# [ধর্ম – মনুষ্যত্ব]#
১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে মহানবমী উৎসব হয়েছিল । ঐদিন স্বামী বাউলানন্দের জন্মদিন । সেই উৎসবে আমরা (লেখকেরা) আশ্রমে সমবেত হয়ে ছিলাম । কয়েক দিন ধরে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে গোদাবরী নদী তখন নতুন রূপ নিয়েছিল । ফলে লঞ্চ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছিল । ওই বছর মহাকাশে অষ্টগ্রহের সমাবেশ হয়েছিল । এইরূপ সমাবেশ খুবই বিরল ঘটনা ! ব্যক্তি তথা সমগ্র দেশের পক্ষে এটা খুবই অশুভ । এর প্রভাব হতে রেহাই পেতে হোলে ঈশ্বরের পূজা এবং তাঁর বিশেষ পূজা করা প্রয়োজন ।
সান্ধ্য উপাসনা সমাপ্ত হওয়ার পর মন্দিরে তখন ভজন চলছিল । কিছু সংখ্যক ভক্ত তুলসীকোটার চারিদিকে বসে প্রসাদ খাচ্ছিলো । নদীর দিকে যজ্ঞশালার পাশে ছোট্ট কুটিরে স্বামীজী চেয়ারে বসে ছিলেন । বিশ্বাসম, শ্রদ্ধা, নির্মলম, হরি, প্রভাকর এবং আরো অনেকে স্বামীজীর মুখনিঃসৃত বাণী শোনার জন্য তার নিকটে বসে ছিলেন ।
সেদিন আলোচনা প্রসঙ্গে স্বামী বাউলানন্দ বলেছিলেন যে, ‘স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন__ একজন ধর্মপ্রবর্তকের সঙ্গে যদি আরেকজন প্রবর্তকের মতের অমিল দেখা যায়__ তাহলে বিচার বুদ্ধি দিয়ে তার মীমাংসা করতে হবে ! নাহলে শুধু পুস্তকের লেখা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে, বিভিন্ন ধর্মমতের ধর্মগ্রন্থগুলিতে নানান অসামঞ্জস্য দেখা যাবে ! সমহ্ত ধর্মের সার হোলো _’মনুষ্যত্ব’ !
স্বামীজী সেদিন আরো বলেছিলেন __’যীশুখ্রীষ্ট, গৌতমবুদ্ধ, রামানুজ, মধ্ব__ এরা সকলেই ছিলেন মহাপুরুষ । এদের ঘোষিত সমস্ত কথাই ধর্ম পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে ! কিন্তু এই সমস্ত পরম্পরার ভক্তদের __কারো সাথে কারো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি! প্রত্যেকেই পৃথক পৃথক সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলে ! এদের লেখা বইগুলি পড়ে আজ পর্যন্ত কেউ “পূর্ণ-মানব” হয়ে ওঠেনি ! তার কারণ ধর্মপুস্তক গুলি ভিন্ন ভিন্ন নীতি প্রচার করেছে ! কোনো কোনো বইয়ে গরুর পূজা করতে বলেছে আবার কোনো কোনো বই গরু বধ করে খাওয়ার কথা বলেছে !
সুতরাং এটা বুঝতে হবে যে বইয়ের কোনোদিন ধর্ম থাকেনা ! মনুষ্যত্বই মানুষের প্রধান ধর্ম ! আর মনুষ্যত্বের অপরিহার্য লক্ষণ হলো ঐক্য । কিন্তু বিভিন্ন ধর্মমত বা সম্প্রদায় এই মনুষ্যত্বের ঐক্যকে নষ্ট করে দেয় । মানুষের মধ্যে মনুষত্ব না জাগলে তারা সংকীর্ণমনা হয়ে পরে ! অর্থাৎ তাদের চিন্তা ভাবনা সংকীর্ণ হয়, তা সীমার বন্ধনে আবদ্ধ হয় । ফলে তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যেতে দেখা যায় এবং তার বদলে তারা ঈর্ষাপ্রবণ হয় ! একে অপরের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়, বিক্ষোভ করে এবং একে অপরের অনিষ্ট কামনা করে ! এমনকি পরস্পর পরস্পরকে নিধন করতেও রেয়াত করেনা ! এই হল বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাব ! কিন্তু মনুষত্বের জাগরণ হোলে মানুষের মধ্যে বিভেদ ভাব আর থাকে না সেজন্যই বলা হয়__ ‘ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হোল মনুষ্যত্ব লাভ’!
