স্বামী বাউলানন্দজীর ভ্রমণকালীন সময়ের ঘটনাসমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। ডুম্মাগুডেম থেকে স্বামীজি ভদ্রাচলমে এলেন। সেখানে তিনি আপন স্বভাববশতঃ শিবমন্দিরে অবস্থান করছিলেন। তিনি যখন ধ্যানে মগ্ন থাকতেন _তখন কয়েকজন ভক্ত তাঁর সামনে এসে বসতো, তাঁকে অবলোকন কোরতো ! তারা ওনাকে খুবই ভক্তিও কৈরতো। ওই মন্দিরে রামুলু নামে এক ব্যক্তি থাকতো। সে ছিল নিরক্ষর। রাম মন্দিরের বেহারা ছিল সে! কখনো কখনো মধ্যাহ্নের আগেই তার মুর্তি বহনের কাজ থাকতো, আবার কখনো কখনো ভদ্রাচলমের প্রধান রাস্তা দিয়ে শোভাযাত্রা করে রামমূর্তি নিয়ে যাওয়ার সময় সন্ধ্যায় তার কাজ থাকতো।
সে বিয়ে-থা করেনি !তাই কোনো দায়দায়িত্ব‌ও তার ছিল না । যেদিন মন্দিরে তার কাজ থাকতো, সেদিন সে মন্দিরের প্রসাদ পেতো। আবার যেদিন মন্দিরে কোনো কাজ থাকতো না, সেদিন কোন গৃহস্থের বাড়িতে গিয়ে “মা সীতা”– বলে দাঁড়াতো । সেখানে কোনো সাড়া না পেলে অন্য বাড়িতে গিয়ে দাঁড়াতো! এই ভাবে প্রায়শই সে ভিক্ষান্নের সাহায্যে ক্ষুধা মেটাতো। অন্য সময় সে ভক্তিভাবে স্বামীজীর মুখের পানে চেয়ে বসে থাকতো!রামুলু স্বামীজীর সঙ্গে নদীতে স্নান করতে যেতো। স্বামীজীর কিছু দরকার হলে সে করেও দিতো।
ওইখানে থাকাকালীন(অর্থাৎ স্বামী বাউলানন্দজীর সেবা করতে থাকার পর) স্বামীজি লক্ষ্য করলেন যে, রামুলু লোকের মুখ দেখে তাদের ভালো-মন্দ কৃতকর্মের কথা বলে দিচ্ছে ! নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে জোর গলায় প্রত্যেককে তার ভাল-মন্দের কথা সে বলে দিচ্ছিলো। স্বামীজী ওর মধ্যে শক্তির প্রকাশ ঘটেছে দেখে_ তাকে সংযত করার চেষ্টা করলেন_ অনুভূতির কথা কাউকে বলতে নিষেধ করলেন !
কয়দিন সে বেশ চুপচাপ থাকলো কিন্তু দেখা গেল যে সেই কয়দিনে রামুলুর এই ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়ে গেল!!
এখন আর লোকের মুখ দেখার প্রয়োজন হয়না__ কারো নাম শুনে, তার সম্বন্ধে চিন্তা করলেই সে ঐ ব্যক্তির সমস্ত কথা বলে দিতে পারতো ! যাদের অধীনে সে কাজ কোরতো তাদের সম্বন্ধেও সে নানা কথা বলতে লাগলো ! এতে বেশ বিঘ্নের সৃষ্টি হলো__ কারণ যাদের সম্বন্ধে সে সত্য কথাগুলো বলে দিতো_ তারা ওর উপর খুবই ক্রোধান্বিত হয়ে উঠল । স্বামীজি শাসন করেও তাকে সংযত করতে পারলেন না। এই কাজ সে করেই যেতে লাগলো।
একদিন রাত্রে রামুলু পান্ডুরঙ্গ পাহাড়ের উপর উঠে চিৎকার করে___ মন্দিরের বহুদিনের পুরোনো ইতিহাস, যথা:– রামমূর্তির সোনার ও রুপোর অলংকার চুরি এবং এসব ব্যাপারে যারা জড়িত তাদের সম্বন্ধেও কথা বলতে লাগলো। শুধু তাই নয় ওখানকার কয়েকজন নামকরা লোকের চরিত্র সম্বন্ধে সব সত্যিকথা বলতে লাগলো।।
এইসব অপবাদ ওই সমস্ত ব্যক্তিদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠলো। যদিও সে যা বলছিল তা সবই সত্য ! কিন্তু সত্য কথা শোনার লোক কোথায়!! তাই ঐ সমস্ত ধনী ক্ষমতাশালী লোকগুলির কাছে রামুলুর কথা অসহ্য হয়ে উঠলো ! তাদের তাতে মেজাজ বিগড়ে গেলো এবং লোকে তার ওপর প্রতিশোধ নিতে চাইলো। রামুলু জানতো সে কি করছে এবং তার ব্যবহারে কেনো সকলে লজ্জা পাচ্ছিলো !
