প্রশ্ন—বর্তমান মতের বাউলগণের সাধনা ও তাঁদের মতামত সম্পর্কে আমার কিছু জানবার বিশেষ আগ্রহ হচ্ছে আপনি অনুগ্রহ করে ঐ বিষয়ে বলবেন কি ?
উত্তর – প্রিয় আত্মন্ !
আমি বর্তমান বাউল সাধকদের সাধনা ও তাঁদের মতামত সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে তোমায় বলছি।
যে সমস্ত বর্তমান সাধক প্রকৃতি বিনা সাধনা করেন, তাঁরা বলেন— সমস্ত রসের ভিতর শৃঙ্গার রসই শ্রেষ্ঠ এবং প্রকৃতি হল শৃঙ্গের রসের আধার । শৃঙ্গার রসমাধুর্যের মধ্যে প্রকৃতির মূল সত্তাটি নিহিত রয়েছে এবং লীলাবিলাস বা আনন্দ প্রকৃতি আশ্রয় করেই হয়ে থাকে। সেইহেতু প্রকৃতি একাধারে জননী এবং রমণী।
সুতরাং প্রকৃতিতে মাতৃভাব আরোপ করেও ঠিক ঐ একইভাবে চরম অবস্থায় উপনীত হওয়া যায় এবং ব্যভিচারেরও কোন সম্ভাবনা থাকে না ৷ প্রিয় আত্মন,
অধিকারী বিশেষে সাধক মাতৃভাবে বিভোর হয়ে যৌনপ্রীতি বর্জিত হয়ে অতি সহজেই ঊর্ধ্ব রেতা অবস্থা লাভ করতে পারেন। আর তা ঐ সাধকদের নিকট কোন সমস্যাই নয় । এই প্রসঙ্গে একটা পদ মনে পড়েছে, পদটি শোন —তাহলেই বুঝতে পারবে—
‘জননী-মন্দিরে প্রবেশি দেখিনু
কহিতে না মানি বাধা,
শ্যামা হল শ্যাম চরণের শিব
উঠিয়া হইল রাধা।’
সুতরাং এখন নিশ্চয় বুঝতে পারলে যে, বাৎসল্য রস এবং মধুর রস মুখ্যতঃ একই । বাৎসল্য রসে সামান্য যৌনপ্রীতি যোগ করলেই তা মধুররসে পরিণত হয় ।
বাউলগণ বলেন ঊর্ধ্ব’ ৱেতা হতে হলে যে প্রকৃতি-সঙ্গ করতে হবে এমন কোন কারণ নেই। প্রকৃতির সঙ্গ বিনা অনায়াসে ঐ অবস্থায় উপনীত হওয়া সম্ভব ।
কিন্তু সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যা হল রসের পূর্ণ কলসী হতে রস ঢেলে অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে যৌনপ্রীতি বর্জন করে কেমন করে সহজে ঐ রস আস্বাদন করা যায়! সাধকের জীবনে এটা অপেক্ষা বড় সমস্যা আর দ্বিতীয় নেই। উপমাস্বরূপ বলা যেতে পারে—মাকড়সার জালের উপর দিয়ে একটা প্রমত্ত ঘোড়াকে ছুটিয়ে নিয়ে চলার মতো ভয়ঙ্কর অবস্থা অথবা একটা সূতার উপর দিয়ে একটা মত্ত হস্তীকে নিয়ে যাবার মতো বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি। এই সমস্যা বা বিপদ যে কোন প্রকার সাধকের পক্ষেই হওয়া সম্ভব—তা তিনি প্রকৃতি নিয়েই সাধনা করুন বা প্রকৃতি বর্জিত হয়ে এককভাবেই সাধনা করুন। উভয়ের পক্ষেই এটা বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি।
সেইজন্য বাউলগণ বলেন—রসিক ভিন্ন এই শৃঙ্গার রসের অপরোক্ষ অনুভব করার সামর্থ্য অন্য কারও নেই ।
সহজিয়া বৈষ্ণবগণ শৃঙ্গার রসকে আর্ট প্রকারে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করেছেন, এগুলি হল যথাক্রমে— দর্শন, স্পর্শন, কেলি, কীর্তন, গুহ্যভাষণ, সংকল্প, আসক্তি ( তীব্র মিলনাকাঙ্ক্ষা ) ও মিলন ( সম্ভোগ )।
