প্রিয় আত্মন—
আমরা সহজে যা বলি, ‘সহজ’ বলতে কি তাই বুঝি ? ‘সহজ’ কথাটা খুবই সহজ, কিন্তু সহজ হওয়াটাই খুব কঠিন। মানবসমাজ যুগ-যুগান্তর ধরে বাদগ্রস্ত। এই বাদসমূহ মানবের অন্তরের সহজ ভাবকে সরিয়ে রেখে ভাবের বিকৃতি ঘটিয়েছে—যা সহজ তাকে আরো জটিল করে তুলেছে। অবদমন নীতিতে মানবের ভাববিকৃতি ঘটেছে, তার স্বভাব বিস্তারলাভ না করে সংকীর্ণভাব প্রাপ্ত হয়েছে। সেই কারণে মানব অসহজ হয়ে পড়েছে। সহজভাব হল সমস্ত বাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আত্মবোধে উপনীত হওয়া, কপটতা পরিত্যাগ করে নিষ্কপট হওয়া এবং ভিতর-বার এক করা। অন্তরের ভাবকে দমন করে নাটকীয় আচরণই হল কপটতা। মানবকে অভিনয় ছেড়ে জীবনের পূজারী হতে হবে। তাহলেই আসবে জীবনের পূর্ণতা। মানবকে প্রবঞ্চনা করা এবং অন্তরের কুভাব লুকিয়ে স্বর্গীয় ভাবের অনুকরণ দ্বারা কেউ কোনদিন সম্পূর্ণ তত্ত্বে উপনীত হতে পারে না। সহজভাব মানবের হৃদয়ের সংকীর্ণতা নয়, এটা মানব জীবনের উৎকর্ষতা। মিথ্যার উপর ভিত্তি করে, সভ্যতার জাল রচনা করে সভ্যতার অনুকরণই হল অসভ্যতা। যেমন—ক্রোধী অভিনয় করে অক্রোধের, অসৎ—সততার, হিংসুক—অহিংসুকের, কামুক — ব্রহ্মচারীর, অসাধু—সাধুতার ইত্যাদি ইত্যাদি। আর যে যত কুশলী অভিনেতা, সে তত দুর্বল ও বিভ্রান্ত মানবের কাছ হতে পূজা ও প্রশংসা পেতে থাকে। কিন্তু সহজ মানবঅভিনয়ের পূজা করে না, সে জীবনের পূজা করে এবং জীবনের মধ্যে বোধ করে পরম সত্যের অস্তিত্ব। অভিনয় মায়া মাত্র, শুধু ইন্দ্রজাল। আর সহজ জীবন হল বন্ধনহীন।
প্রিয় আত্মন্, সাধারণত মানব নিয়মের বাইরে যেতে পারে না, যতক্ষণ না তারা সহজ হচ্ছে। একাধারে মানব কিছু নিয়ম ভাঙে, আবার তারা কিছু নিয়ম গড়ে তোলে। অর্থাৎ কোন নিয়মের প্রতিক্রিয়াতেই আবার নতুন এক নিয়ম গড়ে ওঠে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ামূলক কোন নিয়ম বা ব্যবস্হা কোনদিন স্হায়ী হয় না। সংসারে মানব যত নিয়ম দ্বারা মানবসমাজকে বাঁধতে চায়, মানবসমাজ ততই অনিয়মিত ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ নিয়ম করলেই অনিয়ম উপস্হিত হয়। তথাপি অনাদিকাল হতেই মানবসমাজকে নিয়মে বাঁধবার পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু হায় ! কি পরিহাস ! মানবসমাজ কি নিয়মের মধ্যে দিয়েই চলছে ? —না, কখনই নয়। নিয়ম-প্রণেতারা আপন আপন ইচ্ছানুসারে মানবসমাজকে নিয়মের দ্বারা বাঁধতে চেয়েছেন। কিন্তু মানবসমাজ চির বহমান