স্বামী বাউলানন্দজী প্রথম দিকে চিঞ্চি উপজাতিদের উপর সরকারি (ইংরেজ) অবহেলা ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে _তাদেরকে সংঘবদ্ধ করে ছোটখাটো লড়াইও করেছিলেন। ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার পরও উনি ওখানকার আদিবাসীদের নানারকম দাবি-দাওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন এবং ঐ চিঞ্চি উপজাতির লোকেদের জীবনে অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
আপ্পা বেঙ্কট রাও নামে অন্ধ্রপ্রদেশের একজন ভক্ত যখন থেকে স্বামী বাউলানন্দের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন_তখন আরো অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিরাও স্বামীজীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছিলেন। তাদের সকলের অনুপ্রেরণায় আপ্পাজী স্বামী বাউলানন্দজীর জীবনী ও তাঁর আলোচনা সমূহ লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেছিলেন। উনি এটা করেছিলেন বলেই পরবর্তীকালের মানুষজনেরা ওনার সম্বন্ধে আনেককিছু জানতে সমর্থ হয়েছিলেন।।(ক্রমশঃ)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*** আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা ***
[ Spiritual Enquiry ]
~~~~~~~~~~~~~~~~~
<< স্বামী বাউলানন্দ >>
প্রশ্ন : – পুনঃ সৃজন এবং সৃজন চেতনা শরীরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত , ব্যক্তি সত্তার সঙ্গে নয় । তাহলে কাণ্ডজ্ঞান কার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ?
উত্তর : ইহা ব্যক্তি সত্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ।
প্রশ্ন : এর ( কাণ্ডজ্ঞান ) কাজ কি ?
উত্তর : ইহা সংকেত সূচক । মানবের ন্যূনতম সচেতনতার মধ্যে ইহা নিহিত থাকে । এই কাণ্ডজ্ঞান মানবের সচেতনতার মান নির্ণয় করে । কোন বিষয় বা বস্তু নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কি চিন্তা করতে হবে , কি বলতে হবে , কেমন করে চিন্তা করতে হবে এবং নিজেদের মধ্যে আচার-আচরণের ক্ষেত্রে কেমন করে কথা বলতে হবে এবং কেমন ভাবে আচরণ করতে হবে কাণ্ডজ্ঞান সে সম্পর্কে একটা ইঙ্গিত দেয় ।
প্রশ্ন : কোন্ জিনিস কাণ্ডজ্ঞানকে কাজ করতে সক্ষম করে ?
উত্তর : সাধারণ শক্তি ।
প্রশ্ন : ব্যক্তিসত্তা যে মুহূর্তে প্রথম মানব শরীর ধারণ করে সেই মুহূর্ত থেকেই কি সাধারণ শক্তি নিপুণভাবে কাজ করে , না , ঠিক পুনঃ সৃজন চেতনার ন্যায় মায়ের নিকট হতে সাধারণ শক্তি লাভ করে নিজের মধ্যে সেই শক্তির বিকাশ ঘটায় এবং পরে ঠিক ঠিক কাজ করে ?
উত্তর : — মাতৃ গর্ভে শরীরের রূপ নেওয়ার পূর্ব
হতেই ইহা ঠিক ঠিক কাজ করে । অমানবীয় শরীরের মৃত্যুর পরমূহূর্ত হতে ব্যক্তি সত্তার দেহমুক্ত অবস্থায় কাণ্ডজ্ঞান নিপুণভাবে কাজকরে । এই কাণ্ডজ্ঞানই দেহমুক্ত অবস্থায় ব্যক্তিসত্তাকে প্রথম মানব শরীর ধারণ করতে সক্ষম করে । এরফলে , সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে ইহা যথাযথ এবং নিপুণভাবে কাজ করে চলে ; মায়ের নিকট হতে সাধারণ শক্তি লাভের প্রয়োজন হয় না , যেমন পুন:সৃজন চেতনার হয়ে থাকে । প্রশ্ন : শরীরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পুনঃসৃজন এবং সৃজন চেতনার যেমন মৃত্যু ঘটে তেমনি কাণ্ডজ্ঞানেরও কি মৃত্যু ঘটে ?
