শ্রীকৃষ্ণ

দিগভ্রান্ত দিশেহারা পথিক যখন

হারালো জীবনের সঠিক ঠিকানা,

হতাশাক্লিষ্ট হাহাকার মরমে

চতুর্দিকে ঘনালো জমাট অন্ধকার ;

তখন ভাসল একান্ত সংগোপনে

তোমার আলোয়-ভরা স্মৃতি ।

সুরের বাঁধনে বাজল বাঁশরী

আকুলিত প্রাণে গানে গানে

সংবেদনে মধুর তব কৃষ্ণ নাম।

প্রভু আমার—প্রিয় আমার

তুমি অশ্রু দিয়েছ—তবু আমি কাঁদি না,

ক্ষুদ্র বক্ষ মাঝে চিতাসম জ্বলে

তোমার ভালোবাসার দিব্য আগুন।

ঐ দিব্য পরশ নিভাতে চাই না,

প্রভু তাই আমি কাঁদি না,

এই দিব্য জ্বালায় জ্বলতে দাও,

কেন অশ্রুজলে নিভাতে চাও ?

অচ্যুত

দিগন্তের পরপারে

পৃথিবীকে স্পর্শ করে—

দূর নীহারিকাপুঞ্জের দেশে

কোন্ নিরুদ্দেশে ডুব দেওয়া ।

হারিয়ে যায় ব্যক্তিত্বহীনতায়

নিভৃত মনের গহনে

অস্তাচলের পরপারে

অব্যক্তের অভিব্যঞ্জনা

ভাব-রাগ-তাল-ছন্দ

দোলা দেয় রাগ-অনুরাগে ।

পৃথিবী জল অগ্নি

বায়ু আকাশ চন্দ্র সূর্য

বিবর্তিত গতিশীল কালচক্র

সৃষ্টি ধ্বংসের উন্মত্ত ক্রীড়া

বিস্তৃতির বৈচিত্র্য উন্মাদনা

হিন্দোল অনুলোম বিলোম ।

আবিলতাহীন সীমার পরপারে

অসীমের ইঙ্গিত ইশারা

অন্তরের অন্তস্তলে

গোপনে বাজে সুর-

শয়নে স্বপনে-জাগরণে

বিরামহীন অনবদ্য অকথিত

নির্মম নিষ্ঠুর নিরন্তর।

বাজো বাজো বাজাও—

বেজে চলো নির্মম বিরামহীন

নিষ্ঠুর সর্বনাশা সুর ।

হায় ! অব্যক্ত বেদনামাখানো

রসসিক্ত পরম রসিক শেখর ।

প্রেম

হে প্রভু, তুমি স্তব্ধ কেন ?

আমার মুখ দিয়ে বলো ।

বক্ষ মোর আঘাতে আঘাতে

ক্ষতরূপ ধারণ করেছে,

ওখানে গভীর ব্যথা ।

সামান্য প্রেমস্পর্শে

রক্তবিন্দু ছুঁইয়ে পড়ে।

একটু সহানুভূতির ইশারায়

মুষড়ে ওঠে তীব্র যন্ত্রণা

আর আমায় ভালোবেসোনা তুমি,

আমি শেষ হয়ে যাবো ৷

উঃ কি বিশাল উত্তপ্ত মরুভূমি

প্রাণভেদকারী কাঁটা গাছ

একটুও ছায়া কোথাও নেই ৷

উঃ অসহ্য! আমি আর পারছি না

সহনশক্তি হারিয়ে ফেলবো,

আমি হারিয়ে যাবো

ফুরিয়ে যাবে আমার আমিত্ব

বিস্মৃত হৰে অভিমান

শূন্যতে বিলীন হবে তুচ্ছ আমিত্ব ।

এখন কোথায় যাবো আমি যেখানে তুমি নেই ?