নিয়মের গণ্ডীকে অবহেলা করে ছুটে চলেছে। নিয়মবিদগণ যতই গোঁজামিল দিয়ে বাঁধতে থাকুন না কেন, গতি-বিজ্ঞান আপন গতিতেই ছুটছে, বরং বলা যেতে পারে সমস্ত কিছুকে অগ্রাহ্য করে গতি সতত প্রবহমান। এই অনিয়মের ভিতর একটা নিয়ম অপ্রতিহত অবস্হায় চলছে—সেটা হল সমস্ত নিয়মকে না মেনে নেওয়া বা সেগুলোকে ভেঙে দেওয়া । এই নিয়মই হল মহাকাল বা কালচক্র। নিয়মবিদগণের নিয়ম সেখানে তুচ্ছ, ক্ষণিক প্রতিভাস মাত্র।
প্রিয় আত্মন্—এখন আমরা এই ধারণায় উপস্হিত হলাম যে মানবের এই বাদগ্রস্ততা বা অসহজতা নতুন নয়, পরম্পরাক্রমে এটা মানবের মধ্যে সংক্রামিত। যেমন বাদগ্রস্ত মানুষ এক সময় নতুন কোন বাদের সহায়তায় সমস্তবাদের বিরুদ্ধে বিরোধ করে, তখনই একটি বাদের পরিবর্তে আবার আসে আর একটি বাদ। কিন্তু সেই বাদই যদি আবার এসে পড়ল, তাহলে মানবসমাজ বাদমুক্ত হল কোথায় ? একবার মানব বাদের বিরোধিতা করে বাদ ভাঙছে, আবার নতুন কোন নিয়ম দ্বারা কোন বাদ গড়ে তুলছে। সুতরাং বাদমুক্ত সহজ অবস্হা মানবসমাজে কোন সময়ই আসতে পারছে না।
প্রিয় আত্মন্, বাদের কবলে না পড়ে, বাদ-বিতণ্ডায় বা ঝগড়ায় জীবনকে না জড়িয়ে—যেখানে সমস্ত বাদের পরিসমাপ্তি হয়েছে—সেই পরমবোধের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠো—চরৈবেতি—চরৈবেতি—চরৈবেতি।
প্রিয় আত্মন্—সংসারে মানব যদি কোন প্রশংসা, পায়, তাহলে সে নিজেকে খুব সন্তুষ্ট মনে করতে থাকে। সংসারের আদর, মান ও প্রশংসার জন্য সাধারণ মানব লালায়িত। মানবের মনের অতি গোপনে প্রশংসা পাবার মনোবৃত্তি কাজ করতে থাকে। যদি সে সাধারণ লৌকিক মান, আদর ও প্রশংসার প্রতি উদাসীন হয়, তাহলে দেখা যায় সে আবার অলৌকিক মান ও যশের জন্য উৎকণ্ঠিত ও লালায়িত হয়। যেমন—তাকে সকলে প্রশংসা করুক, পারিতোষিক প্রদান করুক, সে যে একজন বিরাট কিছু তা ভাবুক, তার অনুশাসন সকলে মেনে চলুক ইত্যাদি । এইভাবে সংসারে মানব লৌকিক ও অলৌকিক আদর, মান ও যশের জন্য লালায়িত বা উৎকণ্ঠিত। এগুলির প্রাপ্তিতেই মানব নিজেকে সুখী ও সৌভাগ্যবান মনে করে পুলকিত হয়, আর অপ্রাপ্তিতে দুঃখী ও হতভাগ্য মনে করে শোকগ্রস্ত হয়ে বিলাপ করে। লাভ, যশ ও প্রশংসার সুখে যারা বিহ্বল, তারা ভ্রান্ত, কারণ অলাভ ও অযশ আসলে তারা শোক করতে থাকে। অভিমানিক জাগতে দুঃখ ও কষ্টের সাগরে তারা হাবু-ডুবু খায়। কিন্তু ‘সহজ’—এই সমস্ত হতে দূরে থাকে। যেহেতু সহজমানবকে এইগুলি বিচলিত করতে পারে না।