যাঁরা প্রকৃতি নিয়ে সাধনা করেন, তাঁরা এইগুলি স্থূলভাবে গ্রহণ করে থাকেন এবং যাঁরা প্রকৃতি বর্জিত হয়ে এককভাবে সাধনা করেন, তাঁরা এগুলি অন্তর ভাবের পরিচর্যার দ্বারা পরিপুষ্টি বিধান করে থাকেন। পরিপূর্ণ অবস্থায় অষ্টপ্রহর শৃঙ্গার রসমাধুর্যে নিমজ্জিত থাকেন। বৈষ্ণবগণ বলেন—শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু রায় রামানন্দের সহিত এইরূপ ভাবেতে শৃঙ্গার রস অনুভব করতেন। এই শৃঙ্গার রস হল অনাবিল, অফুরন্ত এবং অনন্ত বৈচিত্র্যের উৎসে ভরা। আর এই রসের সন্ধান যিনি পেয়েছেন তিনি হলেন রসিক । তিনি তখন দেখতে পান—সমস্ত চরাচর—বিশ্বের ভিতরে এবং বাইরে ঐ শৃঙ্গার রসের মেলা বসেছে এবং সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতিতে ঐ অফুরন্ত মাধুর্যরস অনাবিল উল্লাসে স্ফূর্তিপ্রাপ্ত হচ্ছে। বিশ্বের যাবতীয় শক্তি, সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য ও সামর্থ্যের ভিতর সর্বোপরি সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়ে ঐ মাধুর্যরস বিচিত্ররূপে স্ফুরিত হচ্ছে। আর এটাই হল সাক্ষাৎ শৃঙ্গার রসমূর্তিস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ এবং হ্লাদিনী শক্তি মহাভাবস্বরূপিণী শ্রীরাধার বৈচিত্র্যময় লীলা ।
বৈষ্ণবশাস্ত্রমতে ভক্তি সাধনায় দুটি ব্যবস্থা স্বীকৃত আছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে বৈধী এবং অপরটি অবৈধী। অর্থাৎ একটি শাস্ত্ৰবিধানসম্মত বিধি মেনে চলে এবং অপরটি ভাবাশ্রিত বা রাগানুগা । সহজিয়া বাউলগণ তাঁদের সাধনা পদ্ধতিকে রাগের ভজন বলে থাকেন। তাঁরা কোন প্রচলিত শাস্ত্রের ব্যবস্থা অনুযায়ী ক্রিয়াকাণ্ডযুক্ত অনুষ্ঠানকে স্বীকার করেন না। তাঁদের সাধনা একান্ত প্রেম-পিরীতি মার্গে গমন ।
রাগানুগা বা রাগাত্মিকা ভজন হল ভগবানের প্রতি ভক্তের প্রেমময় গাঢ় তৃষ্ণা বা গাঢ় অনুরাগ। এই গভীর প্রেমময় সাধনা বাউলমতে সহজিয়া রাগমার্গের ভজন। প্রিয় আত্মন্,
সেইজন্য বাউলগণ রাগানুগা ভক্তিকে নিজেদের সাধনার অনুকূল বলে ভাবেন। তাঁরা মনে করেন যুগলমিলনের দ্বারা সহজ মানুষের স্বরূপ জানা যাবে । আর রাগাত্মিকা ভজন দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের বোধেবোধ হয় ৷
দ্বিভুজ মুরলীধর নরাকার শ্রীকৃষ্ণের প্রতি যে তীব্র, গাঢ় তৃষ্ণা তাই হল বাউলমতে রাগ ।
শ্রীকৃষ্ণ সত্তায় দুটি ভাব, একটি পূর্ণশক্তি, অপরটি পুর্ণশক্তিমান— আশ্রয় এবং বিষয়—ভোগ এবং ভোক্তা। শক্তিমান নিস্তরঙ্গ (Static) আর শক্তি তরঙ্গায়িত (Dynamic)। নিস্তরঙ্গ স্বরূপশক্তির সঙ্গে তরঙ্গায়িত হ্লাদিনী শক্তির মিলনে বা একীকরণে যে মহা উল্লাস আবির্ভূত হয় তাই মহাভাব। আর সেইখানেই সহজ মানুষের অবস্থিতি ।
ঐ মহাভাবে উপনীত হওয়া এবং সহজ মানুষের স্বরূপ সাক্ষাৎকার করাই হল বাউল সাধনার লক্ষ্য।