চলো যাই

চলো যাই সেই দেশে

যেখানে মাটির রূপ

পরিবর্তিত হয় প্রতিমাতে

আর রস পরিণত হয় অমৃতে ।

চলো যাই সেই দেশে

যেখানে অগ্নির প্রখর তাপ

রূপান্তরিত হয় উষ্ণ প্রেমে

বায়ুর স্পর্শে বদলে যায় আলিঙ্গনে ।

চলো যাই সেই দেশে

যেখানে আকাশের শব্দ

পরিবর্তিত হয় মন্ত্রে

আর পুর্ণিমা হয় কবিতা ।

চলো যাই সেই দেশে

যেখানে নীরব বিরহ বিজনে

আত্মার আত্মিক স্পন্দনে

বনের বাঁশ বাজে বাঁশরীতে ।

চলো যাই সেই দেশে

যেখানে আকাশের লক্ষ তারা তারা

জ্বলে ওঠে জীবনে জীবনে,

মানুষ বেজে ওঠে রাগ-রাগিণীতে

বাউলিয়া গানে গানে

চলো যাই সেই দেশে ৷

তথাগত বুদ্ধ

গিরিখাত সুউচ্চ শিখর

পুঞ্জ পুঞ্জ উন্মুক্ত মেঘমালা

হে ঝর্ণা, তুমি বেজে ওঠো

লক্ষ জীবনের উচ্ছল তরঙ্গে ।

হে ভগবান—

হে তথাগত—

প্রলম্বিত কাল সমাগত

সস্নেহ করুণায় স্থির হও ।

বিষাদঘন অন্ধকার কাটিয়ে

তোমার সত্য প্রকাশ করো ।

জীবন প্রকোষ্ঠে তৃষ্ণার আবর্তে

অবিশ্রান্ত নির্ঝর স্বপ্ন-প্রবাহ

হতাশ জীবনে নিরবধি ক্রন্দন

হে তথাগত—

শান্তিবারি বর্ষণ করো ।

হঠাৎ সম্মুখে, দৃশ্যপটে

একটা সাগর দৃশ্যমান—

সাগর থেকে উঠে এলো একটা দ্বীপ

আর দেখছি তুমি বসে আছ।

তোমার চতুর্দিকে প্রজ্ঞার প্রভামণ্ডল

ঢেউরা ক্রমশ: আসছে,

তোমার পদস্পর্শ করে ফিরে যাচ্ছে

তুমি শান্ত—অক্লান্ত —অবিকার—অবিচল ।

দিক্ সকল আরাত্রিক পরিক্রমা করছে

আর আকাশ তোমার স্বরূপ হয়ে গেছে

শুধু অপলক দেখছি তোমাকে

বাণীমুখর হতে অবাধ্য হয়েছে আমার ৷

সাগর থেকে একটা সাগর প্রকাশ পাচ্ছে

আর অন্তরীপ থেকে আর একটা অন্তরীপ,

অন্তরীক্ষ হতে অবিশ্রান্ত জ্যোতিঃস্রোত

ফুটে পড়ছে ধরার বুকে ।

তরঙ্গরা এখন অঞ্জলিবদ্ধ দাঁড়িয়ে

মৌন ও শান্ত নীরব প্রার্থনারত

তুমি উঠে আসছো আসন ছেড়ে

আর আমার সন্নিকটে এলে ।

এখন অনুভব করছি

তুমি আলিঙ্গন করছো আমাকে

ভালবাসা-ভরা অসীম আর্তি নিয়ে

চুম্বন করছো বারে বার ।

এটা একটা মুখর প্রেম

অসংখ্য সুখ আমাকে জড়িয়ে ধরেছে

অনুভব করছি—আমি মরে যাচ্ছি

আমার অস্তিত্ব হারিয়ে—ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এখন শান্তি বর্ষণে

