স্বামী বাউলানন্দজীর ছোটবেলাকার ভ্রাম্যমান জীবনের ঘটনা সমূহ এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। পেরেন্টাপল্লীতে স্বামীজী নির্জনে সাধন ভজন করার জন্য পাহাড়ের উঁচুতে একটা কুটিয়া স্থাপন করে ছিলেন। সেখানে একটা অসুবিধা হচ্ছিল এই যে, পাশেই ঝরনা থাকায় বিভিন্ন ধরনের পশুরা সেখানে জল খেতে আসতো । এদের মধ্যে হিংস্র পশুরাও ছিল। এতে স্বামীজীর একটু ভয় ভয় কোরতো । সেই ভয়কে জয় করার জন্য একদিন স্বামীজি ঝর্ণার কাছে একটা ঢালু জায়গায় রাতের বেলা শুয়ে থাকলেন এবং পরীক্ষা করে দেখলেন যে পশুরা ওনাকে ডিস্টার্ব না করেই একে একে জল খেয়ে চলে যাচ্ছে।
চোখ বন্ধ করা অবস্থায় থাকলেও স্বামীজী সব কিছু খেয়াল রাখছিলেন । যখন সব পশুরা এসে জল খেয়ে চলে গেল তখন তিনি চোখ খুললেন এবং চোখ খুলে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এখন তিনি পুরোপুরি সাহসী, ঈশ্বর-বিশ্বাস তাঁকে কোনো বিপদে ফেললো না । ঈশ্বর এবং তাঁর সহায়তার উপর স্বামীজীর আস্থা আরো বেড়ে গেল । কুটিরে ফিরে গিয়ে বাকি রাতটা তিনি মহা আনন্দে কাটিয়ে দিলেন । সর্বেসর্বা কে তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং তাঁর কাছে সবার মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করলেন । এই অভিজ্ঞতার ফলে তিনি অনুভব করতে পারলেন যে তিনি এবং সমস্ত জীব জন্তু এমনকি বৃক্ষ জড়_ সবকিছুই তাঁর সঙ্গে অভেদ রয়েছে! সবকিছুর মধ্যে সেই ঈশ্বর বাসুদেব বিরাজ করছেন! সকলের মধ্যে একই ঈশ্বর রয়েছেন ! তিনি এও বুঝলেন যে ঈশ্বর খুবই দয়ালু!
এই সময় সর্বক্ষণ তিনি ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন ! যা দেখতেন সবকিছুর মধ্যেই ঈশ্বরের অসাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পেতেন । এই ব্যাপারটি তাঁকে ঈশ্বরের মহিমার কথা স্মরণ করিয়ে দিত এবং তাঁকে গভীর সমাধিতে নিমগ্ন করাতো। রুটি তৈরির জন্য প্রতিদিন তাঁর কিছু পাতার প্রয়োজন হোতো । বনের মধ্যে এক জায়গায় তিনি গিয়ে দেখলেন সেখানে দুটো লম্বা গাছের মধ্যস্থলে জড়ানো লতা গুলি দোলনার মতো হয়ে রয়েছে! তিনি সেখানে উঠে পাতা তুললেন এবং লতার দোলনায় দোল খেলেন । এই দোল খাওয়া তাঁকে বৃন্দাবনের গোপালের কথা এবং রাধা ও অন্যান্য মেয়েদের সাথে লতাগুল্মের দোলনায় তাঁদের দল খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিলো । চিন্তা করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সেখানেই গভীর সমাধিতে নিমগ্ন হলেন । চোখ খুলে দেখলেন খুব অন্ধকার হয়ে গেছে।
পেরেন্টাপল্লীতে বনের মধ্যে আম এবং বেল পাওয়া যেত । স্বামীজী মাঝে মাঝে এসব সংগ্রহ করে কুটিরে আনতেন। এখানকার বেশিরভাগ গাছের ফল টক ছিল, সামান্য কয়েকটা গাছের মিষ্টি ফল পাওয়া যেত । ওই গাছগুলি তাঁর কুটির হতে অনেকটাই দূরে অবস্থিত ছিল । একদিন স্বামীজী মিষ্টি এবং রসালো ফল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়ে দেখলেন _কিছু ফল মাটিতে পড়ে আছে! ফলগুলি পাকা, আপনা-আপনি কাছ থেকে ঝরে পড়েছে! স্বামীজী ওগুলো কুড়িয়ে ঝুড়িতে রাখলেন। নিকটবর্তী একটা উঁচু ঢিবিতে দাঁড়িয়ে তিনি আরো কিছু ফল পাড়তে চাইলেন । ঢিবির নিকট পৌঁছে ডান পা ঢিবির উপর রেখেছেন __এমন সময় তিনি দেখলেন সেখানে একটা বড় গর্তের ভিতর থেকে সদ্য মাটি তোলা হয়েছে । তিনি