ভগবানের প্রতি গাঢ় তৃষ্ণারূপ যে তীব্র অনুরাগ, তাই রাগ। আর ঐ রাগকে মানবভাবে আরোপ করে মানবিক পুরুষ এবং প্রকৃতিকে গভীর প্রেমে রূপান্তরিত করে থাকেন বাউল সাধকগণ।
প্রিয় আত্মন, যাঁরা প্রকৃতি নিয়ে সাধন করেন এবং যাঁরা প্রকৃতি বর্জিত হয়ে সাধনা করেন –এই উভয় সাধকেরাই মানবদেহকে শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি—ব্রজভূমি বা বৃন্দাবন-ভূমিস্বরূপে রূপান্তরিত করেন এবং তার ভিতর রাধা কৃষ্ণের মিলন ঘটিয়ে শৃঙ্গাররূপ অপ্রাকৃত মাধুর্যরস আস্বাদন করে থাকেন। —এটাই সহজপুরে নিত্যলীলা ।
প্রিয় আত্মন্,পূর্বে ভ্রমণকালে এইরূপ বহু সাধকের সংস্পর্শ লাভ হয়েছিল এবং তাঁরা আপন আপন মত নিয়ে দ্বন্দ্ব বা বিবাদ করেন—এটাও প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু সিদ্ধগণ দ্বন্দ্ব করেন না । বাদ-বিবাদ মূলতঃ সাধকদের মধ্যেই হয়ে থাকে। তার বিশ্লেষণ এখানে অপ্রাসঙ্গিক, তবুও কিঞ্চিং আভাস দিচ্ছি—মনোযোগ পূর্বক শ্রবণ কর।
প্রকৃতি-আশ্রিত বর্তমান বাউলগণ বলেন :-
‘মনে মনে রাজা হলে কেবা তাহা জানে
তৈছে মনের সেবা কৈলে কৃষ্ণ নাহি মনে।
বৃন্দাবনে অপ্রাকৃত নবীন মদন
কামবীজ কামগায়ত্রী যাঁর আরাধন।’
—ইত্যাদি অনেক পদ দ্বারা স্বমত প্রতিষ্ঠা করে থাকেন এবং অপর মতকে নিন্দা করেন। প্রকৃতি-বর্জিত একক বাউলগণ বলে থাকেন : –
‘পশুপক্ষী জীবাদি করয়ে শৃঙ্গার
প্রাপ্তি কি হইবে হেন করিলে তাহার ।
আত্মায় আত্মায় যেবা করয়ে রমণ
রসিকের শিরোমণি জানি হেন জন।
প্রেম প্রেম করে সবে প্রেম জানে কেবা
প্রেম করা কি হয় ভাই রমণীর সেবা ?’
উনারাও ঐরূপ যুক্তি ও পদসকল ব্যবহার করে থাকেন। যাহোক, ঐ বাউলগণের মতে আত্মস্বরূপের বোধেবোধের জন্য মনের মানুষকে ধরতে হবে, যিনি মানবের মধ্যেই বিদ্যমান। আর কর্মময় যোগসাধনা দ্বারা তাঁর বোধেবোধ করতে হয় । আত্মস্বরূপের জ্ঞান হলেই তাঁকে জানা যাবে । —যা পূর্বে তোমাকে বলেছি।
প্রিয় আত্মন্,প্রকৃতি-আশ্রয় বাউল-সাধনা একটি সুকঠিন সাধনা । এই সাধনার মধ্য দিয়ে বাউলগণ তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত চরম অবস্থায় উন্নীত হন । উদাহরণ- স্বরূপ বলা যায়—গরলের মধ্য হতে অমৃতগ্রহণ বা ফণীর মস্তক হতে মণি আহরণের ন্যায় এটা অতি দুরূহ সাধনা। ইন্দ্রিয় উপভোগের পন্থা কোন সাধনার ভিত্তিভূমি হতে পারে না। তাঁদের সাধনা পুরুষ-প্রকৃতি মিলনজনিত ইন্দ্রিয় উপভোগ নয়। নিয়মিত ইন্দ্রিয় সংযম করে ইন্দ্রিয়াদির ঊর্ধ্বে সহজস্থিতি লাভ। সুতরাং এটা উচ্ছৃঙ্খল ইন্দ্রিয় ভোগের আয়োজন নয়—বিন্দু ধারণের জন্য সুকঠিন দুর্লভ যোগসাধনা । তাই বাউল-সাধনা ক্ষয়ের আয়োজন নয়, সঞ্চয়ের সাধনা—পূর্ণতালাভের সাধনা । এখন নিশ্চয় বুঝতে পারলে যে, প্রকৃতি আশ্রয় বাউলদের সস্তা ইন্দ্রিয় ভোগের জন্য নয়। কামবিকৃত ব্যভিচারের জন্য প্রকৃতিসেবানয়—এটা প্রাকৃত কামকে অতিক্রম করে অপ্রাকৃত কামে অর্থাৎ প্রেমে উত্তরণের জন্য । এই কারণে বাউলদের কাছে নারী হ্লাদিনী-স্বরূপিণী মহাশক্তি রসময়ী এবং প্রেমময়ী প্রকৃতি ।