আনন্দের বন্যা এলো

অজস্র আনন্দ আর

গভীর শান্তির ভিতর

ক্রমশঃ ডুবে যাচ্ছি ।

হঠাৎ সম্মুখে দৃশ্যপথে

একটা পথ উদ্ভাসিত হলো

আর তুমি চলে যাচ্ছ—

নিঃশব্দে নীরব পদক্ষেপে ।

প্রেমস্নাত জীবনে

একটার পর একটা কপাট খুলে গেল—

আমার মন তোমার কাছে

মুক্তি চাইতে ভুলে গিয়েছিল ।

এই অন্তর—এই আকুতি

তোমাকে অনুসরণ করে

তোমার পদচিহ্ন আঁকা পথে ।

বুদ্ধং জীবিতং

পরিয়ন্তং শরণং গচ্ছামি ।

ধৰ্ম্মং জীবিতং

পরিয়ন্তং শরণং গচ্ছামি ।

সঙ্ঘং জীবিতং

পরিয়ন্তং শরণং গচ্ছামি ৷

কালকূট

নীল—নীল—নীল

অনাদি অন্তহীন শুধু নীল,

ছাদহীন মহাকাশ মহানীল

অনন্ত বিশ্বজুড়ে ময়ূরকণ্ঠী নীল—

কালোর অবয়বে বিস্ফারগর্ভ ঘননীল ।

বজ্র-বিদ্যুতে হানাহানি উন্মাদ অন্বেষা

মেঘে মেঘে কৃষ্ণ ফুলে ফুলে রাধা ।

ঐ নীলিমাতে—

চেয়েছি একটু ব্যাপ্তি—ঘন বিস্তার

একটু গোপন একান্ত নীরবতা ৷

বড়দিন

পৌষের হিমেল হিন্দোলে শিহরণ

খসে খসে পাতাগুলি ঝরে যায়,

পুরানো দিনগুলিও

খসে খসে উড়ে যায় ।

পৃথিবীর মাটিতে বড়দিন এলো,

এলো নতুন বছরের সংকেত—

অভিনন্দন মাখা একমুঠো ফুল নিয়ে

হৃদয়ভরা একরাশ ভালবাসা নিয়ে

প্রেমের ঢেউ তুলে এলো করুণার প্লাবন ।

তুমি এসেছিলে পরিত্রাতা যীশু,

ভালবেসে ক্রুশকাঠ বয়েছিলে

স্বেদাক্ত রক্তাক্ত অশ্রুসজল চোখে

হে প্রভু, হে আমার প্রিয় ।

আমিও বয়ে চলেছি

তোমার স্মৃতিভরা জীবন্ত স্মৃতি ।

যীশু

ঐ যে ক্রুশকাঠ বয়ে চলেছে

অবহেলিত পরিত্যক্ত যীশু,

হায়! তারা কেবলমাত্র

অন্তঃসারশূন্য প্রতিশ্রুতি দিল

কথা রাখল না কেউ

প্রত্যাখ্যান করলো সকলে ।

ঐ যে যন্ত্রণাবিদ্ধ যৌবন

শুধু বঞ্চনার ইতিহাস

অনুভূতিশূন্য মিথ্যা আশ্বাস

যা কেবল অন্ধকারকে

গভীর করে তোলে,

কেউ উচ্চারণ করলো না

শুধু একবার আলোকের মন্ত্র ।

অন্তর টেনে ছিঁড়ে এনে

পৃথিবীর সম্মুখে মেলে ধরেছ

গড়িয়ে পড়ছে রাগ—রক্ত— রস তোমার সর্বাঙ্গে ক্ষত-বিক্ষত । প্রভু আমার ! প্রিয় আমার ! তোমার প্রতিটি পদধ্বনি আমার জীবনমন্দিরে চায় জ্যাক ব্যথার স্থর হয়ে বাজুক ৷

