স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো।আমরা আগের দিন দেখেছিলাম যে, মা জগদম্বার দর্শনের পর স্বামীজীর এমন একটা অবস্থা হয়েছিল যে, উনি প্রত্যক্ষ করছিলেন_ ওনার উপলব্ধি এবং অনুভূতিগুলি কবিতার আকারে যেন সারিবদ্ধ হয়ে ওনার সামনে প্রকাশ পাচ্ছে। তাই উনি সেগুলিকে লিপিবদ্ধ করে রাখতে শুরু করেছিলেন। এই সময়ে উনি লেখার ব্যাপারে এতটাই মগ্ন থাকতেন যে, তাঁর অনেক পরিচিত মানুষ _যারা আগে অন্য সময় তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন, নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন _কিন্তু এই সময়ে তাদের সাথেও স্বামীজী কোনোরূপ বাক্যালাপ করতেন না। তাদের উপস্থিতির ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপই করতেন না _শুধু লিখেই যেতেন! এইভাবে বহুদিন চলেছিল!
একদিন স্বামীজি ভাবলেন এতদিন ধরে তিনি যা লিখেছেন_ সেগুলি তিনি নিজে একবার পড়ে দেখবেন। সেইমতো তিনি সেগুলো পড়েছিলেন এবং লেখাগুলি পড়ে তাঁর খুব ভাল লেগেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল যে নিপুণভাবে ‘সত্য’-কে বর্ণনা করা হয়েছে!
কিন্তু পড়া শেষ হলে_ একসময় তাঁর অন্তর্জগতে একটা ভাব জেগে উঠলো! কে যেন বলে উঠল _”তুমি এই সমস্ত জিনিস লিখেছো, তুমি ভাবছো এগুলি খুব সুন্দর! যে সমস্ত লোক পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরা যেমন লেখেন এগুলো ঠিক তেমনই হয়েছে ! লোকে ভাববে এই সমস্ত কবিতার লেখক অবশ্যই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তিনি ঈশ্বর দর্শন করেছেন ! কিন্তু তুমি নিজেকে দ্যাখো, তোমার নিজের মধ্যে অপূর্ণতা রয়েছে! পূর্ণতা অর্জন না করেও যদি তুমি এই সমস্ত লেখো _তাহলে পরবর্তী কালের মানুষ এটাই বুঝবে যে, সত্য সম্বন্ধে লিখতে গেলে কারো পূর্ণতাপ্রাপ্তির দরকার নাই! তাছাড়াও এটার অর্থ দাঁড়াবে _যারা ইতিপূর্বে লেখার আকারে সত্যকে প্রকাশ করেছেন _তাঁদের কারও পূর্ণতাপ্রাপ্তির দরকার হয়নি _তারা ঈশ্বর দর্শনও করেন নাই ! সুতরাং তুমি এসমস্ত ভুলে যাও! ছোটবেলা থেকে তোমার একটাই আদর্শ ছিল _তা হোল ঈশ্বর উপলব্ধি। তুমি তোমার আদর্শ ভুলে যেওনা _এইসব ভাসা ভাসা ভাবেতে নিজেকে লিপ্ত রেখো না। এদের কোন শেষ নাই _এরা পথের মাইল-নির্দেশক-স্তম্ভ মাত্র! এসব অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টা করো”!