প্রিয় আত্মন্—মানব লৌকিক বা অলৌকিক কিছুই নয় । মানব আনন্দস্বরূপ। মানব অমৃতস্বরূপ। মানব সহজ। সাধারণত লৌকিক জগৎ যশের পূজা করে থাকে, যেখানে ক্ষুদ্র স্বার্থবুদ্ধি জড়িয়ে থাকে। কিন্তু যেখানে স্বার্থহানির সম্ভাবনা, সেখানে সে অপমান ও অংশ বোধ করে। এইরূপ মানব মান, অপমান, যশ,অপযশ, পুরস্কার, তিরস্কার এই সমস্ত অভিমানী মনের জগতে আবদ্ধ। কি দুর্ভাগ্য । সন্তোষ ও অসন্তোষের আত্ম-প্রবঞ্চনায় সাধারণ মানব সদা মগ্ন। আর ঐ সন্তোষ ও অসন্তোষের অভিমানে সুড়সুড়ি দিয়ে কিছু দুষ্ট লোক আপন স্বার্থবুদ্ধি চরিতার্থ করবার নিমিত্তে ঐ মন-সংবেদনকে কাজে লাগাচ্ছে। মানবের ভ্রমকে আধার করে তারা দূর-উপযোগ করছে। পারিতোষিক, প্রলোভন এবং দণ্ডভোগের ভয়ে আবিষ্ট সাধারণ মানবকুল। পুরস্কার ও দণ্ড এই দুই মন-সংবেদন মানবকে অসহজ ও বিকৃত করছে। পুরস্কারের লোভে লালায়িত হয়ে মানব অনেক অমানবিক কর্মে লিপ্ত হয় আর দণ্ডের ভয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে নিজ কর্মশক্তি ও সহজতা হারিয়ে ফেলে। কল্পনাবিষ্ট মানব কল্পিত ঈপ্সিত বিষয় প্রাপ্তির জন্য, কিছু বিশেষত্ব ও যশলাভের জন্য নিজের আকাঙ্ক্ষাকে এতই প্রবল করে তোলে যে, তার জন্য সংসারে কত সংঘর্ষ, দুঃখ ও অশান্তির উৎপত্তি হয়। কিন্তু সাধারণ মানব অবগত নয় তার স্বরূপ সম্বন্ধে। যতক্ষণ না সহজ আত্মবোধ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানবের এই ভ্রান্তি দূরীভূত হয় না। প্রিয় আত্মন্— মানবের উদ্দেশ্য হয়ে উঠুক কল্যাণ, সৌহার্দ্য ও শান্তি। মানবের আদর্শ হয়ে উঠুক—অভেদ, প্রেম ও স্হায়িত্ব।
প্রিয় আত্মন্, মানব যদি মতান্তর গ্রহণ করতে থাকে, তাহলে কি তার সত্যের বোধ হবে ? না তা হয় না। কারণ মতবাদের বন্ধনে সত্য আবদ্ধ নয়। সুতরাং মত পরিবর্তন করলে সত্যের অনুভব কি করে হবে ? প্রকৃত সত্য বা পরমেশ্বর হল সাক্ষাৎ বোধ। মতান্তর হল কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা ক্রিয়া-পদ্ধতিকে গ্রহণ করা বা স্বীকার করা। কিন্তু এই মতান্তর গ্রহণে পরমেশ্বর বা সত্যের কি অনুভব হয় ? না, তা কখনই সম্ভব নয়। কারণ মতান্তরগ্রহণ কেবলমাত্র এক মানসিক সান্ত্বনা ছাড়া আর কি ! তা কেবল এক মত হতে আর এক মতের বন্ধনে আটকে পড়া। বাস্তবিক এতে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু মানব প্রলোভনের কবলে পড়ে মত-মতান্তর নিয়ে বিবাদ করে। যতক্ষণ না মানব সমস্ত মতবাদের উপরে উঠবে, সহজ না হবে, ততক্ষণ পরম সত্যের সাক্ষাৎ করা খুবই দুরূহ। সাধারণত মানব