চৈতন্যদেব

সেদিন সে সময়

সাক্ষাৎ প্রেম ধরা দিল ধরায়

যেদিন তুমি এলে আকাশ ছিল উৎসুক

মানবক্লিষ্ট মাটির পৃথিবীতে ।

বাতাস ছিল নিশ্চল

আগুন জ্বলছিল অসীম অনুরাগে

সলিল বইছিল সাগরের প্রতি

আর তোমার পদস্পর্শে

ভূমি হয়েছিল আতুর ৷

পৃথ্বীর অপরিমেয় নিষ্ঠুরতা

আর অকল্পনীয় স্বার্থ

তোমাকে বিদ্ধ করেছিল।

তবুও তুমি —

মানুষকে ভালবেসেছিলে

হ্যাঁ, তুমি ভালবেসেছিলে ॥

শ্রীরামকৃষ্ণ

এই সেই দক্ষিণেশ্বর

অবিশ্রান্ত কাল জুড়ে এখানে

মহাভাব বিরাজমান ।

আমি বটবৃক্ষের নীচে দণ্ডায়মান

আর ভাবছি মাটির সাথে কথা বলি ।

ঐ তোমাটির বুকে কি আঁকা রয়েছে—

হ্যাঁ অবিকল কাললিপি,

লিপির অর্থ এখন স্পষ্ট হচ্ছে ।

জিজ্ঞাসা করছি তোমায় –হে ভূমি,

তোমার মনে আছে কি

গদাধরের প্রথম পদস্পর্শের অনুভূতি ?

আর বনস্পতি তোমাকেও—

একদা যে বসেছিলে তোমার ঘন ছায়ায়

মনে আছে সেই প্রথম আবেশ ?

হে দুর্বাদল, একদা নিশ্চয় বসেছিল

তোমার ঘন সবুজ বুকে

আর প্রজ্ঞার বাণী শুনেছিলে সকলে ?

ও গঙ্গা, তোমার মনে আছে—

সেই অক্লান্ত সত্য আর অবিচল সাধনা ?

হে আকাশ, হে বাতাস—তোমাদেরও ?

ও ভগ্নস্তূপ, তোমার মনে আছে

আস্থা, বিশ্বাস আর করুণা

ঘনীভূত হল এখানে যেদিন—

তখন পৃথিবী শোনাল আমার কানে কানে

অপূর্ব সেই বিধাতার বাণী —

হ্যাঁ, আমি জানি—আমি জানি ।

একদা যেদিন ভগবান হলেন প্রকট

যে নরতনু হল সহজ নির্বেদ,

শুনল জগৎ তাঁর অমৃত বাণী

আমি জানি—আমি জানি—আমি জানি ।

ভাসল আনন্দ’র বন্যায়

জুড়াল জীবনযন্ত্রণা

ডুবল শান্তির অতলতায়

ভুলল সৃষ্টির সংস্কার যত অভিমানী,

হ্যাঁ, আমি জানি—আমি জানি—

আমি জানি ৷৷

বিবেকানন্দ

ঐ মহাটিপীর নীচে মৌনতার পরিবেশে

সৌম্য স্বচ্ছ শুভ্র মূর্তি কে উনি ?

—উনি কোন ঋষি নন ।

উনি দেবতাও নন ।

ঐ অলৌকিক প্রভামণ্ডল

ঐ অপূৰ্ব শান্তি

ঐ ব্যাপ্ত করুণা

আর অকারণ প্রেম

দেবতার জন্য নয়,

সমস্ত স্বর্গেরও অপ্রাপ্য ।

অবিশ্রান্ত কাল ধরে বয়ে চলেছে

বিশ্বের সমাহিত করুণা

সমগ্র সৃষ্টির সঞ্চিত শান্তি

আর ঋষি নিন্দিত প্রজ্ঞা ।

তবুও উনি সমাধিমগ্ন,

প্রজ্ঞার অগম্য প্রান্তরে

দৃঢ় অধিকার চিত্তে

কোন্ বিশদ সমাধানে মগ্ন উনি ?

উনি মৃত নন, জীবিতও নন

উনি জাগ্রত—হ্যাঁ, নিত্য জাগ্ৰত ।

উনি সেই বিবেকানন্দ ।

হে জাগ্রত বিবেক

নিত্য জাগ্রত বিবেকানন্দ

সমাধির অখণ্ড ভূমি থেকে

ফিরে এসো তুমি এ ধরায়

অজস্র ব্যথায় ব্যথিত

অসংখ্য জীবন মাঝে ৷

মানুষকে ভালবেসে

মানুষের মাঝে

মানুষের ভাবে

মানুষের পৃথিবীতে

ফিরে এসো ॥