এরপর তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন যে, আর তিনি এক লাইনও লিখবেন না। সেই লেখাগুলি তিনি বেঁধে রেখে এক জায়গায় রেখে দিলেন _আর জীবনে কখনো সেগুলি খোলেন নাই ।
স্বামীজি রাজামন্দ্রিতে কয়েক মাস অবস্থান করার পর পেরেন্টাপল্লী গ্রামে গিয়ে জগদম্বার দর্শিত স্থানে পূজা-অর্চনা করতে চাইলেন। শীঘ্রই তিনি পেরেন্টাপল্লী পৌঁছালেন এবং গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় শিবলিঙ্গের আশেপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেললেন। ওই স্থান খুঁড়তে খুঁড়তে গ্রামবাসীরা কয়েকটা ইঁট দেখতে পেল। বর্তমান কালের ইঁটের তুলনায় এগুলি আকারে বড় ছিল । ইঁটগুলি দেখে স্বামীজি চিন্তা করলেন যে কয়েক শতাব্দী আগে এখানে নিশ্চয়ই কোন মন্দির ছিল। সম্ভবতঃ গোদাবরী নদীর করালগ্রাসে সেই মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। সেই ধ্বংসাবশেষ হয়তো গিরিখাতে পড়ে গেছে অথবা নদীর পলিতে চাপা পড়েছে । শিবলিঙ্গের জীর্ণ অবস্থা দেখে স্বামীজী বুঝলেন এটি বহু শতাব্দীর পুরানো । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে রত্ন লুক্কায়িত ছিল, তা পেয়ে তিনি খুবই আনন্দিত হোলেন । একটা বড় গাছের নিচে তার জন্য একটা কুটীর নির্মিত হোল, স্বামীজি সেই কুটীরে থেকে কয়েকদিন শিবের পুজো করলেন। এরপর তিনি ভদ্রাচলমের দিকে রওনা হয়ে গেলেন।।(ক্রমশঃ)
*MESSAGE TO HUMANITY*
~ _Swami Baulananda_
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এই পর্যায় প্রাপ্তি, মূল বা উৎস সেই বিশ্ব সত্তার সঙ্গে এক ভাব প্রাপ্তিও হল মানবীয় সত্তার সার্বজনীন সুখ এবং নিরাপত্তা প্রাপ্তি। সুখ এবং নিরাপত্তা বর্হিভূত একটা অবস্থার অস্তিত্ব সম্বন্ধে যে সাধারণ ধারণা তা ঠিক, ঐ অবস্থা সম্বন্ধে যে সাধারণ ধারণা তা কিন্তু ঠিক নয়। সুখ এবং নিরাপত্তা-বর্হিভূত অবস্থা প্রাপ্তি হল মানুষের বোধের আওতায়, কিন্তু মানুষের প্রাপ্তির অাওতায় হল না । কারণ মন এবং বিশ্ব অহং উভয়েই হল সত্তা। ঊর্ধ্ব প্রগতি-কামী সত্তা যখন বিশ্ব সত্তার সঙ্গে একীভূত হয়, তখন সত্তার মনের ভাব ( mind aspect ) যা ‘একত্ব’ (Oneness ) লাভ করেছে, সত্তা হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে দমন করে ঊর্ধ্ব প্রগতির উৎসের সঙ্গে এক হয়ে তার অস্তিত্ব এবং সত্তা ভাব ( beingness ) হারিয়ে ফেলে। অহং ভাব ( ego aspect ) তার মূল বিশ্ব অহং-এর সঙ্গে মিশে যায়। এইখানে ব্যক্তি মন একই সঙ্গে সার্বিক হয়ে যায়। এইখানে ব্যক্তি আর ব্যক্তি নয়, সে এখন বিশ্ব সত্তা। বিশ্ব সত্তার সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর বিশ্ব সত্তা ( Universal Being ) ব্যক্তি সত্তার মুল বা উৎস। ব্যক্তি সত্তাই বিশ্ব সত্তা। এরপর যে সত্তা বিশ্ব সত্তায় পরিণত হয়েছে তার। আর স্বাতন্ত্র কোথায় ? কোথাও না। ধরা যাক, যে অবস্থা সুখ এবং নিরাপত্তা বর্হিভূত তা কেবলমাত্র মানবের বোধের আওতার মধ্যে নয় তা মানুষের প্রাপ্তির আওতার মধ্যেও। ঐ অবস্থা পূর্ব বর্ণিত অবস্থার অনুরূপ। ঐ চিন্তা একেবারে যথার্থ এবং সম্ভাবনাও সুনিশ্চিত। এটা সার্বজনীন প্রয়োজনীয়তা ।
এই ভাবে, যখন বিশ্বে মাত্র একজন পুরুষ ছিলেন, এবং একেবারে পূর্ব অবস্থায় যখন সর্বেসর্বা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না — সেই অবস্থার বিস্তারিত চিন্তনে প্রবেশ করা মানবের পক্ষে একেবারে অযথার্থ এবং অসম্ভব।