মানুষ সাধারণত ধর্মাচরণের নামে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভুক্ত হয়ে যায় এবং একে অপরের ধর্মমতকে সহ্য করতে পারেই না, বরং তাকে ছোট করার চেষ্টা করে এবং পারস্পরিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ে । কিন্তু কোনো মানুষের যদি ধর্মের ‘বোধ’ হয়, তাহলে তার আর কোনো ভয় থাকেনা । কোনো হিন্দুকেও যদি কোনো মুসলিম শাসক গোষ্ঠী জোর করে গো মাংস খাইয়ে দেয়_ তাহলে ওই ব্যক্তির ধর্ম নষ্ট হয় না ! সংস্কার জনিত কারণে মানুষ অপরাধবোধে ভোগে ! পূর্বে পূর্বে মুসলিম শাসনকালে এমন দেখা গেছে যে, কোনো ব্রাহ্মণকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে জোর করে গো মাংস খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে সেই লোকটাই কোন অব্রাহ্মণের হাতে বানানো খাবার খেতে নারাজ হচ্ছে !!
এইটি ভারতীয়দের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কারের কুফল ! স্বামীজি বলছিলেন _’ ধর্ম হোল কতকগুলি নীতিতে অবিচল বিশ্বাস, ষোলআনা বিশ্বাস !” কেউ যদি বলে যে, ‘সে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়ে বিশ্বাস হারিয়েছে!’ তা হোলে জানতে হবে তার মধ্যে কোনোকালেই বিশ্বাস ছিল না ! কারণ বিশ্বাস দৃঢ় হলে যেকোনো পরিস্থিতিতে তা কখনোই পরিবর্তিত হয় না ! ধর্মোন্মত্ততা, বংশগৌরব এগুলি ‘মনুষ্যত্বে’-র বিরোধী! এই জন্যই মহা মহা ঋষিগণ ধ্যান-ধারণা করে সত্য এবং ধর্মের বোধ করেছিলেন ! যা বেদ-উপনিষদ নামে প্রকাশিত এবং তা গুরু পরম্পরায় দীর্ঘদিন ধরে বিস্তার লাভ করেছিল। তারা কিন্তু কোনো গ্রন্থাকারে এগুলোকে প্রকাশ করেননি ! কারণ _ ওই যে একটু আগেই বলা হোলো __বই পড়লেই মানুষ কোনো না কোনো নীতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়! বহুকাল ধরে এগুলো ছিল শুধুই “শ্রুতি”!!
একজন ভক্ত কমিউনিজম বা সাম্যবাদের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার মিল রয়েছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলেন ! এর উত্তরে স্বামীজী বললেন __”কমিউনিজম বা কমিউনিস্টদের আদর্শ পালন না করলে তাকে পীড়ন বা শোষণ করা হয় কিন্তু আধ্যাত্মিকতায় এর কোন প্রয়োজন নেই । মানুষ যতদিন পর্যন্ত না নিজে নিজেই তার উন্নতি সাধনের জন্য সচেষ্ট হবে _ততদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিকাঠামো বদলে মানুষের মধ্যে সুখ শান্তি বিরাজ করাতে পারা যাবে না ! আধ্যাত্মিকতা শিক্ষায় সব সময় গুরুদের লক্ষ্য থাকে প্রতিটি মানুষ যাতে সুখ-শান্তি পেয়ে সন্তুষ্ট থাকে ! মানুষের যে অন্তিম লক্ষ্য ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করা এবং জন্ম মৃত্যুর কবল হোতে রেহাই পাও_সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া ! কিন্তু কমিউনিজম বা সাম্যবাদ এসবের কথা জানেনা ! সুতরাং ‘আধ্যাত্মিকতা’-র তুলনায় -‘সাম্যবাদ’ অতি নগন্য এদের মধ্যে কোন তুলনাই চলে না।”(ক্রমশঃ)