সব সত্য তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো। কিন্তু সে যা দেখছিল তা প্রকাশ না করে তার কোনো উপায় ছিল না,সে নিজেকে কিছুতেই control কোরতে পারছিল না।। (ক্রমশঃ)
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এই কথা শুনে কৃপা (নীলাদ্রি রাও) পর্ণশালার নিকট রামকৃষ্ণের একটি মন্দির স্থাপন করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে স্বামীজী মন্দির সম্বন্ধে তাঁর মতামত প্রকাশ করে বললেন :– “মন্দির হল ঈশ্বরের আবাস স্থল। মন্দিরের এখন কোন অভাব নেই। বর্তমানে মন্দিরগুলিতে ঠিকমত কাজ হচ্ছে না। সামগ্রিক উপকারের জন্য মানুষ এই মন্দিরগুলিকে ব্যবহার করতে অক্ষম। তাহলে মন্দির তৈরীর কি কোন প্রয়ােজন নেই? তােমাকে আমরা নিরুৎসাহ করতে চাই না। যদি মন্দির করতে চাও তাহলে পূর্বে যে ভুল হয়েছে তা যেন না হয়। মন্দির পবিত্র স্থান। মন্দির নির্মাণের পর উৎসব পালনের জন্য ভক্তদের ওখানে আহ্বান করা উচিত। ভক্তি বা অনুরাগের গভীরতা অনুযায়ী ঐ মূর্তির মধ্যে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান হয়। যে মন্দির আমরা নির্মাণ করি তা বিশ্বেশ্বরের আবাস স্থল। সমস্ত পবিত্র স্থানের মধ্যে ঐ স্থানটি পবিত্রতম। ইহাকে সর্বতােভাবে পবিত্র রাখা উচিত। অসন্তোষের ভাব এখানে থাকা উচিত নয়। যে সমস্ত কর্মী মন্দির নির্মাণ করে তাদেরকে ঠিকমত সন্তুষ্ট করা উচিত | খাবার ছাড়া তাদেরকে আরও মজুরি দেওয়া কর্তব্য। যখন এই মন্দির সন্তুষ্টিতে পরিপূর্ণ হয় একমাত্র তখনই ঈশ্বর এই মন্দিরকে তার আবাস স্থল হিসেবে গ্রহণ করেন। মন্দির নির্মাণের খরচের জন্য আসুরিক প্রকৃতির লোকের নিকট হতে টাকা পয়সা সংগ্রহ করা উচিত নয়। বেতনভুক কোন পূজারী রাখা উচিত নয়। ভক্তরা নিজেরাই স্বাধীনভাবে পূজা করবে। ভক্তরা যাতে নিজের সুবিধা মত পূজা করতে পারে তার জন্য মন্দির খুলে রাখা উচিত। যদি আমরা ঈশ্বরকে একটা নির্দিষ্ট স্থানে রাখি এবং নির্দিষ্ট সময়ে খুলে রাখি তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় যে আমরা ঈশ্বরকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখছি।
সমস্ত লােকই ঈশ্বরের সন্তান। প্রত্যেকেরই ঈশ্বরকে দেখার অধিকার থাকবে। যদি তারা স্বাধীনভাবে প্রবেশাধিকার না পায় তাহলে বুঝতে হবে আমরা ঈশ্বরকে জেলখানায় রেখেছি। যদি এই জেলখানা না ভাঙ্গা হয় এবং ঈশ্বরের কাছে সকলে না যেতে পারে তাহলে ভারত উন্নত হবে না। যদি তােমরা বড় লোকের কাছে গিয়ে মন্দির নির্মাণের জন্য চাঁদা নাও তাহলে তােমরা তােমাদের স্বাধীনতা খর্ব করবে। তােমরা বলতে পার “সমগ্র মন্দিরটি যদি পবিত্র হয় তাহলে মূর্তির আবার বিশেষত্ব কি?”
গরু একটি পশু। ইহা দুধ দেয়। সুতরাং গরু দুধের ভাণ্ডার। যদি তোমরা ঐ ভাণ্ডার হতে দুধ নিতে চাও তাহলে তােমাদেরকে বাঁট অবশ্যই স্পর্শ করতে হবে ৷ কান মলে দিয়ে বা লেজ টেনে দুধ পাবে না । এর কারণ হলো বাঁট একমাত্র স্থান যেখান থেকে দুধ পাওয়া যায় । সেইরকম মন্দির যদি ঈশ্বরের আবাসস্থল হয় মূর্তিটি হবে তাঁর আসন । তোমরা জিজ্ঞাসা করতে পারো “ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে যদি আপনি নিশ্চিত হন তাহলে কেউ কেউ তাঁকে দেখতে পায় এবং কেউ কেউ তাঁকে দেখতে পায় না কেন ?” এর কারণ শোনো, গরু দুধ দেয় ৷ এর বাঁট দুধে পূর্ণ । কিন্তু যে দুধ দোহন করবে সে যদি দুধ দোহন করতে অক্ষম হয় তাহলে সে দুধ পাবে না । আমাদের শরীর হলো জীবাত্মার আবাসস্থল ৷ ঠিক যেমন এক শরীরের জীবাত্মা অন্য শরীরের জীবাত্মাকে সেবা করে ঠিক সেইরকম মন্দিরে পরমাত্মাকে আমাদের সেবা করা উচিত । [ক্রমশঃ]