গুরুমহারাজ:—দূর পাগল ! ঈশ্বর চিন্তা, ভগবৎ চিন্তা—এসব কথা বলার জন্য বলা হয় মাত্র। ঈশ্বরকে তুমি কি করে চিন্তা করবে ? ‘ঈশ্বর’ সম্বন্ধে ধারণা আছে তোমার ? ‘ঈশ্বর’ বলতে তুমি ভাবো কোনো মূর্তি কিংবা ছবি। সেগুলো তো কোনো না কোনো শিল্পীর তৈরী বা আঁকা একটা বিশেষ শিল্প। ওটা কি করে ঈশ্বর হবে ? এটা জেনে রাখবে যে, মর্তের গুরুই ঈশ্বর, গুরুই ভগবান। মহাজনগণ বলেছেন _“অধরাকে ধরবি যদি ধরার চরণ ধর।” যাঁকে ধরা যায় তাঁকেই ধরো, তাঁর চরণে শরণাগত হও। তাহলে গুরুকৃপায় (গুরুর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করলে) তোমার আধ্যাত্মিক উন্নতি হবেই হবে।
এছাড়া মনে মনে তুমি যা কিছু চিন্তা করবে _সেগুলি তো কল্পনা। মনে রেখো, কল্পনা কখনও সত্য হয় না অথবা একথাও বলা যায় যে, সত্যকে কখনোই কল্পনা করা যায় না। তাই গুরুতে সংশয় করতে নাই। শিশু যেমন তার পিতা বা মাতাকে অকপট বিশ্বাস করে, শিষ্যের উচিত গুরুকে তেমনি অকপট বিশ্বাস করা ! ভক্তিশাশ্ত্রে বলা হয়েছে “গুরু ছেড়ে গোবিন্দ ভজে, সে পাপী নরকে মজে”।
তবে এখানে একটা কথা আছে _ কোনো ব্যক্তি কি তার দীক্ষাগুরুকে সবসময় ধরে থাকতে বাধ্য হবে ? না, তা নয়। কারণ তার গুরু যদি কৌল না হ’ন অর্থাৎ প্রকৃত সদগুরু না হ’ন_ তাহলে সে অবশ্যই আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত গুরুর কাছে যেতে পারে। বাউলগণ বলেন _“গুরু করবি শতশত, মন্ত্র করি সার, মনের মত মানুষ পেলে তারে দিবি ভার।” গুরু ‘অনেক’ করা যেতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে যিনি মনের মানুষ, তাঁকেই জীবনের সবকিছুর ‘ভার’ দিতে হয়। কারণ প্রকৃত সদ্গুরু যিনি, তিনিই পারেন শিষ্যের ‘ভার’ গ্রহণ করতে।
শিষ্যের ব্যাকুলতা থাকলে ঢোঁড়া-ঢ্যামনা করতে করতে সাধক এসে পড়ে ঠিক জাতসাপের পাল্লায়। আর অমনি সেই জাতসাপ তাকে দেয় ছুবলে ! তখন আর অব্যাহতি নাই, তাকে বিষক্রিয়ায় ‘নীল’ হতেই হবে। এখানে সদ্গুরু হোলেন সেই জাতসাপ। তাঁর মন্ত্রশক্তির ক্রিয়া জীবনে সংঘটিত হবেই। যদি ইহজীবনে না হয়, পরজীবনেও করিয়ে নেবেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, “জাতসাপে কামড়ালে তিন ডাকের পরেই চুপ”। সদগুরু শিষ্যের ১৪ জন্ম দেখে তবে তাকে মন্ত্র দেন। তাই সব মানুষের একই মন্ত্র হয় না!ব্যক্তি ভিন্ন হোলেই মানুষের সংস্কার ভিন্ন হয় এবং এর ফলে মন্ত্র-ও ভিন্ন হয়। লোক-পরম্পরার গুরুরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে একই সাথে একই মন্ত্র দিয়ে দেয়—এটা এক ধরনের মন্ত্রব্যবসা ! এদের নিজেদেরই ‘পার’ হওয়ার ক্ষমতা নাই _আবার অপরকে ‘পার’ করবে কি করে ?