১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে মহানবমী উৎসব হয়েছিল । ঐদিন স্বামী বাউলানন্দের জন্মদিন । সেই উৎসবে আমরা (লেখকেরা) আশ্রমে সমবেত হয়ে ছিলাম । কয়েক দিন ধরে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে গোদাবরী নদী তখন নতুন রূপ নিয়েছিল । ফলে লঞ্চ চলাচলে বিঘ্ন ঘটছিল । ওই বছর মহাকাশে অষ্টগ্রহের সমাবেশ হয়েছিল । এইরূপ সমাবেশ খুবই বিরল ঘটনা ! ব্যক্তি তথা সমগ্র দেশের পক্ষে এটা খুবই অশুভ । এর প্রভাব হতে রেহাই পেতে হোলে ঈশ্বরের পূজা এবং তাঁর বিশেষ পূজা করা প্রয়োজন ।
সান্ধ্য উপাসনা সমাপ্ত হওয়ার পর মন্দিরে তখন ভজন চলছিল । কিছু সংখ্যক ভক্ত তুলসীকোটার চারিদিকে বসে প্রসাদ খাচ্ছিলো । নদীর দিকে যজ্ঞশালার পাশে ছোট্ট কুটিরে স্বামীজী চেয়ারে বসে ছিলেন । বিশ্বাসম, শ্রদ্ধা, নির্মলম, হরি, প্রভাকর এবং আরো অনেকে স্বামীজীর মুখনিঃসৃত বাণী শোনার জন্য তার নিকটে বসে ছিলেন ।
সেদিন আলোচনা প্রসঙ্গে স্বামী বাউলানন্দ বলেছিলেন যে, ‘স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন__ একজন ধর্মপ্রবর্তকের সঙ্গে যদি আরেকজন প্রবর্তকের মতের অমিল দেখা যায়__ তাহলে বিচার বুদ্ধি দিয়ে তার মীমাংসা করতে হবে ! নাহলে শুধু পুস্তকের লেখা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে, বিভিন্ন ধর্মমতের ধর্মগ্রন্থগুলিতে নানান অসামঞ্জস্য দেখা যাবে ! সমহ্ত ধর্মের সার হোলো _’মনুষ্যত্ব’ !
স্বামীজী সেদিন আরো বলেছিলেন __’যীশুখ্রীষ্ট, গৌতমবুদ্ধ, রামানুজ, মধ্ব__ এরা সকলেই ছিলেন মহাপুরুষ । এদের ঘোষিত সমস্ত কথাই ধর্ম পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়েছে ! কিন্তু এই সমস্ত পরম্পরার ভক্তদের __কারো সাথে কারো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি! প্রত্যেকেই পৃথক পৃথক সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলে ! এদের লেখা বইগুলি পড়ে আজ পর্যন্ত কেউ “পূর্ণ-মানব” হয়ে ওঠেনি ! তার কারণ ধর্মপুস্তক গুলি ভিন্ন ভিন্ন নীতি প্রচার করেছে ! কোনো কোনো বইয়ে গরুর পূজা করতে বলেছে আবার কোনো কোনো বই গরু বধ করে খাওয়ার কথা বলেছে !
সুতরাং এটা বুঝতে হবে যে বইয়ের কোনোদিন ধর্ম থাকেনা ! মনুষ্যত্বই মানুষের প্রধান ধর্ম ! আর মনুষ্যত্বের অপরিহার্য লক্ষণ হলো ঐক্য । কিন্তু বিভিন্ন ধর্মমত বা সম্প্রদায় এই মনুষ্যত্বের ঐক্যকে নষ্ট করে দেয় । মানুষের মধ্যে মনুষত্ব না জাগলে তারা সংকীর্ণমনা হয়ে পরে ! অর্থাৎ তাদের চিন্তা ভাবনা সংকীর্ণ হয়, তা সীমার বন্ধনে আবদ্ধ হয় । ফলে তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যেতে দেখা যায় এবং তার বদলে তারা ঈর্ষাপ্রবণ হয় ! একে অপরের প্রতি সন্দেহপ্রবণ হয়, বিক্ষোভ করে এবং একে অপরের অনিষ্ট কামনা করে ! এমনকি পরস্পর পরস্পরকে নিধন করতেও রেয়াত করেনা ! এই হল বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাব ! কিন্তু মনুষত্বের জাগরণ হোলে মানুষের মধ্যে বিভেদ ভাব আর থাকে না সেজন্যই বলা হয়__ ‘ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হোল মনুষ্যত্ব লাভ’!