সুতরাং মানবিক উদ্দেশ্য মানবােচিত উপায় পূরণের সার্বজনীন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সার্বজনীন প্রয়ােজনীয়তা মানবত্বের প্রয়ােজন বোধ করল। কিন্তু তা করল সর্বেসর্বা (ঈশ্বর, All-in-All) এবং অন্য সমস্ত জিনিষের সঙ্গে একত্ব বােধ করার যে উপায় তার নিকটবর্তী হয়ে বিপথে না যাওয়ার জন্য। এবং ইহা মানবত্বের প্রয়ােজন বোধ করল ঠিক ঠিক পথ অনুসরণ করার জন্য। এই বিশ্বাসের বলেই সত্তা বা অন্য সমস্ত নামের ব্যক্তি সত্তা তাদের আদি পিতা-মাতার সঙ্গে একত্ব বোধ করতে পারে বা করবে। কিন্তু তৎপূর্বের বা ততােধিক পূর্বে বিশ্বের অবস্থা সম্বন্ধে কেউ জানতে পারে না বা পারবে না। মানুষের অভিজ্ঞতায় কি সম্ভব নয় এবং সার্বিক নীতিতে কি চাওয়া হয় না — সে সম্বন্ধে আদি পিতা-মাতা সম্যক ধারণা করতে পারলেন। নিজের আচরণকে সার্বজনীন নীতিসমুহ, উর্ধ্ব প্রগতির নীতিসমূহ, মানুষের উদ্দেশ্য মানবোচিত উপায়ে পূরণের জন্য সার্বিক প্রয়ােজনের ভিত্তিস্বরূপ সার্বজনীন সাংগঠনিক নীতিসমুহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ইহা মানবত্বের প্রয়ােজন বােধ করল।
স্বজন বা পরিজনের বিরােধিতা করা গাছ-গাছড়া, অমানবীয় সত্তা এবং মানুষের স্বভাব। গাছ-গাছড়ার এই বিরােধিতা তাদের মূল এবং শাখা-প্রশাখায়। প্রত্যেকের মূল অন্যের মূলকে উপেক্ষা করে এবং দমন করে। শাখাগুলিও ঠিক তদ্রুপ করে। মূল এবং শাখা উভয়েই তদের ক্ষমতা অনুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করে। অপরের প্রচেষ্টাকে বাধা দেবার বা অপরের উপর প্রাধান্য লাভ করার। এক স্থান হতে অন্য স্থানে তাদের গতিবিধি নাই, অথচ নিজেদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই এটা হয়। যদিও তাদের অমানবীয় সত্তার ন্যায় ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ চেতনা নেই, কেবলমাত্র প্রজনন এবং প্রজনন চেতনা আছে, নিরাপদে থাকার প্রবণতা ব্যতীত সর্বদা সুখী হওয়ার প্রবণতা আছে, তথাপি বিরােধিতা করার স্বভাব আছে। এতৎ সত্বেও তারা আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে একসঙ্গে বাস করতে পারঙ্গম এবং দলবদ্ধ হয়ে বর্ধিত হতে পারে।
গৃহপালিত শ্রেণীর অমানবীয় সত্তার মধ্যে কেউ চড়বার বা নিদ্রা যাওয়ার সময় অন্য এলা কার সমজাতীয়দের নিজের দলে আসার অনুমতি দেয় না। এমন কি একই দলে ভােজন ও পান একসঙ্গে চলে কিন্তু নিদ্রা অন্যত্র হয়। কিন্তু বিরোধিতার ভাব আছে। হঠাৎ অন্যস্থানে প্রবেশ করলে আপত্তি উঠে, সঙ্গে সঙ্গে বাধা প্রাপ্ত হয় এবং বিতাড়িত হয়। এমন কি কখন কখন সমজাতীয়দের দ্বারা নিহত হয়। বন্যদের মধ্যে বাঘ অন্য এলাকার বাঘকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দেয় না, ভল্লুক এবং সিংহও অনুরূপ আচরণ করে। কেবলমাত্র ক্ষুদ্র চেতনাযুক্ত জাতি, ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ চেতনাযুক্ত জাতির চেয়ে অধিক উপযুক্ত। … [ক্রমশঃ]
একদিন স্বামীজি ভাবলেন এতদিন ধরে তিনি যা লিখেছেন_ সেগুলি তিনি নিজে একবার পড়ে দেখবেন। সেইমতো তিনি সেগুলো পড়েছিলেন এবং লেখাগুলি পড়ে তাঁর খুব ভাল লেগেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল যে নিপুণভাবে ‘সত্য’-কে বর্ণনা করা হয়েছে!