ভাবলেন কোন বন্যজন্তু এই গর্তটি তৈরি করে _সবে মাত্র বাইরে গেছে! এরূপ ভাবতে ভাবতেই তিনি ওখানেই সমাধিস্থ হয়ে গেলেন । সেদিন‌ও চোখ খোলার আগেই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। সারাদিন এক পা ঢিবির উপরে এবং এক পা ঢিবির সামনে আর একহাতে ফলের ঝুড়ি নিয়ে উনি দাঁড়িয়েছিলেন । দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা এই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে তাঁর শরীরের সন্ধিস্থলগুলি রূদ্ধ এবং শক্ত হয়ে গিয়েছিল । স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার পরও তিনি নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। চলাফেরা করতে তাঁর আরও কিছু সময় লেগেছিল । কিন্তু তিনি যখন কুটিরে ফিরতে চাইলেন, তখন ঘন অন্ধকার হয়ে গেছে –রাস্তা দেখতে পাচ্ছিলেন না ! তিনি পিছন ফিরে চারিদিক দেখছিলেন। হটাৎ তিনি সেখান থেকে অল্প দূরে আগুনের ফুলকি দেখতে পেলেন। ওই আগুনকে তাঁর কুটীরের ধুনির আগুন “ভাস্কর” বলে বুঝতে পারলেন । ধনুক হতে নিক্ষিপ্ত তীরের মতো দ্রুতগতিতে তিনি ওই আগুনের দিকে ধাবিত হলেন এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু তিনি ভেবে অবাক হয়েছিলেন কি করে এতটা দূরত্ব তিনি এত অল্প সময়ের মধ্যে হেঁটে চলে এলেন ! পরের দিন সকালে আবার তিনি ঢিবির নিকট গাছে ফল পাড়তে গেলেন । তিনি লক্ষ্য করলেন যে সংক্ষিপ্ত পথ দিয়ে গতরাত্রে তিনি কুটিরে পৌঁছেছিলেন __তা দুর্ভেদ্য কাঁটাঝোপে ভর্তি! গতরাত্রে তিনি ওই পথেই গিয়েছিলেন কিন্তু তাঁর গায়ে একটাও কাঁটা ফুটে নাই ! তিনি ওই সংক্ষিপ্ত পথ ধরে আবার ফিরতে চাইলেন কিন্তু দু-গজের বেশি যেতে পারলেন না। তখন তিনি বুঝতে পারলেন গতরাত্রে ঈশ্বরের কৃপায় তিনি চলতে পেরেছিলেন !ঈশ্বরের কৃপা না থাকলে মানুষের প্রচেষ্টা সফল হয় না। ( ক্রমশঃ)
===============©==========
*স্বামী বাউলানন্দজীর আধ্যাত্মিক আলোচনা*
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
দ্বিতীয় হল জ্ঞান। কোনো জিনিসের সঠিক মূল্যায়নই হোল ঐ জিনিস সম্বন্ধে জ্ঞান। ঐ জ্ঞান যথাযথ প্রয়ােগ করা উচিত। অপরের হিতে ভাব, ভাষা এবং কর্মে ঐ জ্ঞানের যথার্থ প্রয়ােগ করলে ঐ জ্ঞানের রূপ দেওয়া হয়। যারা জ্ঞানের রূপ দেয় এবং যাদের মধ্যে জ্ঞান রূপ নেয় তারা উভয়েই ঊর্ধ্ব প্রগতির দিকে অগ্রসর হয়।
মনে করো, রাস্তার ধারে কোনো জিনিস নিয়ে দুদলের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে। তুমি সেখানে গেলে এবং গিয়ে তাদের ঝগড়ার বিষয়টা জানলে। যদিও তুমি জানো না যে তােমার মধ্যে ঠিক ঠিক পরীক্ষা করার ক্ষমতা আছে, তথাপি তুমি ভাল মন্দ বিচার করে ঝগড়ার মীমাংসা করে দিলে। তােমার মতে এক পক্ষ অপর পক্ষ অপেক্ষা অধিকতর বুদ্ধিমান। এবং বুদ্ধিমান পক্ষ অপর পক্ষকে ঠকাতে চাইছে। বুদ্ধিমান পক্ষের যুক্তি দূর্বল। কিন্তু বুদ্ধিমান পক্ষের কৌশল বুঝতে না পারায় অপর পক্ষের প্রতারিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন, বিবাদের বিষয়টা তুমি জানো। এই বিবাদের মীমাংসা করার ক্ষমতা তোমার রয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে তােমাকে হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং দূর্বল পক্ষের প্রতি যে অন্যায় অবিচার হচ্ছে তার প্রতিরােধ করতে হবে। উদাসীন হয়ে এই