মানুষ সাধারণত ধর্মাচরণের নামে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভুক্ত হয়ে যায় এবং একে অপরের ধর্মমতকে সহ্য করতে পারেই না, বরং তাকে ছোট করার চেষ্টা করে এবং পারস্পরিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ে । কিন্তু কোনো মানুষের যদি ধর্মের ‘বোধ’ হয়, তাহলে তার আর কোনো ভয় থাকেনা । কোনো হিন্দুকেও যদি কোনো মুসলিম শাসক গোষ্ঠী জোর করে গো মাংস খাইয়ে দেয়_ তাহলে ওই ব্যক্তির ধর্ম নষ্ট হয় না ! সংস্কার জনিত কারণে মানুষ অপরাধবোধে ভোগে ! পূর্বে পূর্বে মুসলিম শাসনকালে এমন দেখা গেছে যে, কোনো ব্রাহ্মণকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে জোর করে গো মাংস খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে সেই লোকটাই কোন অব্রাহ্মণের হাতে বানানো খাবার খেতে নারাজ হচ্ছে !!
এইটি ভারতীয়দের জন্ম-জন্মান্তরের সংস্কারের কুফল ! স্বামীজি বলছিলেন _’ ধর্ম হোল কতকগুলি নীতিতে অবিচল বিশ্বাস, ষোলআনা বিশ্বাস !” কেউ যদি বলে যে, ‘সে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়ে বিশ্বাস হারিয়েছে!’ তা হোলে জানতে হবে তার মধ্যে কোনোকালেই বিশ্বাস ছিল না ! কারণ বিশ্বাস দৃঢ় হলে যেকোনো পরিস্থিতিতে তা কখনোই পরিবর্তিত হয় না ! ধর্মোন্মত্ততা, বংশগৌরব এগুলি ‘মনুষ্যত্বে’-র বিরোধী! এই জন্যই মহা মহা ঋষিগণ ধ্যান-ধারণা করে সত্য এবং ধর্মের বোধ করেছিলেন ! যা বেদ-উপনিষদ নামে প্রকাশিত এবং তা গুরু পরম্পরায় দীর্ঘদিন ধরে বিস্তার লাভ করেছিল। তারা কিন্তু কোনো গ্রন্থাকারে এগুলোকে প্রকাশ করেননি ! কারণ _ ওই যে একটু আগেই বলা হোলো __বই পড়লেই মানুষ কোনো না কোনো নীতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়! বহুকাল ধরে এগুলো ছিল শুধুই “শ্রুতি”!!
একজন ভক্ত কমিউনিজম বা সাম্যবাদের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার মিল রয়েছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলেন ! এর উত্তরে স্বামীজী বললেন __”কমিউনিজম বা কমিউনিস্টদের আদর্শ পালন না করলে তাকে পীড়ন বা শোষণ করা হয় কিন্তু আধ্যাত্মিকতায় এর কোন প্রয়োজন নেই । মানুষ যতদিন পর্যন্ত না নিজে নিজেই তার উন্নতি সাধনের জন্য সচেষ্ট হবে _ততদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিকাঠামো বদলে মানুষের মধ্যে সুখ শান্তি বিরাজ করাতে পারা যাবে না ! আধ্যাত্মিকতা শিক্ষায় সব সময় গুরুদের লক্ষ্য থাকে প্রতিটি মানুষ যাতে সুখ-শান্তি পেয়ে সন্তুষ্ট থাকে ! মানুষের যে অন্তিম লক্ষ্য ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করা এবং জন্ম মৃত্যুর কবল হোতে রেহাই পাও_সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া ! কিন্তু কমিউনিজম বা সাম্যবাদ এসবের কথা জানেনা ! সুতরাং ‘আধ্যাত্মিকতা’-র তুলনায় -‘সাম্যবাদ’ অতি নগন্য এদের মধ্যে কোন তুলনাই চলে না।”(ক্রমশঃ)