মত ও পথের বন্ধনে আটকে যায়, লক্ষ্যবস্তুতে উপনীত হতে পারে না। বাস্তবিক কোন ক্রিয়াপদ্ধতি দ্বারা সত্যের অনুভব হয় কি ? কোন যান্ত্রিক পদ্ধতি দ্বারা কি সত্য মূর্ত হয় ? সত্য কি এমন কিছু পদার্থ যা মনের দ্বারা নির্মাণ করতে পারা যায় ? না, কোন ক্রিয়া পদ্ধতি, কোন যান্ত্রিক পদ্ধতি বা মনের দ্বারা সত্য অনুভূত বা নির্মিত হয় না। মনের দ্বারা পরম সত্য জ্ঞাতব্য নয়। মনের দ্বারা যা নির্মিত, তা পরিণামী ও কল্পিত। কিন্তু কল্পনা নিশ্চয় সত্য নয়। যিনি সমস্ত বন্ধনমুক্ত, মুক্তবিবেক ও মুক্তমনের অধিকারী—তিনিই সহজ। আর সহজ অবস্হাতেই পরম সত্যের বোধে বোধ হয়। পরম সত্য বা পরমতত্ব অবিভক্ত অর্থাৎ এদের মধ্যে কোন ভেদ নেই। তা অভেদ এবং অদ্বৈত। ভ্রান্তিবশত ভেদকল্পনা হয়ে থাকে এবং তাই হল অসহজতার হেতু।
প্রিয় আত্মন্—বাঁচার তাগিদ ও পরিপূর্ণতা লাভের প্রবণতা হল জীবনের সহজ ধর্ম। জীবনকে বাদ দিয়ে ধর্ম নয়। মানব ধর্মের নামে গোঁড়ামিতে ভরা একটা সম্প্রদায় গড়ে তুলছে। আর সকলকে বলছে—এটাই ধর্মাচার। কিন্তু ধর্মজীবনমুখী, জীবনবিরোধী কখনই নয়। মানবকে জীবনমুখী হতে হবে। জীবনবিরোধী ভাবগুলি কাটিয়ে উঠতে হবে। গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের আঁস্তাকুড় এবং অজ্ঞানঘন অন্ধকার হতে জীবনকে মুক্ত করতে হবে এবং মনকে সর্বপ্রকারে সংস্কারমুক্ত করতে হবে দীপ্ত জীবনমুখী কর্মশালায়। জীবনমুখী চিন্তাস্রোত প্রবাহিত হোক দিব্যপ্রেমের পথে। প্রবল কর্মস্রোত প্রকট হতে থাকুক, মানুষের জন্য মানুষ সেবাব্রতী হয়ে উঠুক। মানব বিভেদের প্রাচীর ভেঙে দিয়ে পরম প্রেমের সাগরে অবগাহন করতে থাকুক। আর ঐ পরমতত্ত্বে তন্ময় হয়ে আপন অস্তিত্বকে বোধ করুক—এটাই হল সহজতা বা পরমানন্দ স্হিতি। ক্ষুদ্র হৃদয়দুর্বলতা পরিত্যাগ করে এবং ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিত্যাগ করে নিজেকে উন্মুক্ত করতে হবে।
প্রিয় আত্মন্—সংকীর্ণতা ত্যাগ করে মুক্ত হও। স্বার্থাভিসন্ধিতে নিজেকে বিস্মৃত হয়ো না। আপন বিবেককে আবিষ্কার কর—আপনাকে ভুলে থেকো না।
সমস্ত চেতন ও অচেতন পদার্থ, যেমন—পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, চন্দ্র ও আদিত্য— সমস্ত বিশ্বই অন্তর্যামী পরমাত্মার প্রকাশ। সমস্ত কিছুতেই তিনি ওতপ্রোত। সর্বভূতে তিনিই বিরাজমান। সুতরাং সকলকে ভালবাসতে থাক, তাহলে সমস্ত কুসংস্কার দূরীভূত হবে। মানবের উপাস্য হলেন সচ্চিদানন্দ। সেই সচ্চিদানন্দ সর্বভূতেই