কিন্তু পড়া শেষ হলে_ একসময় তাঁর অন্তর্জগতে একটা ভাব জেগে উঠলো! কে যেন বলে উঠল _”তুমি এই সমস্ত জিনিস লিখেছো, তুমি ভাবছো এগুলি খুব সুন্দর! যে সমস্ত লোক পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁরা যেমন লেখেন এগুলো ঠিক তেমনই হয়েছে ! লোকে ভাববে এই সমস্ত কবিতার লেখক অবশ্যই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তিনি ঈশ্বর দর্শন করেছেন ! কিন্তু তুমি নিজেকে দ্যাখো, তোমার নিজের মধ্যে অপূর্ণতা রয়েছে! পূর্ণতা অর্জন না করেও যদি তুমি এই সমস্ত লেখো _তাহলে পরবর্তী কালের মানুষ এটাই বুঝবে যে, সত্য সম্বন্ধে লিখতে গেলে কারো পূর্ণতাপ্রাপ্তির দরকার নাই! তাছাড়াও এটার অর্থ দাঁড়াবে _যারা ইতিপূর্বে লেখার আকারে সত্যকে প্রকাশ করেছেন _তাঁদের কারও পূর্ণতাপ্রাপ্তির দরকার হয়নি _তারা ঈশ্বর দর্শনও করেন নাই ! সুতরাং তুমি এসমস্ত ভুলে যাও! ছোটবেলা থেকে তোমার একটাই আদর্শ ছিল _তা হোল ঈশ্বর উপলব্ধি। তুমি তোমার আদর্শ ভুলে যেওনা _এইসব ভাসা ভাসা ভাবেতে নিজেকে লিপ্ত রেখো না। এদের কোন শেষ নাই _এরা পথের মাইল-নির্দেশক-স্তম্ভ মাত্র! এসব অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টা করো”!
এরপর তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন যে, আর তিনি এক লাইনও লিখবেন না। সেই লেখাগুলি তিনি বেঁধে রেখে এক জায়গায় রেখে দিলেন _আর জীবনে কখনো সেগুলি খোলেন নাই ।
স্বামীজি রাজামন্দ্রিতে কয়েক মাস অবস্থান করার পর পেরেন্টাপল্লী গ্রামে গিয়ে জগদম্বার দর্শিত স্থানে পূজা-অর্চনা করতে চাইলেন। শীঘ্রই তিনি পেরেন্টাপল্লী পৌঁছালেন এবং গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় শিবলিঙ্গের আশেপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেললেন। ওই স্থান খুঁড়তে খুঁড়তে গ্রামবাসীরা কয়েকটা ইঁট দেখতে পেল। বর্তমান কালের ইঁটের তুলনায় এগুলি আকারে বড় ছিল । ইঁটগুলি দেখে স্বামীজি চিন্তা করলেন যে কয়েক শতাব্দী আগে এখানে নিশ্চয়ই কোন মন্দির ছিল। সম্ভবতঃ গোদাবরী নদীর করালগ্রাসে সেই মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। সেই ধ্বংসাবশেষ হয়তো গিরিখাতে পড়ে গেছে অথবা নদীর পলিতে চাপা পড়েছে । শিবলিঙ্গের জীর্ণ অবস্থা দেখে স্বামীজী বুঝলেন এটি বহু শতাব্দীর পুরানো । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে রত্ন লুক্কায়িত ছিল, তা পেয়ে তিনি খুবই আনন্দিত হোলেন । একটা বড় গাছের নিচে তার জন্য একটা কুটীর নির্মিত হোল, স্বামীজি সেই কুটীরে থেকে কয়েকদিন শিবের পুজো করলেন। এরপর তিনি ভদ্রাচলমের দিকে রওনা হয়ে গেলেন।।(ক্রমশঃ)