বাউলপ্রেম প্রকৃতি-পুরুষ মিলনাত্মক্ । এটা প্রাকৃতদেহ-উৎপন্ন আকর্ষণ হতে আবির্ভূত হলেও এর পরিণতি কিন্তু দেহের ঊর্ধ্ব গত এক অপ্রাকৃত চিন্ময় আনন্দানুভূতিতে । প্রকৃতি-আশ্রয়ী সাধনা একান্ত মানবিক, মানবদেহের বাইরে কোন সাধনা বাউলগণ স্বীকার করেন না। তাঁরা অনুমান ভজনে আস্থা রাখেন না। তাঁরা বর্তমান ভজনে আস্থাশীল । সেইজন্য স্থূল মানবদেহ তাঁদের নিকট অমূল্য সম্পদ । কারণ এই মানব- দেহকে অবলম্বন করেই সহজ মানুষের স্বরূপ জানা যায়। প্রাকৃত কাম হতেই অপ্রাকৃত প্রেমের উদ্ভব আর ঐ অপ্রাকৃত প্রেমে সহজ মানুষ খেলেন।
সাধারণতঃ সকল বাউলকেই প্রকৃতি-আশ্রয় করতে হয়। যাঁরা প্রকৃতি গ্রহণ করেন না, তাঁরা এককভাবে আপনাতে প্রকৃতিভাব আরোপ করে মধুরভাবে ও রাধাভাবে আরাধনা করেন। এরা উদাস বাউল বা শুদ্ধ বাউল নামে পরিচিত হলেও এঁরাও বর্তমান সাধক। কিন্তু প্রকৃতি-আশ্রয় না করে স্বপ্রকৃতিতে প্রকৃতিভাব আরোপ করেন বলেই এঁরা বাহ্য প্রকৃতি-বর্জিত বিশুদ্ধ উদাস বাউল ৷
প্রিয় আত্মন্ !শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামী অনেক বিশুদ্ধ উদাস বাউল বাংলায় আজও দেখা যায়। এঁরা প্রকৃতি-আশ্রিত বর্তমান ভজনায় রুচি রাখেন না, প্রকৃতি-বর্জিত বর্তমান ভজনায় রুচিশীল। এঁরা প্রকৃতি ভজনের দুরূহতায়, স্কুল ক্রিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণাবশতঃ এবং ব্যভিচারের আশঙ্কায় প্রকৃতি-সঙ্গ পরিত্যাগ করেন।
উদাস বাউলগণ আনুষ্ঠানিক লোকাচারমুক্ত সহজ অনুভূতিজাত ঈশ্বর প্রেমে মত্ত। মানব হৃদয়ের সহজাত প্রেমই হল ভগবৎ প্রেম এবং এটাই মানবধর্ম।
প্রতি ক্ষণে ক্ষণে বিশ্ব প্রকৃতিতে মহিমাময় ভগবানের বিচিত্রলীলা সংঘটিত হচ্ছে—সমগ্র জীবজগৎ এবং মানবের ভিতরও ঐ একই ভগবং লীলা সংঘটিত হয়ে চলেছে।
উদাস বাউলরা ভগবৎ প্রেমে উন্মত্তবৎ, সর্বদা আত্মহারা—পাগলপারা । সহজমানুষ ভগবানের স্পর্শের জন্য তাঁরা বিহ্বল – ভগবৎ প্রেমে সর্বদা তন্ময়।
উদাস বাউলগণ বলেন প্রেমানুরাগের পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে । তাঁরা নিজেদের মধ্যে প্রকৃতিভাব আরোপ করেন, অর্থাৎ নিজেদের গোপী ভাবেন। এঁরা পরতত্ত্ব বা সহজ মানুষকে লাভ করবার জন্য আকুল হয়ে রাধাভাবে ভজনা করে পরকীয়া রস গ্রহণ করেন।
পরকীয়া তত্ত্বের অর্থ পরতত্ত্ব বা সহজ মানুষ—তাঁকেই সম্প্রদায় বিশেষে ভগবান, পরমাত্মা, পরমেশ্বর ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত, করে থাকেন ৷