বিরাজমান। উপাসনার মধ্য দিয়ে উপাস্যের ভাবগুলি উপাসকের মধ্যে আবির্ভূত হতে থাকে। এই হল উপাসনার রহস্য। সর্বত্র তাঁর প্রকাশ। সর্বত্রই তিনি—এই অনুভূতিসম্পন্ন সহজ মানব সংসারে বিরল। এঁদের কদাচিৎ দর্শনলাভ হলে জীবন ধন্য হয়ে যায়। সংসারে যিনি আসক্তি ও বিরক্তিশূন্য হয়ে সচ্চিদানন্দরূপ আপন স্বরূপকে জেনেছেন বাবোধ করেছেন—তিনিই সহজ বা জীবনমুক্ত । এরূপ সহজতাসম্পন্ন সদগুরু লাভ হলে সহজভাবেই শিষ্যের পুরুষার্থের প্রকাশ হয়। সদগুরু শিষ্যকে আত্মজ্ঞানের উপদেশ প্রদান করেন তার চিত্তের সংশয় দূর করবার নিমিত্ত। মানবের চিত্ত সংশয় যখন ছিন্ন হয়, অন্তঃকরণের শঙ্কা যখন দূরীভূত হয়— মানব তখনই বন্ধন ও মুক্তির উর্ধ্বে উঠে যায়। সে তখন আত্মভাবে সমাহিত হয় বা আত্ম-সাক্ষাৎকার লাভ করে। আর আত্মবোধে উপনীত হওয়াই সহজ মুক্তি ।
প্রিয় আত্মন্—মুক্তি বা মোক্ষ নামক কথাটি জগতে প্রচারিত আছে, কিন্তু এটা নতুন কিছু প্রাপ্তি নয়—যা পূর্ব হতে বিদ্যমান বা নিত্যস্বরূপ অর্থাৎ পূর্ণতা যেখানে পূর্ব হতেই বিদ্যমান সেই পূর্ণতাকে শুধু বোধে বোধ করা মাত্র। মানব আপন পুরুষার্থ দ্বারা মুক্ত হয়, কেউ তাকে মুক্তি দিতে পারে না আর ঐ পুরুষার্থই হল প্রেম। মানব মুক্ত হয় আপন প্রেমরূপ পুরুষার্থ দ্বারা। আনন্দময় সহজ সদ্গুরু লাভ হলে সমস্ত ভেদের নিরসন ঘটে এবং মানব দ্বৈতাদ্বৈতবাদ মুক্ত হয়ে পরমতত্ত্বে অবস্হিত হয় বা আত্ম-সাক্ষাৎকার লাভ করে স্ব-স্বরূপে সমাহিত হয়।
‘সহজই আত্মা
সহজই সাই
সাঁই-এর ঊর্ধ্বে
আর কিছু নাই।’
প্রিয় আত্মন্—যা সহজ, তা সহজভাবে ব্যক্ত করাই সহজতা। বৃদ্ধা তর্কের দ্বারা বিষয়কে জটিল করাই হল অসহজতা। সমাজে প্রথম হতেই কিছু সংখ্যক ব্যক্তি কিছু পারিভাষিক শব্দ দ্বারা ভাবিত থাকেন আর তাভাবতে ভাবতেই তাঁরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ভাব-প্রবণতা হেতু যাঁর যত বেশী কল্পনা, সমাজে তিনি তত বেশী খ্যাতিলাভ করেন। কিন্তু কল্পনা প্রবণতা হেতু তাঁদের ভগবদভাব ক্ষীণ হয়ে পড়ে। অসহজতা তাঁদের গ্রাস করে, অবিদ্যারূপ অহংকারবোধ আসে এবং তাঁরা গোঁড়া ধর্মোন্মাদে পরিণত হন। ঐ সমস্ত ব্যক্তি আপনার কল্পনা প্রসূত দুর্বল ভাবনারাশিকে শব্দজালে পরিণত করেন এবং সেই বিবেক বিচারহীন শুষ্ক শব্দমালাকে শাস্ত্র বা অনুশাসন নামে অভিহিত করতে থাকেন। পণ্ডিজ্ঞাণ শাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে ভগবত্তত্ত্ব প্রমাণ করতে চান, কিন্তু সহজ সাধক সাক্ষাৎ অনুভূতির উপর ভিত্তি করে তা প্রমাণ করেন।
