” এটা বলার পর আবার বললেন – “অতক্ষণ যদি একটানা মন:সংযোগ না করতে পারিস তাহলে ৭মিনিট কর অথবা ৩মিনিট ! তাতেই দেখবি charging হচ্ছে – তুই স্পষ্ট বুঝতে পারবিv cকুলকুণ্ডলিনীর ক্রিয়া !” করুণাময় আর কত করুণা করবেন ? কিন্তু এখনও ওনার বলা শেষ হয়নি — শেষ হবে নাও কোনদিন !
এরপর উনি বললেন_”আমাকে স্মরণ_মনন করবি, সর্বদা আমাকে স্মরণে রাখবি_আর কিছু করতে হবেনা”।

বন্ধুরা! আর কিছু বলার থাকে!!! পরমানন্দ কথা এখানেই শেষ! এই করুনাময় ভগবানের গুনগান করা ছাড়া, তার নামে অনন্ত জয়ধ্বনি দেওয়া ছাড়া__আমরা সাধারণ ভক্তরা আর কিই বা করতে পারি!!!

ওঁ পরব্রহ্মস্বরূপিনং পরমাত্মস্বরূপকম্।
অজ্ঞানদুঃখহারকম্ জীবদুঃখনিবারকম্ ।
পরমং পরমানন্দং পরমেশ পরাৎপরং
নমামি পরমানন্দং পরাজ্ঞানস্বরূপকম্ ।।
ওঁ শ্রী ভগবতে স্বামী পরমানন্দায় নমো নমঃ।
ওঁ শ্রী ভগবতে স্বামী পরমানন্দায় নমো নমঃ।
ওঁ শ্রী ভগবতে স্বামী পরমানন্দায় নমো নমঃ।।
জয় শ্রী গুরুমহারাজ স্বামী পরমানন্দের জয়। জয় শ্রী গুরুমহারাজ
স্বামী পরমানন্দের জয়।
জয় শ্রী গুরুমহারাজ
স্বামী পরমানন্দের জয়।।