স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলাকার ভ্রাম্যমান জীবন সম্বন্ধে আলোচনা করা হচ্ছিলো। আগের দিন আমরা _রেল সেতুর নিচে থাকা এক সন্ন্যাসীর সাথে দেখা করতে গিয়ে স্বামীজীর নানান ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছিল । যাইহোক, ওখান থেকে বিদায় নিয়ে স্বামী বাউলানন্দজী লঞ্চে করে পেরেন্টাপল্লীর দিকে অগ্রসর হোলেন। সেখানকার আশ্রমটি বাসোপযোগী করার জন্য তিনি সেখানে দুদিন রয়ে গেলেন। ওখানকার আশ্রমের দেবতা সেই শিবলিঙ্গকে দুবেলা পূজা করতেন তিনি । কুটিরে যে ধুনী ছিল, সেখানেই চাল এবং ডাল একসঙ্গে রান্না করে আশ্রম দেবতাকে ভোগ দিতেন । ওই আশ্রমে দুদিন থাকার পর তিনি ভদ্রাচলমে রওনা হোলেন এবং সেখান থেকে ডুম্মাগুডেম গ্রামের দিকে চলে গেলেন ।
ওই অঞ্চলে ডুম্মাগুডেম বড় গ্রাম। সেখানে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার বাস করতো। তার চেয়েও বেশি বাস করতো _ গরিব শ্রেণীর লোক ! ধনী লোকের অধিকাংশই বন-জাত পণ্যের ব্যবসা করতো।
ওই গ্রামের সবচেয়ে ধনী লোক ছিলেন সন্নেসায়ী। তিনি জমিদার, বেশ কয়েকটা গ্রাম তাঁর অধিকারে ছিল । গ্রামের অধিকাংশ পরিবার সময়ে সময়ে তার নিকট টাকা কর্জ কোরতো। তার কবল হতে কেউই রেহাই পেতো না । তিনি খুব প্রভাবশালী ছিলেন । ইংরেজ সরকারের নিকট তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। ইংরেজ সরকার তাকে ‘রাওসাহেব’ উপাধি দিয়েছিলেন । তিনি গ্রামের মন্দিরের তত্ত্বাবধান করতেন চৌলল্ট্রির অধিকারী ছিলেন তিনি । স্বামীজি ডুম্মাগুডেম পৌঁছে একটা মন্দিরে বিশ্রাম করেছিলেন এবং দু-একদিনের মধ্যেই_ শীঘ্রই তিনি গ্রামের যুবকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিলেন । তাঁর নিকট শিক্ষা এবং নির্দেশ গ্রহণ করার জন্য তারা মন্দিরে জমায়েত হতে লাগলো। স্বামীজী তাদেরকে রাম তীর্থ, শ্রীরামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দ সম্বন্ধে পড়াশোনা করতে বলতেন এবং আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে উপদেশ দিতে লাগলেন শ্রী পুরুষোত্তম দাস, শ্রী কে জনার্দন এবং ভেঙ্কট রাও নামে একজন শিক্ষক স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে “মানব-সেবা” করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লেন! এখন তাদের একমাত্র নীতি হয়ে দাঁড়ালো “মানবসেবাই মাধব সেবা”_প্রতি সন্ধ্যায় তারা পুরুষোত্তম দাস, কে জনার্দন এবং ভেঙ্কট রাও ভজন গাইতেন । স্বামীজি নিজেও ভজনে অনুরাগী ছিলেন । একজন ভক্তের মধুর স্বর স্বামীজীর হৃদয় স্পর্শ কোরতো এবং তাদের হৃদয়ে ভক্তিভাব জাগিয়ে তুলতো। সময়ে সময়ে তিনি চরম আনন্দের রাজ্যে চলে যেতেন । অতীতে স্বামীজীর এধরনের অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছিল । স্বামীজি নিজে সংগীতে ওস্তাদ ছিলেন না কিন্তু ভজনে যোগ দিতেন এবং খুব উল্লসিত হয়ে মাঝে মাঝে দু এক কলি গান গাইতেন।
প্রতিবছর গ্রামবাসীরা “গণপতি নবরাত্রম্” _উৎসব পালন করে । মিস্টার নাইডুর যে পাকা প্রাঙ্গণ ছিল, সেখানে প্যান্ডেল তৈরি হোতো সুসজ্জিত বেদীতে দেবতা গনেশকে স্থাপন করে নয় দিন ধরে পুজো চলতো। এই বিশেষ উদ্দেশ্যে নাইডু সাহেব কবুর হোতে পুরুষোত্তম পণ্ডিতকে পৌরোহিত্য করার জন্য ডাকতেন । তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল এবং পৌরহিত্যে তিনি খুব পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন ভক্ত লোক। ভক্তি শাস্ত্রে তার খুব ভালো জ্ঞান ছিল । সম্ভবত কবুরের গৌড়ীয় মঠের প্রভাবে তিনি চৈতন্য সাহিত্যে পন্ডিত হয়েছিলেন। তিনি ওই সময়ে ডুম্মাগুডেম আসতেন । গনেশদেবকে প্রতিষ্ঠা করে দুবেলা ভক্তিসহকারে পূজা করতেন । সকাল সন্ধ্যা পূজার সময় গ্রামের যুবকগণ ভজন গাইতো। প্রতিদিন তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক‌ও খাওয়াতো।৷
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
_____________________________________________
জিজ্ঞাসা :– “স্বামীজী, উপদেশ কি ?”