লোকোত্তর-পরম্পরার গুরুই একমাত্র পারেন অনেককে একসাথে ‘পারে’ নিয়ে যেতে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ‘গাধাবোট’, যা নিজেই শুধু ‘পারে’ যায় না, অনেককিছু মালপত্তর সাথে করে বয়ে নিয়ে যায় ! আবার তার সাথে গোটা কয়েক জেলে ডিঙি বেঁধে দিলে সেগুলোকেও ওপারে নিয়ে চলে যায় । সুতরাং পরপারে নিয়ে যাবার উপযুক্ত
‘গুরু’ সবাই হোতে পারে না। এর জন্য ✓রীমায়ের চাপরাস লাভ করতে হয়। শক্তি প্রকৃতিতেই রয়েছে, প্রকৃত সদগুরুরা সেখান থেকেই সাহায্য এবং শক্তির সরবরাহ পেয়ে থাকেন, ফলে কখনই তাঁদের শক্তির হানি হয় না। সাধারণ মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের নানাবিধ সংস্কার রয়েছে, সেইসব শিষ্যদের ‘ভার’ নেওয়া অতটা সহজ নয়। শিষ্য জীবনে কত উল্টো-পাল্টা কাজ করে। শিষ্য নরকে গেলে গুরুকেও তাকে উদ্ধার করার জন্য নরকে যেতে হয়। তাই সদগুরু স্বয়ং যতজন শিষ্যের ভার নেন, তাদের সকলের মুক্তি না ঘটলে গুরুরও বিদেহ-মুক্তি ঘটে না! এইজন্যই কোনো কঠিন কাজ বোঝাতে ‘গুরুভার’ বা “গুরুদায়িত্ব” কথাটি ব্যবহার হয়।
তোমাদের কাছে ‘ঈশ্বরচিন্তা’ করার অর্থ তো কোনো না কোনো মূর্তিকে চিন্তা করা–তাই না ! তা সেটা গুরুচিন্তাই হোক না ! তবে যাদের সদগুরু লাভ হয়নি তারা হাতের কাছে তেমন কাউকে না পেলে কোনো উন্নত আদর্শস্থানীয়কে গুরু হিসাবে মেনে নিয়ে তাঁর প্রদর্শিত পথকে অনুসরণ করবে। একলব্য দ্রোণাচাৰ্য্যকে এইভাবেই গুরুপদে বরণ করেছিলেন—উৎকর্ষতাও লাভ করেছিলেন জীবনে — করেননি কি ? তবে যেটা একটু আগে বলছিলাম যে, অনেকেই মনে করে আমার মতটাই শ্রেষ্ঠ অথবা আমি যে পথে চলেছি সেই পথটাই সঠিক পথ, অন্যগুলি ভূল—এই ধারণা ঠিক নয়। জেনে রাখবে যে, ‘অনন্ত মত কিন্তু পথ একটা’!
বৃন্দাবনের গোপিনীরা কি কৃষ্ণকে পাবার জন্য ‘ক্রিয়াযোগ’ করেছিল ? করে নি তো _তাই না ! আসল কথা হোলো __ঈশ্বরের প্রতি ব্যাকুলতা ! এই যে এখানে অনেকে এসেছেন– হরিকথা, সৎপ্রসঙ্গ, আলোচনা ধৈর্য সহকারে বসে বসে শুনছে -এটাই কি কম ? অনেকে হয়তো সংসারের অনেক কিজ-কর্ম, দায়-দায়িত্ব ফেলে রেখে আমাকে ভালবাসে বলে চলে এসেছে_ এইটাই তো ব্যাকুলতা! এই যে তোমরা এখানে এসেছো _এতে আমিও ধন্য। কারণ তোমরা এসেছো বলেই তো হরিকথা বলার সুযোগ পাচ্ছি।
সাধুসঙ্গে উভয় তরফেরই উপকার হয়, সাধুসঙ্গে কোনো অপকার হয় না। এখানে এসে কেউ যদি আমার সাথে তর্ক-বিতর্ক বা ঝগড়াও করে তবু তার মঙ্গল হবে। কোনো মহাপুরুষ কখনোই সাধারণ মানুষের কোনো আচরণে বিচলিত হ’ন না, কারণ তাঁরা জানেন যে_ সেই ব্যক্তির প্রকৃতি ওকে ঐরূপ আচরণ করতে বাধ্য করাচ্ছে। কতকগুলি জন্মের একটা summary-রূপ এই জন্মটি। ফলে পূর্ব পূর্ব বিভিন্ন জন্মের সংস্কাররাশি এই জন্মেও বা এই শরীরেও থেকে যায়। পূর্বের কিছু কিছু সংস্কার প্রচ্ছন্ন থাকে এবং কিছু প্রকট হয়। যে সংস্কারগুলি এই জন্মে প্রকট, সেই অনুযায়ীই মানুষের স্বভাব হয়। প্রত্যেক ব্যক্তি স্বভাবে ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু স্বরূপে সে সচ্চিদানন্দস্বরূপ। ভেদ বা বৈচিত্র্য শুধু স্বভাবে, সুতরাং কোনো ব্যক্তিজীবনে ঠিক ঠিক ব্যাকুলতার উদয় হোলে এবং উপযুক্ত সময় উপস্থিত হোলে কোনো না কোনো মহাপুরুষের সঙ্গে ঐ ব্যক্তির সংযোগ ঘটে যায়। এরপর প্রারব্ধ অনুসারে তাঁর সঙ্গে ঐ ব্যক্তির সম্পর্ক স্থাপন হয়, আর এই জন্মে মহাপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হওয়ার পর তার আচরণ, গুরুতে নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা বা শরণাগতির উপর গড়ে উঠে সম্বন্ধ। আর সম্বন্ধ একবার স্থাপন হয়ে গেলে সাধকের আর চিন্তা থাকে না, তখন গুরুই তার সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তখনই সাধক বুঝতে পারেন গুরুই ইষ্ট-ইষ্টই গুরু, অর্থাৎ গুরু তখন ইষ্টে লীন হন। এইভাবেই গুরুমুখী মানুষ ইষ্টমুখী হয়ে পরম সত্যের বোধ করতে পারে।