দায়িত্ব অবহেলা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। সাধারণ মানুষের ভাবনায় বিবাদের ব্যাপারে তােমার অবশ্য কিছু করার নাই। কিন্তু সমষ্টি ধর্মের দিক থেকে দেখলে তােমার দায়িত্ব আছে। সুতরাং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে বিচার করা তােমার উচিত। এটিকে ‘জ্ঞানে’-র রূপ দেওয়া বলে। এরূপ করার ফলে তােমার জ্ঞান‌ও বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয় দিক হল শক্তি। মানুষকে তখনই শক্তিশালী বলা হবে, যখন তার চেতনা সবল থাকে এবং প্রয়ােজনের অনুপাতে শক্তি ধারণ করে। এর জন্য শরীরের চাই যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য। উপযুক্ত খাদ্যের অভাবে মানুষের শরীর অপটু হয়। মানুষের অভাবের কারণ হচ্ছে কিছু সুবিধাবাদী লােক প্রচুর পরিমাণে খাদ্য বস্তু অধিকার করে নিচ্ছে। অর্থবল থাকায় তারা খাদ্যবস্তু কিনে নিচ্ছে এবং যে জমিতে খাদ্য বস্তু উৎপন্ন হচ্ছে সেই জমি কিনে নিচ্ছে। যাতে অপরের মধ্যে ঐ শক্তি সঞ্চয় হয় সেজন্য শক্তিশালী লােকের শক্তি প্রয়ােগ করা উচিত।
সমাজও একটা জীবন্ত শরীর। যদি কোন গাছের সমস্ত অংশ সুস্থ হয় তাহলে সেই গাছকে সুস্থ বলা হয়। যদি কোন অংশ রােগগ্রস্ত হয় তাহলে সেই গাছকে সুস্থ গাছ বলা যাবে না। ঐ রােগ গাছের এক অংশ হতে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র গাছটিকে দূর্বল করে দেবে। সমাজের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সমাজের কোন এক অংশের দূর্বলতা নিঃস্বার্থ লোকের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সিদ্ধান্ত হল এই যে, আমরা যা চাই _তা স্বর্গীয় সুখ নয়, তা হল ঈশ্বরের সঙ্গে একত্ব-বোধ ৷ এই ঈশ্বর বিশ্বব্যাপী। তিনি সমস্ত মানুষের অন্তরে বিরাজমান। ঐ ঈশ্বরের একত্ব-বােধ আমাদের লাভ করতে হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে আমাদেরকে একত্ব-বােধ করতে হবে। তাদের উন্নতিতে আমাদের উন্নতি অনুভব করতে হবে। তাহলে পৃথিবীর সমস্ত লােকের অগ্রগতি হবে। আমরা একত্রে ঊর্ধ্ব প্রগতি লাভ করবো। আমরা একত্রে সমষ্টি সত্তার সঙ্গে একীভূত হব।
এই আদর্শ লাভ করতে হলে প্রেম, জ্ঞান এবং শক্তিকে উন্নত করতে হবে এবং অপরের উন্নতির জন্য এগুলি প্রয়ােগ করতে হবে। আধ্যাত্মিক জীবন লাভের এটাই পদ্ধতি । কোন্ দেবতাকে আমি পূজো করি, কোন্ মন্ত্র আমি উচ্চারণ করি, কোন্ তন্ত্র আমি অভ্যাস করি – এ নিয়ে মাথা ঘামাবার মোটেই প্রয়োজন নাই । হৃদয় প্রসারিত না হলে পূজা, পাঠ, মন্ত্র, তন্ত্র কোন ফল দেবে না ৷ জীবনে গুণগত পরিবর্তন না হোলে বা জীবনমুখী না হোলে পূজা, পাঠ, মন্ত্র-তন্ত্র মানুষকে অধিকতর স্বার্থপর করে তুলবে ৷ এগুলির দ্বারা বহির্মুখী উন্নতি হবে, কিন্তু আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ক্রমশঃ অধঃপতন হবে।
এ স্থান হতে বহু দূরে চলে যাচ্ছো বলে উদ্বিগ্ন হবে না ৷ আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ভৌগলিক দূরত্ব কোন বাধা নয় । ভালবাসার প্রবাহকে কোন কিছুই প্রতিহত করতে পারে না । উপযুক্ত পথে যদি নিজেকে চালিত করো তাহলে ভালোবাসার প্রবাহ তোমাকে শক্তিশালী করে তুলবে ৷ তোমার আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে ৷ বিনা দ্বিধায় তোমার বিবেকের কথা শুনবে । দেখবে অচিরেই সব ঠিক হয়ে যাবে ।”(ক্রমশঃ)