স্বামীজী বললেন :– “গুরু-শক্তি শিষ্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়াই উপদেশ । এই উপদেশ শিষ্যের ঊর্ধ্ব প্রগতি লাভের ইচ্ছাকে জাগিয়ে তােলে। এই আধ্যাত্মিক উপদেশ দেওয়া সম্পূর্ণ গুরুর ইচ্ছা এবং কৃপার উপরে নির্ভর করে । আমরা দেখতে পাই কিছু কিছু লােক গুরু খুঁজে বেড়ায় । কিন্তু এভাবে গুরু খুঁজে পাওয়া যায় না। গুরু নিজেই শিষ্যকে খুঁজে নেবেন । গুরু-শিষ্যের মধ্যে পূর্ব সম্বন্ধ থাকে। শিষ্যের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য গুরুই শিষ্যের খোঁজে ছুটে বেড়ান।”
জিজ্ঞাসা :– “উপদেশ কিভাবে দেওয়া হয় ?”
মীমাংসা :– “কখন কখন উপদেশ সঙ্কল্প অনুযায়ী দেওয়া হয়, কখন বা শরীর স্পর্শ করে, কখন কখন মন্ত্র দ্বারা উপদেশ দান করা হয় । কিভাবে শক্তি শিষ্যের মধ্যে দেওয়া হবে সেটা গুরু নিজেই নির্বাচন করবেন ।”
জিজ্ঞাসা :– “শিষ্য কেমন করে জানতে পারবে যে সে দীক্ষিত হল ?”
মীমাংসা :– “যখন শিষ্যকে মন্ত্র দেওয়া হয় তখন সে বেশ বুঝতে পারে। যদি স্পর্শ করে উপদেশ দেওয়া হয় তাহলে গুরুর প্রেরণা শক্তিতে শিষ্য বুঝতে পারে যে সে একটা ব্যক্তি বিশেষের (গুরুর) চিন্তার জগতে পৌঁছাচ্ছে । সঙ্কল্প অনুযায়ী উপদেশ দেওয়া হলেও শিষ্য বুঝতে পারে । গুরুকে চিন্তা করলে, গুরুর কথা পড়লে বা শুনলে তার যে অনুভূতি হয় তাতে সে বুঝতে পারে যে সে দীক্ষিত হয়েছে।”
জিজ্ঞাসা :– “গুরু যদি স্থূল শরীরে না থাকেন তাহলে কি হবে ?”
মীমাংসা :– “গুরু স্থূল শরীরে থাকুন বা নাই থাকুন তিনি গুরু।”
জিজ্ঞাসা :– “গুরু যদি স্থূল শরীরে না থাকেন তাহলে মন্ত্র কেমন করে পাওয়া যাবে ?”
মীমাংসা :— “শরীর মন্ত্র নেয় না, মন্ত্র নেয় জীব-সত্তা। স্থূল শরীরের মৃত্যুর পরও মন্ত্র বর্তমান থাকে। একবার গুরুর নিকট মন্ত্র নিলে মােক্ষ না পাওয়া পর্যন্ত এই মন্ত্র জীব-সত্তার মধ্যে থাকে । জীবের শরীরের পরিবর্তন (মৃত্যু) হলেও ঐ মন্ত্র তার মধ্যে থাকে।
কখন কখন স্বপ্নে গুরু দীক্ষা দেন। দীক্ষা দেওয়াটা সম্পূর্ণরূপে গুরুর কৃপার উপর নির্ভর করে। শরীর অনেকবার পাল্টাতে পারে, কিন্তু মন্ত্র এবং গুরু একই থাকে । গুরু শিষ্যকে ছাড়েন না । যদি কোন ব্যক্তি তার গুরু সম্বন্ধে খারাপ ধারণা পোষণ করে তাহলে বুঝতে হবে তার নিজেরই পতন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে গুরুর কৃপাই তাকে রক্ষা করবে।” … [ক্রমশঃ]