হে পরমেশ্বর ! তোমার কথা সহজ অনুভবের ভিত্তিতে, কিন্তু অসহজ, কষ্টকল্পনা দ্বারা জটিল কথা বলে তর্কের বেড়াজাল যারা রচনা করে, তারা শাস্ত্রের ভারবাহী অনুকারকমাত্র। “সহজ” ধর্মের জীবন্ত উদ্ভব—পরম বোধের জীবন্ত বিগ্রহ—সাক্ষাৎ ধর্মস্বরূপ।
প্রিয় আত্মন্, ব্রহ্মানন্দ বা সহজ আনন্দ অনির্বচনীয়, ভাষায় তাকে প্রকাশ করা যায় না। একমাত্র পরম অনুভূতি সত্য। এই প্রসঙ্গে মানবের মুখের ভাষার আবির্ভাব নিয়ে আমরা কিছু আলোচনা করব। মানবের মননশক্তিই ক্রম অভিব্যক্তির ফলে ভাষায় রূপগ্রহণ করেছে। ভাব-প্রকাশের প্রথম পদক্ষেপ আকার ও ইঙ্গিত এবং অর্থবাহী নানা ধরনের ধ্বনি বা অস্ফুট আওয়াজ। প্রকৃতির তাড়নায় তা ক্রমশ বিচিত্র ধ্বনিরূপে প্রকাশ পেতে থাকে মানবের মুখে। বাকযন্ত্রের অনুশীলন, অবিরত চলতে লাগল, কালক্রমে অন্তরের বোধপ্রাপ্ত সত্য ও মননজাত ভাব স্পষ্টরূপে সুব্যক্ত ভাষার দ্বারা প্রকাশ হতে লাগল। মানবের মুখ-নিঃসৃত ধ্বনিই ভাষা নামে পরিণতি লাভ করল। সেই ভাষা বিভিন্ন চিহ্নের দ্বারা অঙ্কিত হয়ে অক্ষর বা লিপিতে রূপলাভ করে। এই ভাষা ও লিপিকে কেন্দ্র করে ভাষাবিজ্ঞান প্রকাশিত হল। এখন সেই অপরিশুদ্ধি ভাষাই উন্নত ভাষায় পরিণত হয়েছে। ভাষার এই ক্রমবিকাশ আবহমানকাল ধরে চলছে। যতদিন মানবের জীবনস্রোত বইতে থাকবে, ততদিন ভাষার স্রোত অবিরাম গতিতে প্রবাহিত হতে থাকবে। প্রাকবৈদিক আর্যভাষা ভারতবর্ষের সাধারণের প্রচলিত ভাষা। পাণিনির দ্বারা সংস্কারলাভ করে এই ভাষার নাম হল সংস্কৃত। এইভাবে প্রাচীন আর্যভাষা সংস্কারপ্রাপ্ত হয়ে সংস্কৃত নাম ধারণ করল। ভারতীয়গণ আবার ব্যাকরণের কঠিন বেষ্টনে সংস্কৃত ভাষাকে বেঁধে ফেলল। কিন্তু ভাষার প্রবাহ রোধ হল না। অবিরাম গতিতে প্রবাহিত হতে লাগল এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা ও উপভাষা সৃষ্টি হল। এমত অবস্হায় মূল সংস্কৃত ভাষা ব্যাকরণের বেষ্টনী ভেঙ্গে আর প্রবাহিত হতে পারল না আদি 2ND ES IN সংস্কৃত ভাষারূপে রয়ে গেল। আবার আর একদিকে সংস্কৃত ভাষাই কিছু রূপান্তরিত হয়ে কথ্য ভাষার এক নতুন স্রোতরূপে জন-জীবনের মধ্যে প্রবাহিত হতে লাগল। সুতরাং মানবের ভাষা থেমে থাকে না, তার গতি আছে, ছন্দ আছে এবং রূপান্তর আছে।
তাই ভাষা ব্রহ্মানন্দ বা সহজ আনন্দকে ব্যক্ত করতে পারে না। শুধুমাত্র আভাস দেয়—ইঙ্গিত দেয়। ঐ তত্ব বাক্যের অতীত। আত্মচৈতন্যেই পরমাত্মার বোধ হয়। আত্মাই আত্মাকে বোধ করে— এই হল বোধে বোধ এবং জীবনবোধ।