*MESSAGE TO HUMANITY*
~ _Swami Baulananda_
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এই পর্যায় প্রাপ্তি, মূল বা উৎস সেই বিশ্ব সত্তার সঙ্গে এক ভাব প্রাপ্তিও হল মানবীয় সত্তার সার্বজনীন সুখ এবং নিরাপত্তা প্রাপ্তি। সুখ এবং নিরাপত্তা বর্হিভূত একটা অবস্থার অস্তিত্ব সম্বন্ধে যে সাধারণ ধারণা তা ঠিক, ঐ অবস্থা সম্বন্ধে যে সাধারণ ধারণা তা কিন্তু ঠিক নয়। সুখ এবং নিরাপত্তা-বর্হিভূত অবস্থা প্রাপ্তি হল মানুষের বোধের আওতায়, কিন্তু মানুষের প্রাপ্তির অাওতায় হল না । কারণ মন এবং বিশ্ব অহং উভয়েই হল সত্তা। ঊর্ধ্ব প্রগতি-কামী সত্তা যখন বিশ্ব সত্তার সঙ্গে একীভূত হয়, তখন সত্তার মনের ভাব ( mind aspect ) যা ‘একত্ব’ (Oneness ) লাভ করেছে, সত্তা হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে দমন করে ঊর্ধ্ব প্রগতির উৎসের সঙ্গে এক হয়ে তার অস্তিত্ব এবং সত্তা ভাব ( beingness ) হারিয়ে ফেলে। অহং ভাব ( ego aspect ) তার মূল বিশ্ব অহং-এর সঙ্গে মিশে যায়। এইখানে ব্যক্তি মন একই সঙ্গে সার্বিক হয়ে যায়। এইখানে ব্যক্তি আর ব্যক্তি নয়, সে এখন বিশ্ব সত্তা। বিশ্ব সত্তার সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর বিশ্ব সত্তা ( Universal Being ) ব্যক্তি সত্তার মুল বা উৎস। ব্যক্তি সত্তাই বিশ্ব সত্তা। এরপর যে সত্তা বিশ্ব সত্তায় পরিণত হয়েছে তার। আর স্বাতন্ত্র কোথায় ? কোথাও না। ধরা যাক, যে অবস্থা সুখ এবং নিরাপত্তা বর্হিভূত তা কেবলমাত্র মানবের বোধের আওতার মধ্যে নয় তা মানুষের প্রাপ্তির আওতার মধ্যেও। ঐ অবস্থা পূর্ব বর্ণিত অবস্থার অনুরূপ। ঐ চিন্তা একেবারে যথার্থ এবং সম্ভাবনাও সুনিশ্চিত। এটা সার্বজনীন প্রয়োজনীয়তা ।
এই ভাবে, যখন বিশ্বে মাত্র একজন পুরুষ ছিলেন, এবং একেবারে পূর্ব অবস্থায় যখন সর্বেসর্বা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না — সেই অবস্থার বিস্তারিত চিন্তনে প্রবেশ করা মানবের পক্ষে একেবারে অযথার্থ এবং অসম্ভব।
সুতরাং মানবিক উদ্দেশ্য মানবােচিত উপায় পূরণের সার্বজনীন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সার্বজনীন প্রয়ােজনীয়তা মানবত্বের প্রয়ােজন বোধ করল। কিন্তু তা করল সর্বেসর্বা (ঈশ্বর, All-in-All) এবং অন্য সমস্ত জিনিষের সঙ্গে একত্ব বােধ করার যে উপায় তার নিকটবর্তী হয়ে বিপথে না যাওয়ার জন্য। এবং ইহা মানবত্বের প্রয়ােজন