উত্তর :– না , শরীরের মৃত্যু হলেও এর মৃত্য হয় না ।
প্রশ্ন :–শরীরের মৃত্যু হলে এর কি হয় ?
উত্তর :_ শরীরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ইহা ব্যক্তি সত্তার সঙ্গে চলে যায় ।
প্রশ্ন : অমানবীয় সত্তায় থাকাকালীন উচ্চশক্তি লাভ করতে হয় এবং উচ্চ চেতনার বিকাশ ঘটাতে হয় । উচ্চ শক্তি ( সাধারণ শক্তি , উচ্চ চেতনা ( কাণ্ডজ্ঞান ) লাভের পর যে সমস্ত অমানবীয় সত্তা দেহমুক্ত হয়েছিল তারা মানব সত্তায় পরিণত হয়ে মানবরূপে জগতে অবস্থান করছে । এ সমস্ত ঘটনা কেমন করে ঘটছে ?
উত্তর :– মানবীয় এবং অমানবীয় সত্তার যে শক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে সেই শক্তির পরস্পর সংযােগ ঘটায় এই সমস্ত ঘটনা ঘটছে ।
প্রশ্ন :– অমানবীয় সত্তার মানবীয় সত্তায় পরিণত হওয়ার পূর্বে কোন মানবীয় সত্তার অস্তিত্ব ছিল ।
উত্তর :– হ্যাঁ , ছিল ।
প্রশ্ন :– তারা কারা ?
উত্তর :– এ সম্বন্ধে তুমি পূর্বে জিজ্ঞাসা করেছিলে । এখন এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক । সর্বেসর্বা ঈশ্বর বিশ্ব -সত্তা রূপে প্রকাশিত হলেন । বিশ্বসত্তা ব্যক্তিসত্তা রূপে প্রকাশিত হলেন । ব্যক্তিসত্তাগুলির মধ্যে একটি পুরুষ মানব শরীর ধারণ করল । এই হল পৃথিবীতে প্রথম মানবীয় শরীর । এই প্রথম পুরুষ মানব – শরীর হল সমস্ত ব্যক্তিসত্তার পিতা । অতঃপর এই পিতা ব্যষ্টি থেকে সমষ্টি হওয়ার জন্য আগ্রহী হলেন । যে পদ্ধতিতে তাঁর শরীর গঠিত হয়েছিল সেই পদ্ধতিকে কাজে লাগাবার জন্য তাঁর ইচ্ছা জাগল । তাঁর এই ইচ্ছা ফলপ্রসূ হল । একটি স্ত্রী মানব শরীর গঠিত হল । এই স্ত্রী শরীর ধারণের সঙ্গে সঙ্গে একটি অশরীরী সত্তার একটা মানব শরীর ধারণ হল । ইনিই হলেন সমস্ত ব্যক্তি সত্তার মাতা, এঁরাই ( ঐ পুরুষ ও স্ত্রী ) হলেন আদি পিতা – মাতা ।
প্রশ্ন :– বিবাহ না করে কেমন ভাবে আদি পিতা অশরীরী সত্তাকে শরীরে রূপ দিলেন এবং একটি স্ত্রী – শরীর গঠন করলেন ?