সাংসারিক নিয়মের বন্ধনে আবদ্ধ থেকেও মানব সংসারাতীত প্রেমময় ভগবানের জন্য ব্যাকুলতা অনুভব করেন এবং ভগবানের পরশ পাবার জন্য আকুল হয়ে উঠেন। এই যে পরতত্ত্বে মতি, এটাই পরকীয়া রতি বা পরকীয়া রস।
প্রেমের পথে—অনুরাগের পথে জীবন্ত ভাবের একান্ত প্রয়োজন। হলাদিনীস্বরূপিণী আনন্দময় প্রেমের নিত্যধারা সর্বদা প্রবহমান। সাধক ঐ ধারাতে সহজভাবে নিজেকে ছেড়ে দেবে অর্থাৎ আত্মসমর্পণ করবে। ঐ নিত্যধারার সহিত নিজের জীবন ধারার যোগ করতে হবে।
প্রিয় আত্মন্ !ঐ ধারাই মহতী ইচ্ছারূপে জগতে প্রবাহিত। ঐ মহতী ইচ্ছায় নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করে নিরভিমানী হয়ে দৈন্য, আর্তি ও শরণাগত ভাব নিয়ে তাঁকে ভালবাসতে হবে। আর তখনই নিত্যধারার সঙ্গে সাধকের প্রেমানুরাগের ধারার একান্ত যোগ-মিলন সাধিত হবে এবং চিরকাঙ্ক্ষিত পরম প্রেমময় ভগবান বা সহজ মানুষের সাক্ষাৎ লাভ হবে। তখন দর্শন, স্পর্শন ও মিলন ঘটবে।
উদাস বাউলগণ আত্যন্তিক বিরহকাতর হয়ে গোপীভাবে— রাধাভাবে ভগবানের ভজনা করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃতি-আশ্রিত বর্তমান বাউলগণ মিলনাত্মক যোগ সাধনা দ্বারা অপ্রাকৃত অধর মানুষ— লীলাময় ভগবানকে বোধেবোধ করেন। এঁরা বলেন—কৃষ্ণস্বরূপ পুরুষ এবং রাধাস্বরূপিণী প্রকৃতি নিত্যানন্দময় পরম তত্ত্বের প্রতিনিধি । এইজন্য পুরুষ ও প্রকৃতির মধ্যে অচ্ছেদ্য আকর্ষণ । এই মানবিক প্রেম যত গাঢ় হবে ততই রতিনিষ্ঠা সংঘটিত হতে থাকবে। তখন স্কুল সৃষ্টির মূল তত্ত্ব রজ-বীর্যের ধারা ঊর্ধ্ব দিকে বইতে থাকবে। চরম অবস্থায় উভয় চেতনাশক্তি মিশে একীভূত হবে। ঐ মিলন আত্মস্বরূপে সাম্যরসসংঘটিত হয়ে পরম আনন্দের আস্বাদন দান করবে । প্রেমের অবস্থা যতই গভীর হবে, সাধক ততই বাহ্যচেতনাহীন অবস্থা লাভ করবে। বাহ্যচেতনা ক্রমশঃযখন লুপ্ত হয়ে যাবে, তখন আর দেহগত কোন আকর্ষণ থাকবে না অর্থাৎ প্রাকৃত কামচেতনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থাকে বাউলরা ‘জ্যান্তে মরা’ বলে। এটা নিরভিমানিক পূর্ণ প্রেমের অবস্থা। এই অবস্থায় দেশ-কাল-পাত্রের কোন বন্ধন থাকে না। এই অবস্থাতে মনের মানুষ বা সহজ মানুষের বোধেবোধ হয়। প্রকৃতি-আশ্রিত বর্তমান বাউলগণ যে সাধনার পদ্ধতি গ্রহণ করেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা হল যথাক্রমে—কামবীজ-কামগায়ত্রী জপ, যুগল মূর্তি ধ্যান, মদনানুভূতিকে উত্তেজিত করে যোগ পদ্ধতি দ্বারা ঐ অনুভূতিকে সুষুম্নাপথে উর্ধ্বগামী করা এবং ক্রমশঃ আজ্ঞাচক্রে দ্বিদল পদ্মে উন্নীত করা প্রত্যেক মানবদেহের মধ্যে যে পিতৃশক্তি এবং মাতৃশক্তি বিদ্যমান রয়েছে – সুষুয়ার মধ্য দিয়ে ঐ শক্তিকে দ্বিদল পদ্মে উন্নীত করলে উভয় শক্তির মিলনজাত চরম অবস্থা উপস্থিত হয়, তখন আত্মস্বরূপে অর্থাৎ অন্তর আত্মায় ঐ পরম তত্ত্বের বোধেবোধ হয় এবং তাই পরমানন্দ সহজস্থিতি বা মনের মানুষের অপরোক্ষ অনুভূতি।