বোধ করল ঠিক ঠিক পথ অনুসরণ করার জন্য। এই বিশ্বাসের বলেই সত্তা বা অন্য সমস্ত নামের ব্যক্তি সত্তা তাদের আদি পিতা-মাতার সঙ্গে একত্ব বোধ করতে পারে বা করবে। কিন্তু তৎপূর্বের বা ততােধিক পূর্বে বিশ্বের অবস্থা সম্বন্ধে কেউ জানতে পারে না বা পারবে না। মানুষের অভিজ্ঞতায় কি সম্ভব নয় এবং সার্বিক নীতিতে কি চাওয়া হয় না — সে সম্বন্ধে আদি পিতা-মাতা সম্যক ধারণা করতে পারলেন। নিজের আচরণকে সার্বজনীন নীতিসমুহ, উর্ধ্ব প্রগতির নীতিসমূহ, মানুষের উদ্দেশ্য মানবোচিত উপায়ে পূরণের জন্য সার্বিক প্রয়ােজনের ভিত্তিস্বরূপ সার্বজনীন সাংগঠনিক নীতিসমুহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য ইহা মানবত্বের প্রয়ােজন বােধ করল।
স্বজন বা পরিজনের বিরােধিতা করা গাছ-গাছড়া, অমানবীয় সত্তা এবং মানুষের স্বভাব। গাছ-গাছড়ার এই বিরােধিতা তাদের মূল এবং শাখা-প্রশাখায়। প্রত্যেকের মূল অন্যের মূলকে উপেক্ষা করে এবং দমন করে। শাখাগুলিও ঠিক তদ্রুপ করে। মূল এবং শাখা উভয়েই তদের ক্ষমতা অনুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করে। অপরের প্রচেষ্টাকে বাধা দেবার বা অপরের উপর প্রাধান্য লাভ করার। এক স্থান হতে অন্য স্থানে তাদের গতিবিধি নাই, অথচ নিজেদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই এটা হয়। যদিও তাদের অমানবীয় সত্তার ন্যায় ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ চেতনা নেই, কেবলমাত্র প্রজনন এবং প্রজনন চেতনা আছে, নিরাপদে থাকার প্রবণতা ব্যতীত সর্বদা সুখী হওয়ার প্রবণতা আছে, তথাপি বিরােধিতা করার স্বভাব আছে। এতৎ সত্বেও তারা আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে একসঙ্গে বাস করতে পারঙ্গম এবং দলবদ্ধ হয়ে বর্ধিত হতে পারে।
গৃহপালিত শ্রেণীর অমানবীয় সত্তার মধ্যে কেউ চড়বার বা নিদ্রা যাওয়ার সময় অন্য এলা কার সমজাতীয়দের নিজের দলে আসার অনুমতি দেয় না। এমন কি একই দলে ভােজন ও পান একসঙ্গে চলে কিন্তু নিদ্রা অন্যত্র হয়। কিন্তু বিরোধিতার ভাব আছে। হঠাৎ অন্যস্থানে প্রবেশ করলে আপত্তি উঠে, সঙ্গে সঙ্গে বাধা প্রাপ্ত হয় এবং বিতাড়িত হয়। এমন কি কখন কখন সমজাতীয়দের দ্বারা নিহত হয়। বন্যদের মধ্যে বাঘ অন্য এলাকার বাঘকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দেয় না, ভল্লুক এবং সিংহও অনুরূপ আচরণ করে। কেবলমাত্র ক্ষুদ্র চেতনাযুক্ত জাতি, ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ চেতনাযুক্ত জাতির চেয়ে অধিক উপযুক্ত। … [ক্রমশঃ]