উত্তর :– ঐ পিতা মানব সত্তা হিসাবে পূর্ণাঙ্গ , কিন্তু শরীর ধারণের জন্য বিশ্ব সত্তার আদি অবস্থা থেকে অপূর্ণতা তাঁর মধ্যে নিহিত ছিল । তিনি মানব সত্তার আদি কিন্তু বিশ্বসত্তার আদি নন ।
প্রশ্ন :–এ সবের অর্থ ঠিক বুঝতে পারলাম না । আরও বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করুন ।
উত্তর :– যখন মানব সত্তা তথা ব্যক্তি সত্তার প্রবল ইচ্ছা দেখা দিল তখন পঞ্চভূত , পাঞ্চভৌতিক উপাদান , শক্তি , শক্তির উপাদান সমূহ — শাশ্বত , স্থায়ী এবং অস্থায়ী – একত্রিত হয়ে তাঁর উদ্দেশ্যকে সফল করার মত উপযুক্ত মাধ্যম নিয়ে রূপ নিল । আধ্যাত্মিক নীতিতে বিশ্বে এই পদ্ধতি চলতে লাগল ।
সমষ্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদি পিতার যে ইচ্ছা হয়েছিল সেই ইচ্ছা অনুযায়ী দ্বিতীয় মানবসত্তা (স্ত্রী শরীর) নিয়ে আবিভূত হলেন । ইনিই হলেন আদি মাতা ।
প্রশ্ন :– তারপর আদি পিতা – মাতা কি করলেন ?
উত্তর : দীর্ঘ দিন ধরে তাদের একই ইচ্ছা হতে লাগল । এই সময়ব্যাপী মানব শরীর গঠন এবং অশরীরী সত্তার ঐরূপ ( উপরিউল্লিখিত পদ্ধতি ) শরীর ধারণের পদ্ধতি চলতে লাগল ।
প্রশ্ন :– এই ভাবে গঠিত সময় শরীরই কি মানবীয় না অমানবীয় ?
উত্তর :–মানবীয় এবং অমানবীয় উভয়ই ।
প্রশ্ন :– অমানবীয় শরীর না পেয়ে , কাণ্ডজ্ঞান লাভ না করে এবং তারপর মানব সত্তা না হয়ে কেমন করে অশরীরী সত্তা সরাসরি মানবসত্তা হল ?
উত্তর :– মানব সত্তার চেতনার পরিপূর্ণতার অনুপাতে তার ইচ্ছা পরিপূর্ণ হওয়ার ফলে , অশরীরী সত্তার জন্য পঞ্চভূত , পাঞ্চভৌতিক উপাদান – শাশ্বত , স্থায়ী এবং অস্থায়ী শক্তি এবং শক্তির উপাদানসমূহ একত্রিত হয়ে অমানবীয় সত্তার প্রয়ােজনীয় চেতনার বিকাশ ঘটাল । এই ভাবে তারা অমানবীয় সত্তা হল , এবং অমানবীয় শরীর ধারণ না করেই তারা সাধারণ শক্তি পেল , তাদের কাণ্ডজ্ঞানের বিকাশ ঘটল । মানব সত্তায় পরিণত হল এবং মানব রূপে অবস্থান করতে লাগল । এই স্বাভাবিক পদ্ধতি চলতে লাগল । এইভাবে যে সমস্ত অশরীরী সত্তা মানব হল, তাদের মধ্যে পরে আদি পিতা-মাতার মতো পূর্ণতা দেখা গেল না ৷ ফলে তাদের ইচ্ছা-শক্তি অপূর্ণ হল । এই পরিস্থিতি অশরীরী সত্তার মানব শরীর ধারণের জন্য যে পদ্ধতির প্রয়োজন তাতে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাল । এর আরও ফল হল, মানবীয় সত্তায় পরিণত হওয়ার জন্য যাতে কাণ্ডজ্ঞানের বিকাশ ঘটে সেজন্য অশরীরী সত্তার কিছু অংশকে অমানবীয় শরীর ধারণ করে অবস্থান করতে হল । এইভাবে যে সমস্ত অমানবীয় সত্তা অস্তিত্ব লাভ করল তারা নিজ নিজ Category-র শরীর তৈরি করার জন্য দৈহিক মিলনের বশবর্তী হল । এইভাবেই মানবীয় এবং অমানবীয় শরীরের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল । … [ক্রমশঃ]